০৪ জুন, ২০১৮ ১৫:৫২
১৪ জুন থেকে রাশিয়ায় শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল। এবার অংশগ্রহণকারী ৩২ দলের মধ্যে রয়েছে ৭টি মুসলিম দেশ।
দলগুলো হচ্ছে সৌদি আরব, ইরান, তিউনিসিয়া, মরক্কো, মিসর, নাইজেরিয়া ও সেনেগাল।
সৌদি আরব
১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে প্রথম অভিষেক হয় সৌদি আরবের। প্রথমবারই বাজিমাত করে দেশটি। গ্রুপ পর্বে নেদারল্যান্ডস ও মরক্কোকে হারিয়ে নকআউট পর্বে নাম লেখায় সৌদি। ১৬ দলের লড়াইয়ে সুইডেনের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় তারা। এরপর ১৯৯৮, ২০০২ ও ২০০৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়ে আরাবিয়ানরা।
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ২০১৪ সালে ব্রাজিলের মাটিতে খেলাই হয়নি আরব দেশটির। অবশেষে জাপানকে ১-০ হারিয়ে ১২ বছর পর বিশ্বকাপে টিকিট কাটল সৌদি আরব।
সবশেষ দুই বিশ্বকাপ ছাড়াও বেশ কয়েকটি টুর্নামেন্টে ছিল না সৌদি আরবের নাম। ২০০৭ সালে এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠেও শিরোপা জেতা হয়নি তাদের। এরপর ২০১১ ও ২০১৫ এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্বই পার হতে পারেনি দেশটি। বর্তমান দলে বেশ কিছু ফুটবলার আছেন-ওসামা, তাইসির আল জাসিম, মুহান্নাদ, নওয়াফ, ফাহাদ আল মুয়াল্লাদ, ইব্রাহিম মোহাম্মদ, নাসের আল সামরানি, নায়েফ হাজী। এ কজন ফুটবলার রাশিয়া বিশ্বকাপে আলো ছড়াতে পারেন।
আর্জেন্টিনা ফুটবল দল থেকে বাদ পড়া এদগার্দো বাউজাকে প্রধান কোচের দায়িত্ব দিয়েছে সৌদি আরব। মেসিদের কোচিং করানো ছাড়াও বাউজা ছিলেন সাও পাওলো, কোলন, আল নাসের দলের কোচ। খেলোয়াড়ি জীবনে ছিলেন তিনি আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার।
ইরান
এখন পর্যন্ত মোট পাঁচবার বিশ্বকাপের টিকিট হাতে পেয়েছে ইরান-১৯৭৮, ১৯৯৮, ২০০৬, ২০১৪ ও সবশেষ ২০১৮। ৭৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে উঠে ভালো করতে পারেনি তারা। গ্রুপ পর্বে এক জয়ও পায়নি ইরান। ১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডের প্রথম ম্যাচেই যুগোস্লাভিয়া হারায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। বিশ্বকাপের অর্জন বলতে এটুকুই। এরপর ২০০৬ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে জায়গা পেলেও গ্রুপ পর্বের কোনো ম্যাচেই জয়ের স্বাদ পায়নি ইরান।
সর্দার আজমুন ও মেহদি তারেমি, আসকান দেজাঘার মতো তারকারা ইরানের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন। ২০১৫ সালের এশিয়ান কাপে দারুণ পারফর্ম করে দলটি। সে বছর ইরানের হয়ে আলো ছড়ান আসকান ও রেজা। এ ছাড়া দলে রয়েছে আলী রেজার মতো নামকরা গোলরক্ষক। রাশিয়া বিশ্বকাপে বড় দলগুলোর মাথাব্যথার কারণ হতে পারে ইরান।
