প্রকাশিত: ২০২৬-০৬-২৯ ১৯:৫৩:৫৫
হাসান মুরাদ:
স্বীকার করে নিচ্ছি — আমি পক্ষপাতদুষ্ট। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে দিয়ে ঘুমাই এমন না, কিন্তু কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে দিবু যখন ফ্রান্সের চতুর্থ পেনাল্টি ঠেকিয়ে দিল, সেদিন রাস্তায় বেরিয়ে চিৎকার করেছিলাম। প্রতিবেশীরা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সেই আমি যখন 'আর্ট অফ ফুটবল' পড়তে বসলাম, তখন বুঝতে পারিনি বইটা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে।
মাসুদ পারেভজ রুপাই আমার মতোই একজন মানুষ। মেসির জন্য পাগল, আর্জেন্টিনার জন্য পাগল, এবং সেই পাগলামিকে লুকানোর কোনো চেষ্টা নেই তার। বইয়ের ভূমিকা পড়েই বুঝলাম — ইনি আমার লোক।
বইটা হাতে নেওয়ার পর প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ল সেটা হলো উৎসর্গ। মেসিকে নয়, উৎসর্গ গেছে দিবুকে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। সেই মুহূর্তে মনে মনে বললাম — এই লেখক বোঝেন। সত্যিকারের আর্জেন্টিনা সমর্থক জানেন, কাতারের বিশ্বকাপটা শুধু মেসির একার কীর্তি ছিল না। দিবু না থাকলে সেমিফাইনালে হয়তো শেষ হয়ে যেত সব। লেখক সেটা বুঝেছেন এবং স্বীকার করেছেন। এই স্বীকারোক্তিতেই বইটার প্রতি আমার বিশ্বাস জন্মে গেল।
এরপর থেকে একটানা পড়ে গেছি।
মেসির শৈশবের অধ্যায়টা পড়তে পড়তে একটা জায়গায় থামলাম। ছোট্ট মেসি, বয়স ছয়, কোচ মার্কিনি বললেন গোল করলে চকোলেট পাবে। সেই শিশু চোখের পলকে বল এনে হেডে গোল দিল। এই দৃশ্যটা পড়ে হাসলাম। তারপর মনে হলো — এই ছেলেটা জানত না সে একদিন বিশ্বের সেরা হবে, কিন্তু গোলটা দিয়েছিল যেন পৃথিবী জয় করছে। সেই একই ছেলে পঁচিশ বছর পর কাতারে কাপ তুলে ধরেছে। এই গল্পটা বারবার পড়লেও গায়ে কাঁটা দেবে।
হরমোন ডেফিসিয়েন্সির অধ্যায়টা পড়তে একটু কষ্ট লাগল। দরিদ্র পরিবার, প্রতিদিন ৯০০ মার্কিন ডলারের ইনজেকশন, সেই ভার বহন করা সম্ভব ছিল না। রিভার প্লেট সাইন করাতে চেয়েও পারেনি। তারপর বার্সেলোনার সেই নাপকিনের গল্প। কার্লেস রেক্সাশ জানতেন কাগজটা আইনত মূল্যহীন, তবু সই করলেন — কারণ ওই শিশুকে হারানো যাবে না। এই একটা সিদ্ধান্ত ফুটবলের ইতিহাস বদলে দিয়েছে। লেখক এই মুহূর্তটা এত সুন্দর করে ধরেছেন যে মনে হলো আমি নিজে সেই রেস্তোরাঁয় বসে আছি।
জাতীয় দলের হতাশার অধ্যায়গুলোতে এসে বুকটা একটু ভারী হয়ে গেল। এই কষ্টটা আমার নিজেরও। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল, ২০১৫ কোপা ফাইনাল, ২০১৬ কোপা ফাইনাল — একের পর এক হার। মেসি যখন অবসর ঘোষণা করলেন, সেদিন সত্যিই মনে হয়েছিল ফুটবল দেখা ছেড়ে দেব। লেখক এই যন্ত্রণার কথা লিখেছেন সরাসরি, কোনো মেকি সান্ত্বনা ছাড়া। সেটাই ভালো লেগেছে। সত্যিকারের সমর্থক জানেন সেই রাতগুলো কেমন ছিল।
