তাহিরপুর প্রতিনিধি

২১ জুলাই, ২০২০ ২০:১১

আফালে ক্ষতবিক্ষত হাওরপাড়ের গ্রাম

বর্ষায় পানি বৃদ্ধির সাথে হাওরে দেখা দেয় বিশাল বিশাল ঢেউয়ের। স্থানীয়দের কাছে যা আফাল নামে পরিচিত। হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের কাছে এক আতঙ্কের নাম আফাল। আফালে বসতভিটায় পানি আছড়ে পড়ে ভাঙ্গনের শিকার হয় অনেক এলাকা।

প্রতি বছরেই ঢেউয়ের কবল থেকে বসত বাড়ি রক্ষায় সর্বশক্তি দিয়ে পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করে চলে হাওরবাসী। কিন্তু এই দূর্ভোগের প্রতিকারে সরকারী কোন উদ্দ্যোগ আজও গ্রহণ করা হয় নি। অথচ হাওরবাসী হাওরের গ্রামগুলোতে প্রতিরক্ষা দেওয়ালের জন্য দাবী জানিয়েছে আসছেন বার বার।

হাওর বেষ্টিত তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, হাওরের মধ্যে গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক দ্বীপসাদৃশ্য গ্রামগুলো দূর থেকে মনে হয় পানির ওপর ভাসমান। বর্ষায় বিরূপ আবহাওয়ায় বড় বড় ঢেউ আছড়ে পরায় ক্ষত বিক্ষত হয় বসত বাড়ি। বসতভিটের সামনে বাঁধ সঠিকভাবে না দেওয়া বা দুর্বল  বাঁধের কারণে সহজেই হাওরপাড়ের গ্রামগুলো ঢেউয়ের কবলে পড়ে ভাঙনে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।  এবার পর পর বন্যায় অধিকাংশ গ্রামের লোকজই নিজ বাড়ি ছেড়ে গ্রামের উঁচু বাড়িগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। পরিবারে গবাদিপশু ও সংগ্রহ করা পশুখাদ্য(খড়)পানিতে ডুবেছে।

আবার বন্যার পানির সাথে হাওর এলাকায় দমকা বাতাসে বড় বড় ডেউয়ের কারনে হাওরের দুশতাধিক বসত বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবারও তৃতীয় বারের মত বন্যার আশংকায় উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় হাওরবাসী।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বৈশাখে ফসল তোলার পরই বাঁশ, চাটাই ও গাছপালার ডাল দিয়ে বাড়ির সামনে মজবুত করে বাঁধ দেওয়া হত। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে বেশিরভাগ বাড়ির বাঁধই মেরামত করা হয়নি। কারণ হিসাবে তারা জানান, ১৯৯৮সালের বন্যার পর থেকে হাওরে দীর্ঘমেয়াদি ভরা বর্ষা হচ্ছে না। ২০০৪ সালে বন্যা হলেও স্থায়িত্ব কম ছিল। কিন্তু এ বছর দু সাপ্তার ব্যবধানে দুই বার বন্যা হয়েছে।

টাংগুয়ার হাওর পারের মানিকখিলা ও গোলাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা শাহজাহান ও হাদিউজ্জামান বলেন, টাংগুয়ার হাওরপাড়ের শতাধিক গ্রামের প্রতিটি বাড়ির বসতভিটা ঢেউয়ের কারণে ভাঙনের কবলে পড়েছে। লোকজন প্রাণপণ চেষ্টা করছে বসতভিটা রক্ষায়। কিন্তু বাঁশ ও বনসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব ও অব্যাহত পানি বৃদ্ধির কারণে ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে লড়াই করতে পারছে না অসহায় মানুষ। তারা পেটে ভাত দিবে না ঘর বাঁচাবে এ নিয়েই দিশেহারা।

বিজ্ঞাপন



উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের মাটিয়ান হাওর পাড়ের ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা আকবর মিয়া বলেন, এবার অধিকাংশ বসতভিটে হাওরের ঢেউয়ে ভেঙে গেছে। এ সকল পরিবারে গবাদিপশু ও সংগ্রহ করা পশুখাদ্য (খড়) পানিতে ডুবেছে। বাধ্য হয়ে গ্রামের প্রতিটি পরিবার তাদের গবাদিপশুসহ নিজদের বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় ও জয়পুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় কেন্দ্র আশ্রয় নিয়েছে।  গ্রামের চার পাশে প্রতিরক্ষা দেওয়াল তৈরির দাবী জানিয়ে আসলেও কোন কাজ হচ্ছে না।

তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের শনির হাওর পাড়ের কৃষক বীরনগর গ্রামের সবুজ মিয়া জানান, শনির হাওরের উত্তাল ঢেউ থেকে বসতঘর রক্ষায় সবাইকে নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন বর্ষার শুরু থেকেই। পেটে ভাত দিমু না ঘর বাঁচামু জানি না। বসতভিটের সামনে বাঁধ সঠিকভাবে না দেওয়া ও দুর্বল ঢেউরক্ষা বাঁধের কারণে সহজেই হাওরপাড়ের গ্রামগুলো ঢেউয়ের কবলে পড়ে ভাঙনে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যুগযুগ ধরে।          

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সঠিকভাবে হাওর পাড়ের বসতভিটের সামনে ঢেউরক্ষা বাঁধ না থাকার কারণে সহজেই গ্রামগুলো ঢেউয়ের কবলে পড়ে ভাঙনে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এখন সময়ের প্রয়োজনে প্রতিটি গ্রামে ঢেউরক্ষা দেয়াল নির্মাণের জোরালো দাবী উঠেছে। না হলে হাওর পাড়ে বসবাসকারী লোকজন পরিবার পরিজন নিয়ে  দূর্ভোগের শেষ থাকবে না।          

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদ্মাসন সিংহ বলেন, বাতাসে সৃষ্ট হাওরের বিশাল বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে ভাঙনের মুখে পড়েছে উপজেলার হাওর পাড়ের গ্রামগুলো। উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। তাদেরসহ বন্যায় আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারে সহায়তা অব্যাহত আছে। 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত