১৭ মে, ২০২৬ ০৩:২৬
ছবি: সংগৃহীত
দেশে হামে তিন শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করছে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট।
সংগঠনটির মতে, টিকা কেনা ও মজুতের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা এবং ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়ার কারণেই এই জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে।
শনিবার (১৬ মে) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. এম এইচ ফারুকী। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ডা. সারওয়ার ইবনে সালামের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী, ডা. কাজী রকিবুল ইসলাম এবং ডা. আবু সাইদ।
ডা. এম এইচ ফারুকী ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়ার সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাৎকার উদ্ধৃত করে বলেন, ‘ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতার কারণে টিকার ঘাটতি, রোগ নজরদারির প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্ব, জনগোষ্ঠীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে না পারাই বর্তমান হাম প্রাদুর্ভাব ও শিশুমৃত্যুর মূল কারণ।’
ডা. ফারুকী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের কারও এই মৃত্যুর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করায় রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা থাকলেও রাষ্ট্র যথাযথ অর্থ বরাদ্দ করেনি। আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট থেকেই স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, বাংলাদেশে সাধারণত ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সের শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়। সঠিক সময়ে টিকা নেওয়া থাকলে আক্রান্তের সম্ভাবনা যেমন কমে, তেমনি জটিলতাও কম হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে চতুর্থ ধাপের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম (এইচএনপিএসপি) শেষ হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করেই পঞ্চম ধাপের কার্যক্রম বাতিল করে ২ বছরের একটি সংক্ষিপ্ত কর্মসূচি নেয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর টিকার জন্য আর কোনো অর্থ বরাদ্দ ছাড় না করায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়। সেই সঙ্গে পূর্বে চালু থাকা ৬ মাস অন্তর শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচিটি বন্ধ করে দেওয়ায় শিশুর মৃত্যুঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন হাসপাতালগুলোতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির কারণে সরকার বেসরকারি হাসপাতালের এনআইসিইউ ও শিশু ক্লিনিকগুলো অধিগ্রহণ করতে পারে। এ ছাড়া সরকারি হাসপাতালে চালু থাকা আইসিইউর একটি অংশ শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড বা সুনির্দিষ্ট করতে হবে।
কোভিড আমলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আইসিইউর পূর্ব পর্যায়ে থাকা শিশুদের হাই ফ্লো অক্সিজেন দিয়ে বাঁচানো সম্ভব। আমাদের চিকিৎসকরা কম খরচে হাই ফ্লো অক্সিজেন দেওয়ার পদ্ধতি বের করেছেন। পাশাপাশি লক্ষণ দেখা দেওয়া রোগীকে দ্রুত আইসোলেশন বা সঙ্গরোধের ব্যবস্থা করতে হবে।
সংগঠনটির সভাপতি শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে সংকট সমাধানে ১৫টি দাবি পেশ করা হয়। প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে– চলমান গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার করে শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা, সব সরকারি হাসপাতালে ‘হাম কর্নার’ চালু এবং বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা, ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের নিয়মিত ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো, গাফিলতির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহি ও শাস্তি নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ ও জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব উদ্যোগে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং ৬টি বিভাগে নির্মিত শিশু হাসপাতালগুলো দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার দাবি এসেছে এই সংবাদ সম্মেলন থেকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ৯৬১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ২ জনের। মৃত দুই ব্যক্তিই সিলেট বিভাগের এবং তারা সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার বাসিন্দা। তারা দুজনেই হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত বুলেটিনে এই আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে।
গত ১৫ মে সকাল ৮টা থেকে ১৬ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা যায় সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা উন্নীত হয়েছে ৯৬১ জনে, যার মধ্যে ১০৮ জনের দেহে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি ৪৭২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এরপর চট্টগ্রামে ১৬৭ জন এবং বরিশালে ১২৯ জন।
১৫ মার্চ থেকে ১৬ মে পর্যন্ত দেশে হামের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত দুই মাসে দেশে মোট সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ৫৭২ জনে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৫২৪ জন।
এ সময়ের মধ্যে হাম আক্রান্ত হয়ে মোট ৩৭৯ জন সন্দেহভাজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭৪ জনের মৃত্যু হামের কারণেই হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সংক্রমণের দিক থেকে ঢাকা বিভাগ শীর্ষে রয়েছে, এখানে এ পর্যন্ত ২৫ হাজার ৪৯১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং ১৫৯ জন মারা গেছেন।
১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৪১ হাজার ২৮ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৬ হাজার ৬৪৫ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
আপনার মন্তব্য