কার্লোস কুইরোজের অধীনে রাশিয়া যাচ্ছে ইরান। ক্যারিয়ারে তিনি একজন সফল কোচ। রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডেও কোচিং করান এই পর্তুগিজ। ১৯৮৯-১৯৯১ পর্যন্ত পর্তুগাল অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ ছিলেন কার্লোস। সে সময় টানা দুইবার পর্তুগিজ যুবারা বিশ্বকাপ মুকুট জেতে। এটাই কার্লোসের সবচেয়ে বড় সাফল্য। ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে নিজ দেশ পর্তুগালকে নকআউট পর্বে নিতে অনেক অবদান ছিল তার। সব মিলিয়ে একজন ‘ওয়ার্ল্ড ক্লাস’ কোচের ছায়ায় রাশিয়া বিশ্বকাপে নজর কাড়তে পারে ইরান।
তিউনিশিয়া
রাশিয়া বিশ্বকাপসহ মোট পাঁচবার বিশ্ব মঞ্চের টিকিট হাতে পেল তিউনিশিয়া। ১৯৭৮, ১৯৯৮, ২০০২ এবং সবশেষ ২০০৬ জার্মান বিশ্বকাপে খেলে দেশটি। তবে কখনই তারা গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে মেক্সিকোকে ৩-১ ব্যবধানে পরাজিত করে দলটি। এখন পর্যন্ত এটাই তাদের সর্বোচ্চ অর্জন।
২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে জায়গা পায়নি দেশটি। বর্তমান দলে বেশ কয়েকজন তরুণ ফুটবলার আছেন। যাদের কাঁধে ভর করে রাশিয়ায় যাচ্ছে তিউনিশিয়া। তাদের মধ্যে ওয়াবি কাজরি, আনিস বিন হাতিরা, আইমেন আব্দেন নুর, আহমেদ আকাইসিই হলেন বিশ্বকাপে মূল অস্ত্র।
তিউনিশিয়ার কোচ হলেন নাবিল মালুল। জাতীয় দলের সাবেক এ মিডফিল্ডার ১৯৮৮ সালে সিওলে অনুষ্ঠিত সামার অলিম্পিকে অংশ নেন।
মরক্কো
১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলে মরক্কো। সে থেকে ফুটবলবিশ্ব চেনে দেশটিকে। এরপর ১৯৮৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে চমক লাগিয়ে দেয় আফ্রিকার এ দল। ইংল্যান্ড, পোল্যান্ডের মতো দলকে আটকে দেয় তার। দুই দলের বিপক্ষেই গোলশূন্য ড্র করে মরক্কো। এখানেই শেষ নয়, পর্তুগালকে ৩-২ গোলে উড়িয়ে দেয় তারা।
১৯৯৪ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ‘এফ’ গ্রুপে নেদারল্যান্ডসকে ২-১ গোলে পরাজিত করে মরক্কো। ৯৮’র ফ্রান্স বিশ্বকাপে খেলে দলটি। সে বছর গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে ১ জয়, ১ হার আর ১ ড্র নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় মরক্কোবাসীকে। দুই দশকের মধ্যে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেল মরক্কো।
শেষ চার বিশ্বকাপে ছিল না মরক্কো। জুভেন্টাসের সেন্টার ব্যাক মেহেদি বেনাতিয়া রয়েছেন মরক্কোতে। এছাড়া রয়েছেন উইঙ্গার নাবিল দিরার, আশরাফ লাজার, ইউসেফ আল আরাবি, হামিদ, ওমর আল কাদুরি ও নরদিন আমারবাত। রাশিয়া বিশ্বকাপে এ ক’জন ফুটবলার প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেন।
২০১৪-২০১৬ সাল পর্যন্ত মরক্কো দলকে কোচিং করান দেশটির সাবেক ফুটবলার ইজজাকি। এরপর তাকে বাদ দিয়ে কোচের দায়িত্ব দেয়া হয় সাবেক ফরাসি ডিফেন্ডার হেরভে রেনার্ডকে। একটা জায়গায় রেনার্ড সফল। কোচিং ক্যারিয়ারে তার অধীনে আফ্রিকার দুটি দেশ ‘আফ্রিকা কাপ অব নেশনস’ শিরোপা জিতেছে।
