জ. ই. মামুন

১৭ মে, ২০২৬ ০৩:০২

হামে সাড়ে চারশো শিশুর মৃত্যু: কোনো ডাক্তারকে রোগীর পেছনে ছুটতে তো দেখা যাচ্ছে না

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল দায়িত্ব নিয়েই বলেছিলেন, এখন আর ডাক্তারের পেছনে রোগীকে ছুটতে হবে না, ডাক্তারই রোগীর পেছনে ছুটবে। কিন্তু গত দুই মাসে দেশে সাড়ে চারশোর বেশি শিশু হামে মারা গেল, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় ছড়িয়েছে হাম, আক্রান্ত অর্ধ লাখের বেশি- অসুস্থ শিশুদের মা-বাবারা এ হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতালে ছুটেও চিকিৎসা পাচ্ছে না, সেবা পাচ্ছে না, আইসিইউ পাচ্ছে না, সন্তানকে বাঁচাতে পারছেন না। কিন্তু কোনো ডাক্তারকে তাদের পেছনে ছুটতে দেখা যাচ্ছে না।

হামে শিশুমৃত্যুর জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচার বিষয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে গিয়েছিলাম আজ (শনিবার) বিকেলে। ডেইলি স্টার ভবনে বাংলাদেশ চাইল্ড প্রোটেকশন ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত এ সেমিনারে সাংবাদিক আনিস আলমগীর, মাসুদ কামালসহ অনেক আলোচক বলেছেন, হামে শিশু মৃত্যুর জন্য মূলত দায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূস এবং তার অথর্ব স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। কারণ সময়মতো টিকা আমদানি করলে এবং শিশুদের টিকা দেওয়া হলে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটতো না। শিশু মৃত্যুর এই ঘটনাকে আলোচকদের কেউ কেউ হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে দোষীদের বিচারও দাবি করেন।

কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন যে দেশে এখন যত অন্যায়, অবিচার বা নিপীড়ন ঘটছে সব কিছুর জন্য শেখ হাসিনাকে দায়ী করা সবচেয়ে ভালো। তাহলে আর অন্য কারো কোনো দায়িত্ব নিতে হয় না। তবে সমস্যা হলো, শিশুকে প্রথমবার হামের টিকা দিতে হয় ৯ মাস বয়সে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যে শিশুর জন্ম তাকে টিকা দিতে হতো সে বছর সেপ্টেম্বরে। কিন্তু তখন তো শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দিল্লিতে। সেখান থেকে তো তার পক্ষে টিকা দেওয়া সম্ভব না। তাই তার উত্তরসূরি হিসেবে ইউনুস সরকারের ওপরেই দায়িত্বটি বর্তায়। তবু কেউ কেউ ইউনূসকে বাঁচাতে হাসিনার ওপরেই দোষ চাপাচ্ছেন, যাকে বলে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো।

শুধু হাম কেন- যক্ষ্মা, ধনুষ্টংকার, পোলিওসহ প্রাণঘাতী বিভিন্ন রোগ থেকে শিশুদের বাঁচানোর জন্য আগে সরকারিভাবে নানা প্রচারণা বা ক্যাম্পেইন চালানো হতো। লাল বৃত্তের ভেতরে একটা শিশুর ছবি দিয়ে “আপনার শিশুকে টিকা দিন” লেখা একটা স্টিকার হাটে মাঠে, স্কুল কলেজ, অফিস আদালত, বাস ট্রেন এমনকি রিকশা বেবি ট্যাক্সির পেছনেও সাঁটানো দেখা যেতো। এখন আর সেটা কোথাও দেখি না। এখন বাসের পেছনে লেখা দেখি- আপনার শিশুকে মাদ্রাসায় পাঠান। এখন ওয়াজে ইহুদিদের বানানো টিকা মুসলমানের জন্য হারাম বলে প্রচার করা হয়, সেই ওয়াজ আবার ফেসবুকে ভাইরাল হয়- তা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই।

শুধু হাম কেন, টিকা নিয়ে যে অপরাজনীতি এবং অপসংস্কৃতি শুরু হয়েছে তাতে যদি আবার এদেশে পোলিও, হুপিংকাশি বা যক্ষ্মা মহামারি আকারে ফেরত আসে তাতেও অবাক হবার কিছু নেই।

অথচ শিশুদের সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিশেষ সাফল্য অর্জনের জন্য ২০১০ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে পুরস্কৃত করেছিলো। ২০১৯ সালে টিকাদানে ঈর্ষণীয় সাফল্যের জন্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই) তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভ‍্যকাসিন হিরো পুরস্কারে ভূষিত করেছিল। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ তখন টিকার রোল মডেল বলে দেশি বিদেশি পত্র পত্রিকায় তখন খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

কেবল টিকা নয়, মহামারি মোকাবেলায়ও বাংলাদেশের সাফল্য অভাবনীয়। করোনা অতিমারি তো এদেশের চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীরাই মোকাবেলা করেছিলেন। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও এ কথা বলা চলে। সেই অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা হাম মোকাবেলায় ব্যর্থ হলাম? হলাম কারণ, যখনই সরকার পরিবর্তন হয় সঙ্গে সঙ্গে এদেশের সকল দায়িত্বশীল লোককে তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সে ভালো না মন্দ, যোগ্য না অযোগ্য সেই বিবেচনা না করে শুধু রাজনৈতিক কারণে যোগ্য লোকদের সরিয়ে দেওয়া হয়, অযোগ্য- অনভিজ্ঞ লোকজন এসে ওই চেয়ারে বসেন। আর তার সাথে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা তো আছেই। যে কারণে মাইলস্টোন স্কুলের বিমান দুর্ঘটনায় যখন শত শত শিশু হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, তখন পোড়া রোগীদের জন্য দেশের সেরা চিকিৎসক ডা. সামন্ত লাল সেনকে তাদের চিকিৎসা করতে দেওয়া হয় না, কারণ তিনি কয়েক মাস আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন!

সংবাদে দেখলাম কয়েক দিন আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, পরিস্থিতি বেশি খারাপ হলে সরকার হামের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল চালু করবে। সাড়ে চারশো শিশুর মৃত্যুর পরেও আরও খারাপ পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা! এই লোকই আবার কিছুদিন আগে বলেছিলেন, তার নিজেরও ছোটবেলায় হাম হয়েছিল। হাম এমন গুরুতর কোনো অসুখ না! আমি ভাবি, এরা কী ধাতু দিয়ে গড়া? নাকি ওইসব চেয়ারে বসলে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়?

সুমনের গান মনে পড়ল- কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে, বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে!

  • জ. ই. মামুন: সিনিয়র সাংবাদিক।

[লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত]

আপনার মন্তব্য

আলোচিত