১৪ অক্টোবর, ২০১৫ ০০:৪৬
অসংখ্য অপরাধ করেও শত শত অপরাধী ধরাছোঁয়ার বাইরে আর কোনো অপরাধ না করেই কারাগারে ২২ বছর কেটে গেল সিলেটের ফজলু মিয়ার। কত বছর বয়সে ফজলু কারাগারে ঢুকলেন কিংবা এখন ফজলুর বয়স কত তার সঠিক কোনো হিসাব কারো কাছে নেই। হিসেব থাকার উপায়ও নেই। জীবনের সকল হিসেব নিকেশই যার উলটপালট করে নিয়েছে কারাজীবন।
তবে হিসাব একটা পাওয়া গেল কারাগারের নথিপত্র ঘেঁটে। সেখানে দেখা যায় তাঁর জীবন থেকে যে ২২টি বছর চলে গেছে। গ্রেফতার হবার সময় টগবগে যুবক থাকলেও এখন তিনি বায়োবৃদ্ধ, ঠিকমতো হাঁটতেও পারছেন না । কথাও জড়িয়ে আসে তাঁর।
"বাঁচলেও গজব, মরলেও গজব"। কারাগারে নতুন কেউ গেলে এই ডায়লগই শুনিয়ে দেন ফজলু মিয়া। অপরাধী কিংবা অপরাধের সন্দেহে আটকদের সাথে সুখ দুঃখের আলাপে কাটে তাঁর সময়। সিলেট কারাগারে বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে যারা হাজতে ছিলেন তারা অনেকেই ফজলু মিয়াকে চেনেন। এরকম একজন বললেন- "ফজলু মিয়া অসাধারণ এক মানুষ, তাঁর মত লোক কীভাবে এতদিন কারাগারে আছেন বোধগম্য নয়। তাকে দ্রুত মুক্তি দেয়া হোক"।
১৯৯৩ সালের ১১ জুলাই সিলেটের আদালতপাড়া থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে ফজলুকে আটক করেন তৎকালীন ট্রাফিক সার্জেন্ট জাকির হোসেন। সন্দেহের বশে ৫৪ ধারায় ফজলুকে ধরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। তারপর ফজলুর বিরুদ্ধে ‘বাংলাদেশ মানসিক স্বাস্থ্য আইনে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ।
পরে ২০০২ সালে ফজলুকে কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। এই আদেশের পরও কেটে গেছে ১৩টি বছর। কিন্তু কারাফটক পেরুতে পারছেন না ফজলু।
এ বিষয়ে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার ছগির মিয়া বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ যাই থাক না কেন,আমরা তো গেটের বাইরে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারি না। সমাজসেবা কর্তৃপক্ষ তাদের সেই দায়িত্বটা পালন করতে পারেনি।’
তিনি বলেন, ‘মূল বিষয়টা যাই হোক না কেন, অন্য কর্তৃপক্ষকে আমার কর্তৃপক্ষ… যারা আইনের এ ব্যাখ্যাকে বাইপাস করার জন্য বা নিজে বাঁচার জন্য হয়তো বা অন্য কোনোভাবে ব্যাখ্যা দেবে যে তার আত্মীয়স্বজন পাওয়া যায় নাই। কিন্তু অবশ্যই তার আত্মীয়স্বজন আছে।’
আদালতের চোখে কোনো অপরাধ না করেও এ পর্যন্ত অন্তত ১৯৭ বার আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে ফজলুকে। দীর্ঘ এই ২২ বছরে সুরমায় জল গড়িয়েছে অনেক। সরকার বদল হয়েছে কয়েকবার। শহর সিলেট নগরী হয়ে উঠেছে। পৌরসভা আজ হয়েছে সিটি কর্পোরেশন , তেমনি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা মামলাটি কোতোয়ালি থানার পরিবর্তে চলে গেছে দক্ষিণ সুরমা থানার অধীনে। কিন্তু এতকিছুর পরও ফজলুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের কোনো কূলকিনারা হয়নি আজও।
ফজলুকে ছাড়িয়ে আনতে ২০০৫ সালে হাইকোর্টে একটি রিট করে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র। কিন্তু তারপরও আইনের মারপ্যাঁচের কারণে এখনো কারাগারেই বসবাস ফজলু মিয়ার।
এ বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘যদি তাঁর দোষ খুঁজতে হয়, তাঁর অন্যায় খুঁজতে হয়, এ টুকুই বলতে পারি –এ রকম একটা সমাজে ফজলু মিয়া জন্মগ্রহণ করেছে, যে সমাজ এ মানুষগুলোর প্রতি এত অসংবেদনশীল আচরণ করতে পারে।’
সময় যতই গড়াচ্ছে, আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে ফজলুর কারাবাসের সময় ততই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফজলু কবে ছাড়া পাবেন কিংবা ছাড়া পেলেও আদৌ খুঁজে পাবেন কি না নিজের ঠিকানা সে প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর কারোই জানা নেই।
আপনার মন্তব্য