তারপর স্ক্যালোনি এলেন। এই অধ্যায়টা পড়তে পড়তে মনে মনে একটা কৃতজ্ঞতা জন্মাল। লেখক বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে স্ক্যালোনি আর্জেন্টিনাকে মেসির চারপাশে সাজিয়ে দেননি, বরং পুরো দলটাকে এমনভাবে তৈরি করেছেন যাতে মেসি নিজের খেলা খেলতে পারেন। এই পার্থক্যটা ছোট মনে হয়, কিন্তু ফলাফল দেখলেই বোঝা যায় কতটা বড়।
কোপা আমেরিকা ২০২১ জেতার পর মেসির চোখে জল দেখেছিলাম। সেই দৃশ্যের কথা লেখকও লিখেছেন। দীর্ঘ ২৮ বছর পর আর্জেন্টিনার মেজর কোনো শিরোপা। গোল্ডেন বল এবং গোল্ডেন বুট — মেসি যেন একাই পুরো টুর্নামেন্টটা কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। এই অধ্যায়টা পড়ে মনে হলো সেই রাতগুলো আবার বেঁচে গেলাম।
কাতার বিশ্বকাপের বিবরণে এসে বইটা যেন গতি পেল। ফাইনালের বর্ণনা পড়তে পড়তে হাত কাঁপছিল। তিন গোলে এগিয়ে থেকে ফ্রান্সের সমতা, অতিরিক্ত সময়, পেনাল্টি — এই পুরো অংশটা লেখক এমনভাবে লিখেছেন যেন একটা থ্রিলার। যারা সেই রাতটা দেখেছেন তাদের বুকের ভেতর আবার সেই অনুভূতিটা ফিরে আসবে। আর যারা দেখেননি তারাও বুঝতে পারবেন কেন লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই রাতে কাঁদছিলেন।
মেসি ট্রফি তুলে ধরার মুহূর্তে আমি প্রথমবার বইটা রেখে দিলাম। চোখ মুছলাম। এই কথা স্বীকার করতে লজ্জা নেই।
বইয়ের একটা দিক বিশেষভাবে ভালো লেগেছে — লেখক মেসির আশেপাশের মানুষদের ভুলে যাননি। দিবু পেয়েছেন উৎসর্গ, স্ক্যালোনি পেয়েছেন আলাদা মনোযোগ, এমনকি সেই মার্কিনি — যে কোচ ছোট্ট মেসিকে চকোলেটের লোভ দেখিয়েছিলেন — তার কথাও আছে। এটা দেখায় লেখক শুধু মেসির ব্যক্তিগত জাদু নিয়ে আটকে নেই, বুঝতে চেষ্টা করেছেন এই মহাকাব্যটা আসলে কতজনের মিলিত কীর্তি।
একটা জায়গায় অবশ্য মনে হলো আরেকটু পেলে ভালো হতো। কিছু কিছু গোলের মুহূর্ত — ধরুন গেতাফের বিরুদ্ধে সেই একক ৬০ মিটারের যাত্রা, বা ২০১৮ বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে সেই বুক ট্রাপ থেকে ভলি — এই মুহূর্তগুলো আরও কাছ থেকে দেখতে চেয়েছিলাম। ঠিক কোন মুহূর্তে মেসির পা নাচছে, মাথা কী হিসাব করছে — সেই খুঁটিনাটিতে আরেকটু থাকলে মজা পেতাম। কিন্তু এটা আমার লোভ, বইয়ের দোষ নয়।
বাংলায় ফুটবল নিয়ে লেখালেখি খুব বেশি নেই। মেসিকে নিয়ে তো আরও কম। সেই জায়গায় মাসুদ পারেভজ রুপাই যে কাজটা করেছেন সেটা সাহসের। ফুটবলীয় নতুন বাংলা শব্দ তৈরির চেষ্টাটা একটু অপ্রচলিত লাগলেও, মনটা খুশি হয়। আমাদের ভাষায় ফুটবলের গল্প বলার একটা আলাদা মজা আছে।
একজন কড়া আর্জেন্টিনা সমর্থক হিসেবে বলছি — এই বই আপনার পড়া উচিত। মেসিভক্ত হলে তো অবশ্যই। আর যদি মেসিকে না-ও চেনেন, তবু পড়ুন। একটা মানুষের জীবনে স্বপ্ন-পূরণের গল্প এত সুন্দর করে খুব কম বইয়ে পাওয়া যায়।
শেষে একটাই কথা — মেসি আর ফুটবল একে অপরের সমার্থক শব্দ। লেখকও সেটা বিশ্বাস করেন। আমিও করি। আপনি করলে এই বই আপনার জন্য।
আর্ট অফ ফুটবল | মাসুদ পারভেজ রুপাই | চৈতন্য, সিলেট | মূল্য: ৫০০ টাকা
আপনার মন্তব্য