জুড়ী প্রতিনিধি

২০ জুলাই, ২০২০ ১৫:০৬

হাওরপাড়ের মুজিবুল এখন বিসিএস ক্যাডার

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হাকালুকি হাওরপাড়ের শাহপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটি এখন প্রশাসনে বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত। সদ্য প্রকাশিত ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষায় তিনি সহকারী কমিশনার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এর আগে  নির্বাচন অফিসার পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও যোগ দেননি। বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের জুড়ী শাখায় সিনিয়র অফিসার পদে তিনি কর্মরত রয়েছেন।

বলছি অদম্য মেধাবী মুজিবুল ইসলামের গল্প। শৈশব আর দূরন্ত কৈশোরটা কেটেছে গ্রামে। বেশিরভাগ সময় পানির সাথে যুদ্ধ করে চলতে হয়েছে তার শিক্ষাজীবনে। পরিশ্রম আর মেধায় তিনি সফলতার পথ খুঁজে পেয়েছেন। সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র মুজিবুল এবার ৩৮তম  বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছেন।

মেধার দিক দিয়ে বরাবরই তিনি সবার চেয়ে আলাদা। স্কুলে অন্যান্য সহপাঠিদের চেয়ে মেধায়, চিন্তায় সব সময় ছিলেন আলাদা। ২০০৮ সালে জায়ফর নগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে  এসএসসি পাশ করেন। সে সময় তার ফলাফল সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়।

এসএসসি পাশের পর উচ্চমাধ্যমিকে জুড়ী তৈয়বুন্নেছা খানম (ডিগ্রি) সরকারি কলেজে ভর্তি হন তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা প্রবাসী থাকায়, একমাত্র ছেলে হিসেবে বাড়িতে থেকেই লেখাপড়া করতে হয়েছে তাকে। মুজিবুল পায়ে হেটে প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে যাতায়াত করতেন মাধ্যমিক স্কুলে। উচ্চ মাধ্যমিকের কলেজ ছিলো বাড়ি থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে। বাড়ি হাকালুকির পাশে থাকায় বছরের প্রায় ৪-৫ মাস রাস্তায় পানি থাকতো। তখন নৌকা ছিল যাতায়াতের একমাত্র বাহন। তাই বছরের অর্ধেক সময় নৌকা করে এবং বাকী সময় পায়ে হেটে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বাড়ী থেকে পাকা সড়ক পর্যন্ত যাতায়াত করতেন। এভাবেই চলছিল তার জীবন সংগ্রাম। 

তাকে নিয়ে মায়ের স্বপ্ন পাহাড় সমান। তিনিও মায়ের স্বপ্ন বাস্তবে রুপ দিতে মনে প্রাণে লড়ে চলেছেন।

২০১০ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হোন। পরবর্তীতে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নের সুযোগ পান। সেখানেই চলে তার উচ্চ শিক্ষা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষার পর অংশ নেন ৩৭তম বিসিএসে। চয়েস দেন প্রশাসন। এর কারণ তিনি যখন ছোট তখন তার মা সব সময় চাইতেন একমাত্র ছেলে বিসিএস ক্যাডার হবে। ম্যাজিট্রেট হবে। তবে সেইবার প্রশাসনে সুযোগ না হয়ে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন মুজিবুল। এতে পরিবারের পাশাপাশি মন ভরেনি তার নিজেরও। এর আগে ব্যাংকে অফিসার পদে তার চাকরি হয়। তিনি ব্যাংকের চাকরিতে যোগ দেন। বছরখানেক জনতা ব্যাংক বড়লেখা শাখায় চাকরি করার পর সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগদেন বর্তমান কর্মস্থল জুড়ী শাখায়।

যেদিন ফল প্রকাশ হয় সেদিন সারাদিন ব্যস্ত ছিলেন তিনি। এক বন্ধুর মারফত জানতে পারেন বিসিএসের ফল প্রকাশিত হয়েছে। অফিসে নিজের কম্পিউটারটি খুলে পিএসসির ওয়েবসাইটটি লগইন করেন। যখন লগইন করেন তখন বিসিএসের প্রথম থেকে চোখ বুলাতে থাকেন। প্রথমে নিজের নামটি না দেখে হতাশ হন। এরপর দেখেন নিজের প্রথম পছন্দ প্রশাসন ক্যাডারের তালিকা। সেখানে দেখতে পান নিজের রোল নাম্বারটা, যেন কিছইু বিশ্বাস হচ্ছে না। মাকে খবরটা দেয়া মাত্রই শুরু হয় আনন্দের কান্না। অদম্য ইচ্ছা আর নিজের প্রতি আত্মবিসশ্বাসই এবং পরিবারের উৎসাহ-প্রেরণা পৌছে দিয়েছে তাকে অনন্য উচ্চতায়। যেখানে পরীক্ষা দিয়েছেন সেখানেই হয়েছেন সেরা।

জীবনে সবচেয়ে কষ্ট হলো তিনি যে এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছেন সেই গ্রামটি একেবারেই অজপাড়াগা। চারদিকে হাওর থাকায় রাস্তগুলো থাকে পানির নিচে। কখনও রাস্তায় পানি না থাকলেও বেশির ভাগ সময় কাদায় থাকে ভরপুর। প্রাথমিক স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল কিংবা কলেজ জীবনে পায়ের জুতা হাতে নিয়ে যেতে হয়েছে বিদ্যালয়ে। এসব দেখে অনেকেই তখন হাসাহাসি করতো। তবে একমাত্র মায়ের স্বপ্নের জন্যই নিজে হয়েছেন বিসিএস ক্যাডার। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাহস আর উদ্দীপনা দিতেন মা। সবাই যখন ঘুমিয়ে যেত তখনো জেগে থেকে চা করে দিতেন তিনি।

কলেজ জীবন শেষ করে যখন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোন সেখানে বেশির ভাগই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। অথচ কয়েকজন মানুষ তাকে রাজনীতিতে না জড়িয়ে ভালো করে পড়াশোনার তাগিদ দিতেন। তাদের মধ্যে শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইমরান খান এবং জুড়ী উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখরুল ইসলাম অন্যতম। কর্মক্ষেত্রে যেখানেই থাকেন সব সময় প্রচেষ্টা থাকবে জুড়ীর মানুষের জন্য কিছু করা। বিশেষ করে নিজ এলাকা শাহপুরের অবহেলিত এলাকার জন্য কাজ করলে নিজের প্রশান্তি আসবে বলে এ প্রতিবেদকে জানান তিনি।

মুজিবুলের পাশাপাশি জুড়ী উপজেলায় ৩৮ তম বিসিএসে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছেন সুশান্ত নামের আরেকজন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত