মো. বেলাল হোসাইন, জুড়ী:

১২ জুন, ২০২১ ২০:২৪

চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকারি টাকায় ব্যক্তিগত রাস্তা নির্মাণ চেষ্টার অভিযোগ

মৌলভীবাজারের জুড়ী

নিজের ব্যক্তিগত ফলবাগানে যাবার সুবিধার্থে সরকারি টাকায় রাস্তা নির্মাণ চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে এক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ফুলতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুক আহমদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে। ওই ইউনিয়নের ফুলতলা চা বাগানের সংরক্ষিত এলাকার ভেতর দিয়ে তিনি ইটসলিং রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা করছেন। এনিয়ে চা শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

তবে ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুক আহমদের দাবি, চা বাগানের সেকনের রাস্তটি এলজিইডির আইডিভুক্ত। তিনি জনস্বার্থে এই সড়কটি নির্মাণ করছেন।

এ ঘটনায় শনিবার (১২ জুন) দুপুরে ফুলতলা ও এলবিনটিলা চা বাগানের শ্রমিক ও সাধারণ লোকজন সংসাদ সম্মেলন করেছেন।



এরআগে গত শুক্রবার (১১ জনু) শ্রমিকরা পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী এবং স্থানীয় সাংসদ মো. শাহাব উদ্দিনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলন ও স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, ইউপি চেয়ারম্যান মাসুক আহমদ ফুলতলা চা বাগান সংলগ্ন হারারগন্জ্ ও নহরপুর সরকারি সংরক্ষিত বনভূমি দীর্ঘদিন থেকে জবর দখল করে লেবু, সুপারি, কমলা, আনারসসহ বিভিন্ন জাতের ফলের বাগান করেছেন। স্থানীয় চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় ভয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। ইতিপূর্বে বনবিভাগের পক্ষ থেকে চেয়ারম্যানের জবর দখল করা ভূমি উদ্ধার করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে মাঝপথে অদৃশ্য কারণে তা থেমে যায়। চেয়ারম্যান তার জবরদখলকৃত ভূমির ব্যক্তিগত ফলবাগান (আদাবাড়ি) যাবার জন্য কৌশলে এলজিইডির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে বাগানের সেকশনের ভেতর দিয়ে রাস্তা তৈরির খসড়া ম্যাপ করেন। সম্প্রতি তিনি ফুলতলা চা বাগানের ২২ নম্বর সেকশনের রাস্তার (বাগানের সংরক্ষিত এলাকা) ভেতর দিয়ে কাজের জন্য ইট-বালু নিয়ে যান। নির্মাণকাজ শুরু হলে চা বাগানের শ্রমিকদের বাধার মুখে তা বন্ধ হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়েছে, বাগানের শ্রমিক নিবাসের রাস্তার বেহাল দশা। এগুলোর উন্নয়ন হচ্ছে না। চেয়ারম্যান যে এলাকায় রাস্তা করার চেষ্টা করছেন এখানে কোনো গ্রাম, মহল্লা নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য তিনি সরকারি টাকা অপচয় করছেন। চা বাগানের সংরক্ষিত সেকশনের ভেতর দিয়ে রাস্তা হলে নারী শ্রমিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ফুলতলা চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি রবি বুনার্জী, ইউপি সদস্য কাজল বাউরী, চা শ্রমিক, সামারু বুনার্জী, চা শ্রমিক লালা শেট, কাঞ্চন  ভর, ফুলতলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক তৌহিদুল ইসলাম, এলবিনটিলা চা বাগানের শ্রমিক সজল বুনার্জী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সরেজমিনে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ইউপি চেয়ারম্যান মাসুক আহমদ নিজের ফলবাগানে যাতায়াতের সুবিধার্থে ক্ষমতার অপব্যবহার করে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের একটি প্রকল্পের আওতায় ইতিপূর্বে রাস্তার কিছু স্থান ইটসলিং করেন। স¤প্রতি ইউপি কার্যালয় স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্পের (এলজিএসপি) আওতায় রাস্তা করার উদ্যোগ নেন। এদুটি প্রকল্প ছাড়াও সেখানে (দখলীয় লেবু বাগানে) সরকারি অর্থায়নে প্রায় ৫ কিলোমিটার পল্লী বিদ্যুতের লাইন টেনে পাহারাদারের ঘরে সংযোগ দিয়েছেন। পাহারাদারের ঘরে সরকারি বরাদ্দের সোলার প্যানেল, গভীর নলকূপ স্থাপন ও সরকারি অর্থে একাধিক ব্রিজও নির্মাণ করেছেন।


