০৯ মার্চ, ২০১৫ ১৯:৪৪
অথচ তিনি বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন কী না এই নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছিলো। বিশ্বকাপের ঠিক আগে আগে জড়িয়ে পড়লেন নারীঘটিত বিতর্কে। এমনকি কারাগারেও যেতে হলো। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, রুবেল হোসেনের কথাই হচ্ছে।
নারীঘটিত বিতর্কে তাকে নিয়ে যখন দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে তখন রুবেল হোসেন একেবারেই চুপ। যেনো পণ করেই বসেছিলেন মাঠেই তার জবাব দেবেন। একজন ক্রিকেটারের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্র তো মাঠই! কী দারুণভাবেই না সে জবাবটা দিলেন বাংলাদেশী এই পেসার। খোদ ইংল্যান্ডকে উড়িয়ে দিয়ে নিজের জাত চেনালেন রুবেল হোসেন।
বিশ্বকাপের ঠিক পূর্ব মূহূর্তে রুবেল হোসেন জড়িয়ে পড়েন এক অনাঙ্খিত বিতর্কে। নাজনীন আখতার হ্যাপী নামের এক চিত্রনায়িকা রুবেলের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারিরীক সম্পর্ক হড়ে তোলার অভিযোগে মামলা ঠুকে দেন। পুরো দল যখন বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিচ্ছে রুবেল তখন আদালতে দৌড়ঝাপ করছেন। আর দল যখন বিশ্বকাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় রওয়ানা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে রুবেল তখন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। কী দুঃস্বপ্নের সেই দিন, কী দুর্বিষহ সেইদিন!
অভিযোগকারী হ্যাপী পক্ষ থেকে রুবেলকে বিশ্বকাপ দলে না রাখারও দাবি জানানো হলো। কিন্তু নিবার্চকরা জানতেন, এই বিশ্বকাপে একজন রুবেল হোসেন কতো প্রয়োজন বাংলাদেশের। তাই হ্যাপীর আপত্তি সত্ত্বেও, মামলায় কারান্তরীন থাকা সত্ত্বে তাকে স্কোয়াডে রাখলেন। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, আচমকা ঝড়ে টালমাটাল রুবেল বিশ্বকাপে কতটুকু করতে পারবেন এই নিয়ে সংশয় ছিলো ভক্তদের মনেও। কিন্তু ভক্তরাই যদি সকল ক্রিকেটীয় সমীকরণ বুঝে ফেলবেন তাহলে আর নির্বাচকরা কেনো! তাই শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত রুবেল হোসেনের জন্য অপেক্ষা করলেন নির্বাচকরা।
সেই আস্থার, সেই বিশ্বাসের এর চেয়ে ভালো আর কী প্রতিদান দিতে পারতেন রুবেল! একজন আর কতটুকুইবা পারে! ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে সত্যিকারের ত্রাতার ভূমিকায়ই যেনো আভির্ভূত হলেন রুবেল। যখনই হাত ফসকে বেড়িয়ে যাচ্ছে মাচ তখনই রুবেল আঘাত হানলেন শত্রু শিবিরে। তাও জোড়া আঘাত। তার দুইবারের জোড়া আঘাতেই দারুণ এক ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে নিলো বাংলাদেশ।
একবার কল্পনা করুণ ম্যাচটির কথা। হাফসেঞ্চুরিয়ান বেল ক্রিজে থিতু হয়ে অভিস্ট লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন দলকে। তখনই মঞ্চে আভির্ভূত রুবেল। প্রথমে ফিরিয়ে দিলেন বেলকে। এই ওভারেই মরগানকে সাকিবের দূর্দান্ত ক্যাচে পরিণত করে ইংল্যান্ডকে ব্যাফুটে ঠেলে দেন রুবেল। এর নিজের শেষ ও দলের ৪৯তম ওভার তো একেবারে রুপকথাকে হার মানানো। আগের ওভারেই ১৩ রান দিয়ে তদিয়েছেন তাকসিন। ৫০ তম ওভারটিও তাকেই করতে হবে। একটি সহজ ক্যাচ মিস করেছেন তামিম। পরাজয়ের শঙ্কা তখন উঁকি দিতে শূরু করেছে। তীরে এসে তরী ডুবে যাওয়ার আরেকটি দুঃখগাঁথা লেখার প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছেন অনেকে।
এই অবস্থায় অধিনায়ক বল তুলে দেন রুবেলের হাতে, সেই রুবেল- যার বিশ্বকাপে খেলায়ই অনিশ্চিত ছিলো, যিনি বিশ্বকাপে আসার আগে কারাগারে ছিলেন, নিজেকে ঢেলে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত সুযোগ আর কী হতে পারে রুবেলের জন্য। রুবেল ঢেলে দিলেনও। তাঁর বিধ্বংসী রুপেই গুটিয়ে গেলো ইংলিশ লেজ। একটু আগেই যা সাপের লেজে মতো বিষ ছড়াতে শুরু করেছিলো।
এই যে পথে পথে মিছিল হচ্ছে, এই যে জাফর ইকবালও নেমে গেছেন মিছিলে, এই বিজয় উল্লাস এর সবই তো রুবেলের জন্যই সম্ভব হয়েছে। মাহমুদুল্লাহর শতক, মুশফিকের ব্যাট তলোয়ার হয়ে উঠা কিংবা এই মার্চেই একাত্তরের মার্চের যোদ্ধাদের মনে করিয়ে দেওয়া মাশরাফি- সবকিছু তো ব্যর্থ হয়ে যেতো যদি একজন রুবেল এভাবে জ্বলে না উঠতেন।
যে নারীকে নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন রুবেল তার নাম হ্যাপী। এরপর থেকে রুবেলের সাথে হ্যাপী শব্দ জুড়ে দিয়ে কতো ঠাট্টা ইয়ার্কি হয়েছে। কিন্তু সোমবার রুবেল হোসেন সত্যি সত্যিই হ্যাপী করেছেন পুরো দেশকে, পুরো জাতিকে। এ কোন ঠাট্টা নয়। এ সত্য। আর সত্য তো চিরকলাই সুন্দর। বাংলাদেশের জন্য যেমন সুন্দর সোমবারের বিকেলটা।
এই লেখা যখন লিখছি তখন বাইরে মিছিল হচ্ছে। বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে শ্লোগান দিচ্ছে মিছিলকারীরা। অনতিদূরে পটকাও ফুটছে। কতদিন, ক-তদিন পর একটা উৎসেবর উপলক্ষ্য পেলো এদেশের মানুষ! হরতাল-অবেরাধ, পেট্রোল বোমা, চাপাতি, খুনাখুনির সময়ে রুবেল হোসেনরাই সত্যিকারেই হ্যাপী করে তুলেছে পুরো জাতিকে।
আপনার মন্তব্য