১৯ জুলাই, ২০২০ ০২:৩৯
শুধু সরকারি চাকুরির নামেই প্রতারণা নয়। আরও নানাভাবেই মানুষকে প্রতারিত করেছেন মাধবপুরের প্রতারক দেলোয়ার হোসেন খোকন।
কয়েক বছর ধরে সরকারি চাকুরী দেয়ার নামে নিজেকে কখনো স্বরাষ্ট্র সচিব, আবার কখনো তথ্যসচিব, কখনো বা এলজিআরডি নতুবা সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের সচিব পরিচয় দিতো সদ্য গ্রেপ্তার হওয়া মাধবপুরের প্রতারক দেলোয়ার হোসেন খোকন। ওই সব কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে সুবিধা করতে না পারলে নিজেকে নৌ বাহিনীর কর্মকর্তাও পরিচয় দিতো। এরপর সে টাকা হাতিয়ে নিতো। বহুরূপী এই প্রতারকের প্রতারণার শুরুটা ছিলো একটু ভিন্ন।
সরেজমিনে গেলে ৫ম শ্রেণি পাস করা এই প্রতারকের প্রতারণার শুরুর কাহিনী জানান গ্রামবাসী ও আশপাশের লোকজন।
গ্রামবাসী জানান, প্রতারণার শুরু থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত সে সুন্নী মহা সম্মেলনের আয়োজক সেজে জনপ্রিয় বক্তা গিয়াসউদ্দিন আত-তাহেরি, ওয়ালিউল্লা আশেকী, এনায়েত উল্লাহ আব্বাসী, শেখ সাদি আব্দুল্লা, শাহালম জিহাদী, মন্নান জিহাদিসহ বড় বড় তারকা বক্তাদের নাম ভাঙিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলে প্রতারণা করতো এই খোকন।
এ ছাড়া কচুয়া দরবার শরীফ, খান্দুরা দরবার শরীফের খাাদেমদেরকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাদেরকে নিজের বশে এনে দরবার শরীফে যাওয়া মুরিদানের টাকা আত্মসাত করতো। তাছাড়া বরুড়া পূর্ব পাড়া (বানেশ্বরপুর) জামে মসজিদের দান বাক্সের টাকা চুরির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সে মসজিদের দান বাক্সের টাকা চুরি করেই গায়েব হয়ে যায়। কয়েক বছর পর ফিরে এসে নিজেকে কোটিপতি হিসেবে জাহির করতে থাকে আর প্রচার করতে থাকে সে নৌ-বাহিনীতে চাকরি করে। আর সেই সুবাদে স্বরাষ্ট্র সচিব, আবার কখনো তথ্যসচিব, কখনো বা এলজিআরডি নতুবা সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বিভিন্ন সচিবের সাথে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
এনএসআই ও ডিবি সূত্রে জানা যায়, মাধবপুর উপজেলার বানেশ্বরপুর গ্রামের বাসিন্দা এক সময়ের পুরাতন কাপড় বিক্রেতা আবুল হোসেনের ছেলে দেলোয়ার হোসেন খোকন (৪২) দীর্ঘদিন ধরে টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন কার্যালয়ের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাক্ষর সীল তৈরি করে চাকুরির নিয়োগপত্রের ব্যবসা করে আসছে।
গোপন সুত্রের সংবাদের ভিত্তিতে হবিগঞ্জ এনএসআই অনুসন্ধান করে ঘটনার সত্যতা পায়। পরে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাা গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জেলা এনএসআই হবিগঞ্জ এর নেতৃত্বে ডিবি পুলিশের একটি টিম বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১০ টায় বানেশ্বরপুর গ্রামে অভিযান চালায়।
এসময় প্রতারক চক্রের হোতা দেলোয়ার হোসেন খোকনকে তার নিজ বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নকল সীল, ভূয়া নিয়োগপত্র ও নগদ ৫ হাজার টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।
এনএসআই ও ডিবির যৌথ জিজ্ঞাসাবাদে অন্তত ২০ লোকের কাছ থেকে চাকুরী দেওয়ার নামে প্রায় লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে গ্রেপ্তার দেলোয়ার হোসেন খোকন স্বীকারোক্তি দেয়। এব্যাপারে ডিবি পুলিশ বাদি খোকনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে।
এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী সূত্র জানায়, খোকন শুধু সরকারি চাকরির নামে প্রতারণা করেই ক্ষান্ত হয়নি। প্রতারক দেলোয়ার হোসেন খোকনের নামে হবিগঞ্জ নারী শিশু আদালতে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা এক মামলার তদন্ত করতে গিয়ে খোকনের অন্তরালের খবর বের করে আনেন মাধবপুর থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) সাজেদুল ইসলাম পলাশ।
বিজ্ঞাপন
তদন্তে বেরিয়ে আসে মাধবপুর উপজেলার ধর্মঘর ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামের মোহন মিয়া বাদী হয়ে তার স্কুল পড়ুয়া মেয়েকে অপহরণ ও ধর্ষনের অভিযোগ এনে মামলা দায়েরের কথা।
ওই মামলাটি আদালতের নির্দেশে মাধবপুর থানায় মামলাটি এফআইআর হয়। যার নং ১১/১৬।
তদন্তে জানা যায়, কখনও নিজের নাম ঠিকানা গোপন রেখে ছদ্মনামে নিজেকে চাকুরীজীবি পরিচয়ে মোবাইল ফোনের দীর্ঘদিনের প্রেমের কারণে খোকনের হাতধরে পালিয়ে যায় স্কুল পড়ুয়া মোহন মিয়ার মেয়ে।
তদন্তের স্বার্থে এজাহারে উল্লেখ করা মোবাইলের কললিষ্ট ও বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হলে বেরিয়ে আসে খোকন বিগত ৭-৮ বছর আগে কুয়েতে গিয়ে অবস্থাানকালে সেখান থেকে মোবাইল ফোনে বগুড়ার মমতাজ বেগম নামে এক কিশোরীকে বিয়ে করে।
দেশে এসে খুলনা থেকে তাকে নিয়ে এসে প্রায় ২ বছরের সংসার জীবনে খোকনের চরিত্র তার কাছে প্রকাশ পেতে থাকে। সংসারের টানাপোড়ন থাকায় স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে মমতাজ বগুড়া বাবার বাড়ী চলে গেলে ভবানীপুর গ্রামের ফুলমিয়ার মেয়ে সেলিনা আক্তারকে বিয়ে করে।
সেলিনার কোল জুড়ে আসে দুটি সন্তান। স্ত্রী সন্তানদের ফেলে ধর্মঘর একই ইউনিয়নের বীরসিংহ পাড়ার তিতু মিয়ার অনার্স পড়ুয়া কন্যা সোনিয়া আক্তারের সাথে মোবাইলে প্রেমের সর্ম্পক তৈরী করে ২০১৬ সালের ১৯ জুন জাল জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে হবিগঞ্জ নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে করে ৫লক্ষ টাকা দেন মোহরে।
৪র্থ পর্যায়ে মোহনপুরের মোহন মিয়ার মেয়ের সাথে মোবাইলে নিজেকে নৌ বাহিনীর অফিসার পদে চাকুরীজীবি পরিচয় দিয়ে প্রেমের সর্ম্পক গড়ে তোলে।
বিয়ের প্রলোভন দিয়ে ওই মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন হোটেলে রাত্রি যাপন করে পরপর ৭দিন কাটিয়ে ঢাকা এয়ারপোর্ট রেল ষ্টেশনে রেখে পালিয়ে যায় খোকন।
এ ঘটনায় মোহন বাদী হয়ে অপহরণ ও ধর্ষণ মামলা করে। আর এই মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে মাধবপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাজেদুল ইসলাম পলাশ দীর্ঘদিন তদন্ত করে প্রতারক খোকনের বিয়ে খেলার রহস্য উন্মোচন করেন।
খোকন নিজেকে কখনও এমপি, মন্ত্রির ও সচিবের ঘনিষ্টজন পরিচয় দিয়ে চাকুরীর লোভ দেখিয়ে এলাকার নিরীহ সরল মনা যুবকদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। তার প্রতারণার শিকার থেকে বাদ যায়নি পুলিশ আর সাংবাদিকও।
স্থাানীয় সুত্রে জানা যায়, মাধবপুর উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের বানেশ্বরপুর গ্রামের আবুল হোসেন চৌমুহনী বাজারে ফুটপাতে বসে কাপড় বিক্রয় করতেন। তাকে সহযোগিতা করতেন তার ছেলে খোকন। ৭-৮ বছর আগে খোকন কাজের জন্য কুয়েত চলে যান। সেখানেও খোকন বিভিন্ন অপরাধ করলে স্থাানীয় বাংলাদেশীরা তাকে দেশে পাঠিয়ে দেন।
কুয়েত ফেরত খোকন ঢাকায় প্রাইভেট কোম্পানীতে কিছু দিন চাকুরী করার পর এলাকায় এসে প্রচার করে বিভিন্ন সচিব তার ঘনিষ্টজন।
এই সচিবদের মাধ্যমে চাকরি দেওয়ার নাম করে এলাকার যুবকদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়।
পুলিশ সুত্রে জানা যায়, চাকুরী দেওয়ার লোভ দেখিয়ে খোকন কুষ্টিয়ার এক পুলিশ অফিসারের আত্মীয়ের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। এ বিষয়ে ঢাকা সিএম আদালতে দায়েরকৃত মামলায় তার বিরোদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা রয়েছে। তার পিতা আবুল হোসেন আর এখনকার স্ত্রী সোনিয়া এবং তার পরিবারের সদস্যসহ অনেক আত্মীয়রাও এসবের সাথে জড়িত।
আপনার মন্তব্য