মিসর
রাশিয়া বিশ্বকাপের আগে দুইবার বিশ্বকাপ খেলে মিসর। ১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ডে হাঙ্গেরিকে ৪-২ গোলে উড়িয়ে দেয় পিরামিডের দেশটি। এরপর ১৯৯০ বিশ্বকাপে সেই ইতালির মাটিতেই চমক দেখায় মিসর। গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচে নেদারল্যান্ডস ও আয়ারল্যান্ডকে জিততে দেয়নি দলটি। শেষ ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াই করে পরাজিত হয় দলটি।
সবশেষ ২০১০ সালের ‘আফ্রিকা কাপ অব নেশনস’ শিরোপা জিতেছে মিসর। যেটা ছিল দেশটির সপ্তম নেশনস কাপ শিরোপা। তবে সেই বছর বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব পার হতে পারেনি মিসর। আলজেরিয়ার কাছে প্লে-অফে হেরে বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় তাদের। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের মূল মঞ্চেও উঠতে পারেনি তারা। বাছাইপর্বে ঘানার কাছে খুব বাজেভাবে হেরে বিদায় নেয় দলটি।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে নাম লেখাল নীলনদের দেশটি। আলেকজান্দ্রিয়ার বুর্গ আল আরব স্টেডিয়ামে কঙ্গোকে ২-১ গোলে হারিয়ে রাশিয়ার টিকিট কাটে আফ্রিকার এ দল। বর্তমানে তাদের দলে একাধিক তারকা খেলোয়াড় আছে। যারা মিসরের বিভিন্ন লিগে দাপিয়ে বেড়ান। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে নজরে থাকবেন দলটির কয়েকজন ফুটবলার। তারা হলেন- মোহাম্মদ সালাহ, সাঈদ, আহমদ হাসান ও মাহমুদ।
২০১৫ সালে মিসরের কোচের দায়িত্ব পান হেক্টর কুপার। কোচিং ক্যারিয়ারে ভ্যালেন্সিয়া, ইন্টার মিলান, রিয়াল বেটিসের মতো ক্লাবে কোচের দায়িত্বে ছিলেন। এ ছাড়া ২০০৮-২০০৯ মৌসুমে জর্জিয়ার ফুটবলকে নতুন মাত্রা দেন হেক্টর।
নাইজেরিয়া
১৯৯৪ বিশ্বকাপে প্রথমবার নাম লেখায় নাইজেরিয়া। গ্রুপ পর্বেই সবাইকে চমকে দেয় দেশটি। তিন ম্যাচে দুই জয়ে পয়েন্ট টেবিলের নাম্বার ওয়ান আসন দখল করে দলটি। প্রথম রাউন্ড পার করে নকআউটে কাটা পড়ে সুপার ঈগলরা। সে বছর ইতালির কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় তারা। ১৯৯৮ বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত নাইজেরিয়াকে দেখে বিশ্ব। প্রথম ম্যাচেই স্পেনকে মাটিতে নামায় দেশটি। দ্বিতীয় ম্যাচে বুলগেরিয়াকে হারিয়ে দেয় তারা। শেষ ম্যাচে প্যারাগুয়ের সঙ্গে আর পেরে উঠেনি আফ্রিকার দেশটি। শেষ পর্যন্ত নকআউট পর্বে ডেনমার্কের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে তারা।
২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে বেশ কষ্ট করেই গ্রুপ পর্ব পার করে নাইজেরিয়া। সেবারও নকআউট পর্ব থেকে বিদায় নেয় দেশটি। ২০১৮ বিশ্বকাপেও ভালো করার সম্ভাবনা আছে নাইজেরিয়ানদের। ইতোমধ্যে বাছাইপর্বে দারুণ পারফর্ম করেছে তারা। আফ্রিকা অঞ্চলের প্রথম দল হিসেবে রাশিয়া বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয় নাইজেরিয়া। জাম্বিয়ার বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট হাতে পায় দলটি। এরপর প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে উড়িয়ে দেয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি।
ভিনসেন্ট এনইয়ামা বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। কেবল জাতীয় দল নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি বেশ পরিচিত। বর্তমানে নাইজেরিয়ার জাতীয় দলের পাশাপাশি ইসরাইলের ফুটবল ক্লাব মাকাবির গোলকিপারের দায়িত্ব পালন করছেন। তার আগে খেলেছেন লিগ ওয়ানের দল লিলের হয়ে। এ ছাড়া নাইজেরিয়ার দলে এমন কিছু ফুটবলার আছেন, যারা বিশ্বের নামীদামী ক্লাব মাতিয়ে বেড়ান। চেলসির সাবেক মাঝমাঠের তারকা জন ওবি মিকেল নাইজেরিয়ার বর্তমান অধিনায়ক। আছেন ইন্টার মিলান, তুরিন মাতানো জোয়েল ওবি, এফসি অ্যাশদোদ ক্লাবে খেলা এফে অ্যামব্রোস।
জার্মান কোচ গেরনট রোহর’র অধীনে রাশিয়া বিশ্বকাপের টিকিট কাটল নাইজেরিয়া। খেলোয়াড়ি জীবনে বায়ার্ন মিউনিখের জার্সি গায়ে জড়ানো গেরনট দলটিকে দারুণ ছন্দে রেখেছেন। দেশ-বিদেশের বহু ক্লাবে কোচিং করান গেরনট। যখন তিনি নাইজেরিয়ায় যোগ দেন, তখন দলটির অবস্থা ছিল শোচনীয়। আফ্রিকা নেশনস কাপের দুটি আসরে জায়গা হয়নি নাইজেরিয়ানদের। সে চাপ কাটিয়ে তিনি এ দলকে পাইয়ে দেন বিশ্বকাপের টিকিট।
সেনেগাল
২০০২ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে জায়গা পায় সেনেগাল। ওই আসরের গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সকে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দেয় দেশটি। পরের দুই ম্যাচে ডেনমার্ক, উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র করে চলে যায় নকআউট পর্বে। যেখানে সুইডেনকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টারে চলে যায় সেনেগাল। এরপর লম্বা সময় দেখা যায়নি সেনেগালকে। অবশেষ দীর্ঘ ১৬ বছর পর রাশিয়া বিশ্বকাপে নাম লেখাল পশ্চিম আফ্রিকার দেশটি।
হঠাৎ করেই হারিয়ে যায় সেনেগাল। কেবল বিশ্বমঞ্চই নয়, আফ্রিকার নেশনস কাপের ফাইনালে উঠেও শিরোপা জিততে পারেনি তারা। ২০০২ সালের পর ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে জায়গা হলো তাদের। বর্তমান দলে বেশ কয়েকজন তারকা ফুটবলার আছেন, যারা রাশিয়ায় ঝলক দেখাতে পারেন। মৌসা সো, পেপে কন্তে, ম্যামে বিরাম ডিউফ, সাদিও মানের মতো তারকারা প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেন।
২০০২ সালে দলের অধিনায়ক আলিও সিসেই এখন সেনেগাল দলের কোচ। ২০১৫ সালের পর থেকে সেনেগালকে কোচিং করাচ্ছেন তিনি। ক্যারিয়ারে সেনেগাল অনূর্ধ্ব ২৩ দল এবং খেলোয়াড়ি জীবনে লিলে, পিএসজি, বার্মিংহাম সিটির মতো ক্লাবগুলো দাপিয়ে বেড়ান আলিও।
দলগুলো হচ্ছে সৌদি আরব, ইরান, তিউনিসিয়া, মরক্কো, মিসর, নাইজেরিয়া ও সেনেগাল।
আপনার মন্তব্য