নিজস্ব প্রতিবেদক

০৯ নভেম্বর, ২০২০ ২৩:২২

জনতাই আটক করে আকবরকে

আটক নিয়ে পরষ্পরবিরোধী বক্তব্য পুলিশ ও বিজিবির। ভিডিও প্রকাশে বিব্রত পুলিশ

সিলেট নগরের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে 'নির্যাতনে' রায়হান আহমদ নিহতের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত পুলিশের বহিস্কৃত উপ-পরিদর্শক আকবর হোসেন ভূইয়া ধরা পড়েছেন। রায়হান হত্যার প্রায় একমাস পর আকবরকে ধরতে পারায় জনমনে স্বস্তি থাকলেও তাকে আটকের প্রক্রিয়া ও নানা দাবি নিয়ে দেখা দিয়েছে রহস্য।

সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন দাবি করেছেন, ভারতে পালানোর সময় সোমবার সকালে কানাইঘাট সীমান্ত এলাকা থেকে সাদা পোশাকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

তবে বিজিবি ও পিবিআই'র দাবি, আকবরকে ভারতীয় সীমান্তের অভ্যন্তরে স্থানীয় খাসিরারা আটক করে। এরপর কানাইঘাট এলাকার এক ব্যক্তি তাকে দেশে নিয়ে এসে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন।

বিজিবি ও পিবিআইর বক্তব্যের সত্যতা মিলেছে আকবরকে আটকের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওচিত্রে। ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু যুবক আকবরের হাত পা বেঁধে পাহাড়ি ছড়া দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে আসছেন। এসময় ওই যুবকরা আকবরকে বিভিন্ন প্রশ্নও করেন।

ওই যুবকরা বাংলায় কথা বললেও তাদের শারিরীক গঠন ও কণ্ঠস্বর ছিলো অবাঙালিদের মতো।

গ্রেপ্তারের পর সিলেট পুলিশ সুপার কার্যালয়ে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় আকবর।

কানাইঘাট এলাকার স্থানীয় অনন্ত পাঁচজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ভিডিওতে যে যুবকদের দেখা গেছে তারা খাসিয়া সম্প্রদায়ের এবং যে জায়গার ছবি দেখা গেছে তা ভারতের অভ্যন্তরের।

আকবরকে আটক করা ওই যুবকদের এক প্রশ্নের জবাবে আকবর নিজেও বলেছেন ঊর্ধ্বতনদের পরামর্শে তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন।

বিজিবি’র ১৯ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাঈদ হোসেন বলেন, ‘আকবরকে ভারত সীমান্তের অভ্যন্তরে খাসিয়ারা আটক করেন। পরে তারা সীমান্ত এলাকার রহিম উদ্দিন নামের এক বাসিন্দার সঙ্গে যোগাযোগ করে সীমান্তেই আকবরকে তার হাতে তুলে দেন। আব্দুর রহিমই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে আকবরকে পুলিশে হস্তান্তর করে।’

তিনি বলেন, ‘এটি সীমান্তের একটু দুর্গম এলাকা। আর বিএসএফ বা আমরা বিষয়টি জানার আগে স্থানীয়রাই হস্তান্তর করে ফেলেছেন।’

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আব্দুর রহিম উদ্দিন লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউপির ডোনা সীমান্ত এলাকার মৃত তরফ আলীর পুত্র। আকবরকে কোমরে দড়ি দিয়ে বেঁধে দেশে নিয়ে আসেন তিনি।

পিবিআই সিলেটের বিশেষ পুলিশ সুপার মুহাম্মদ খালেদ-উজ-জামান বলেন, ‘আকবরকে ভারতের অভ্যন্তরের খাসিয়াপল্লির স্থানীয়রা আটক করে পরে বাংলাদেশের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। তবে, কীভাবে হস্তান্তর হয়েছে তা এখনো জানি না।’

আকবরকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় সোমবার সন্ধ্যায় নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন।

বিজ্ঞাপন



এসময় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্রের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় পুলিশ সুপারকে। জবাবে তিনি বলেন, একটি ভিডিও ছড়িয়েছে বলে শুনেছি। তবে সেটি এখনো আমি দেখিনি। আমরা বাংলাদেশের সীমান্ত থেকেই পুলিশের স্থানীয় কিছু বন্ধুদের সহযোগিতায় আকবরকে গ্রেপ্তার করেছি।

তিনি বলেন, পুলিশ সবসময়ই স্থানীয় মানুষদের সহযোগিতায় কাজ করে। এক্ষেত্রেও স্থানীয় মানুষজনের সহযোগিতায় আকবরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সন্ধ্যায় কানাইঘাট থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আকবরকে সিলেট পুলিশ সুপার কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়।

রায়হান হত্যার দুদিন পর আকবর স্থানীয় এক সাংবাদিকদের সহযোগিতায় সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ দিয়ে ভারতের মেঘালয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো বলে এরআগে নিশ্চিত করেছিলো বিভিন্ন সূত্র। স্থানীয় এক সাংবাদিক ও এক দালালের সহযোগিতায় তিনি ভারতে পালান বলে জানায় গোয়েন্দা সূত্র। ইতোমধ্যে সেই দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর আকবরকে পালাতে সহায়তাকারী সাংবাদিক নোমান আহমদ পলাতক রয়েছেন।

এ ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, সে আগে ভারতে পালিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারে। তবে আমরা তাকে সীমান্ত এলাকা থেকেই গ্রেপ্তার করেছি। তিনি বলেন, কানাইঘাট উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ ইউনিয়নের ডোনা সীমান্ত থেকে আকবরকে সাদা পোশাকের পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

ভারতীয় সীমান্ত থেকে আকবরকে ধরে নিয়ে আসা রহিম উদ্দিন।

তিনি বলেন, আকবর কানাইঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে পারে এমন তথ্য আমরা পেয়েছিলাম। সেই তথ্যে রোববার থেকে কানাইঘাট সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়। সকালে সাদা পোশাকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

রাতেই আকবরকে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআইর কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানান তিনি।

গত ১০ অক্টোবর শনিবার মধ্যরাতে রায়হানকে নগরীর কাষ্টঘর থেকে ধরে আনে বন্দরবাজার ফাঁড়ি পুলিশ। পরদিন ১১ অক্টোবর ভোরে ওসমানী হাসপাতালে তিনি মারা যান। রায়হানের পরিবারের অভিযোগ, ফাঁড়িতে ধরে এনে রাতভর নির্যাতনের ফলে রায়হান মারা যান। ১১ অক্টোবর রাতেই রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাদী হয়ে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন।

এ ঘটনায় আকবর ছাড়া আরও তিন পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। তাদের রিমান্ডে নিয়েও জিজ্ঞাসবাদ করা হয়েছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত