১৩ অক্টোবর, ২০১৫ ২৩:১৩
সিলেটের কাজলশাহ এলাকা থেকে 'নিখোঁজ' হওয়া তিন শিশুকে ফুফুর জিম্মায় পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আজ বিকেলে তিন শিশুকে আদালতে তুলে সমাজসেবা অফিসের সেফ হোমে পাঠানোর আবেদন করলে আদালত তাদের ফুফু জ্যোৎস্না বেগমের জিম্মায় পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
সৎ মায়র যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ হয়ে কাজলশাহ'র বাসা থেকে গত বুধবর চলে গিয়েছিলো তিন ভাইবোন আছিয়া(১২), সাদিয়া(৪) ও ইরহামকে(৩)। গত সোমবার তাদের সুনামগঞ্জ থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এসময় পুলিশের কাছে শিশুরা সৎমায়ের নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরে সৎ মায়ের কাছে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানান।
শিশুদের অস্বীকৃতির কারনে মঙ্গলবার তাদের সেফ হোমে পাঠানোর জন্যা আদালতে আবেদন করেন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মাসুদ রানা। এসময় শিশুদের ফুফু জ্যোৎস্না বেগমও তাঁর জিম্মায় শিশুদের নেওয়ার আবেদন করেন। সিলেট মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক আনোয়ারুল করিম তাদের ফুফুর কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তবে এরকম অবস্থায় শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারুক উদ্দিন সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এরকম শিশুদের বিশেষ ব্যবস্থায় লালন পালনের জন্য সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে।
লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মাসুদ রানা জানান, বুধবার বিকেলে ঘর ছাড়ে শিশু তিনটি, উদ্দেশ্য ঢাকা পালানো। সিলেটের কাজলশাহ এলাকার বাসা থেকে বেড়িয়ে সোজা চলে যায় সিলেট রেল স্টেশনে। তারপর ট্রেনধরে ঢাকায়। ট্রেনেই পরিচয় এক যুবকের সাথে। কামরুল ইসলাম নামে ওই যুবক শিশুদের সাথে কাউকে না দেখে তাদের পাশে এসে দাঁড়ান।
প্রথমে কয়েকদিন ঢাকায় নিজের বাসায় রাখলেন তিনি। এরপর শিশুদের বুঝিয়ে সিলেটে তাদের বাসায় ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুতেই মানাতে পারেননি। অগত্যা কামরুল ইসলাম সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজর এলাকায় তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন।
পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তার শিশুদের সিলেট কোতোয়ালী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন তিনি। এরপর থেকেই পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখা হয় তাদের।
উদ্ধারের পর আছিয়া সিলেটটুডেকে জানায়, “খুব কষ্টে ছিলম। প্রায়ই বকা দিতো, মারধর করতো”।
এখন কোথায় যাবে? উত্তরে আছিয়া বললো, “জানিনা”। জানতে চাইলাম, বাবাতো তোমাকে নিতে এসছেন? তখন ঝটপট বলে দিলো “সেখানে আর যাবোনা”। “কেনো”? অনেকবার জিজ্ঞেস করেও এ ব্যাপারে আর কোনো কথা বেরুয়নি তার মুখ থেকে।
পরে কথা হলো উপপরিদর্শক মো. মাসুদের সাথে। তিনি দোয়ারাবাজার থেকে তাদের থানায় নিয়ে এসছেন। ঐসময়টুকু দেখভালে তিনি ছিলেন। নিজের সন্তানের মতোই শিশুদের ছিলো তার আবেগী প্রকাশ।
মাসুদ জানালেন, বাবার সংসারে অত্যাচার আর মানসিক চাপে শিশুরা অনেকটাই ভেংগে পড়েছে। তবে, আপাতত: তাদের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখা হবে। তাদের কোনো কষ্টই হবেনা বলেও আশ্বাস দিলেন তিনি।
জানা যায়, আছিয়ার বাবা দুলাল তিনটি বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রীর ঔরসজাত আছিয়া। জন্মের আটমাস পর আছিয়ার মা স্বামী ও মেয়েকে ছেড়ে চলে যান। পরে আরেকটি বিয়ে করে আছিয়ার বাবা। স্ত্রীর ঔরসে জন্ম নেয় সাদিয়া ও ইরহাম। কিছুদিন পর দ্বিতীয় স্ত্রীও চলে যান। এরপর তৃতীয়দফায় বছরখানেক আগে সেলিনা বেগমকে বিয়ে করেন দুলাল আহমেদ। তিন শিশু সৎমায়ের সংসারেই থাকতো।
উদ্ধারের খবরে মঙ্গলবার রাতেই খবর পেয়ে থানায় ছুটে আসেন শিশুদের বাবা ও তার স্বজনেরা। দুলাল আহমেদ জানান, মেয়েকে একটু আধটু শাসন করতেন। বাবা হিসেবে মেয়েকে শাসন করার অধিকার আছে। বাধ্য হয়েই একাধিক সংসার করতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিশুদের জন্যই আমি বারবার সংসার করছি। সবকিছুর পরেও সন্তানদের বাসায় ফিরিয়ে নিতে চাইছেন তিনি।
আপনার মন্তব্য