ফুলতলা চা বাগানের চা শ্রমিকদের পক্ষে সর্দার বাসু দেব চাষা, ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক পঞ্চায়েত সভাপতি লালা শেঠ, নারী শ্রমিক বিদ্যাবতি বুনার্জি ও সাবিত্রি চাষা জানান, বাগানের সংরক্ষিত এলাকরা ২২ নম্বর সেকশনে হঠাৎ করে গত ২৪ মে ইট ও বালু ফেলা শুরু করেন। বাগান শ্রমিকরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন ফুলতলা ইউপি চেয়ারম্যান সেকশনের ভেতর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করতে এগুলো ফেলেছেন। অথচ সেকশনের ভেতর দিয়ে শ্রমিকদের পাতা তুলতে হাটাচলার রাস্তা বিদ্যমান। এখান দিয়ে কোনো জনবসতি নেই।  তিনি সেটিকে ৮ফুট প্রস্থ করে রাস্তা নির্মাণ করতে গেলে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। গত ৮ জুন রাস্তার প্রশস্তকরণ ও নির্মাণকাজ শুরু করলে শ্রমিকরা বাঁধা দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে চেয়ারম্যানের লোকজন কাজ বন্ধ করেন।

তারা আরো জানান, বাগানের সংরক্ষিত এলাকার কাজ করতে গিয়ে নারী শ্রমিকরা সেকশনের রাস্তায় বিশ্রাম নেন। এখানে রাস্তা হলে বহিরাগত লোকজনের চলাচল বাড়বে। নারী চা শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।

ফুলতলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক তৌহিদুল ইসলাম জানান, বাগানের সংরক্ষিত এলাকা দিয়ে রাস্তা করতে হলে অবশ্যই বাগানের সম্মতি নিতে হয়। কিন্তু চেয়ারম্যান মাসুক আহমদ বাগানকে অবগত না করে, চা গাছ বিনষ্ট করে জোরপূর্বক রাস্তা নির্মাণ করতে চাইলে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে কাজে বাঁধা দেয়। ২০১০ সালে তিনি চা  বাগানের ও  বনবিভাগের জায়গা জবরদখর করে এই লেবু বাগান করেন। পরে জেলা উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ও দলীয় নেতারা বসে বিষয়টি নিষ্পত্তি করেন। সে সময় চেয়ারম্যান বাগানের জায়গা ছেড়ে দেন এবং পরবর্তীতে কোনরূপ দাবি দাওয়া না করার শর্তে লিখিত দেন। সেই লেবু বাগানে যাতায়াতের রাস্তা বিদ্যমান সত্তে¡ও বাগানের সংরক্ষিত এলাকা দিয়ে সরকারি টাকায় জোরপূর্বক রাস্তা নির্মাণ করতে চান। যা সরকারি অর্থের অপচয়ও বটে।

জানতে চাইলে ফুলতলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও জুড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুক আহমদ বলেন, ‘এটা এলজিইডির রাস্তা। রাস্তার নম্বর আছে। জেলা পরিষদ কাজ করেছে, এলজিইডি কাজ করেছে। এলজিএসপিরও কাজ হয়েছে। রাস্তায় কাজ হলে শুধু আমার নয়, চা-বাগানের শ্রমিক ও আশপাশের মানুষের চলাচলের সুবিধা হবে। বাগান কর্তৃপক্ষের মদদে শ্রমিকেরা রাস্তা নির্মাণে বাধা প্রদান করেছে। কিছু মানুষ প্রতিহিসংসা পরায়ন হয়ে এগুলোর বিরোধিতা করছে। অপপ্রচার করছে। এখানে আমার বাগান ছাড়া আরও বাগান আছে। পাশে তিনটি পুঞ্জি আছে। আমার বাগান হয়ে বিদ্যুৎ লাইন পুঞ্জিতে গেছে। আমি জনস্বার্থে এই রাস্তাটি নির্মাণ করছি। এখানে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ নেই।’

বনবিভাগের জুড়ী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আলা উদ্দিন বলেন, ‘আমরা দখলের বিষয়টি শোনেছি। স্থানীয় প্রশাসন ও ইউপি চেয়ারম্যানকে নিয়ে সরেজমিনে জায়গাগুলো সার্ভে করব। বনভিবাগের জায়গা হলে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জুড়ী উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল মতিন বলেন, ‘ফুলতলা চা বাগানের সেকশনের ভেতর দিয়ে একটি রাস্তা এলজিইডির গেজেটভুক্ত আছে। তবে এখানে আমরা কোনো উন্নয়ন কাজ করিনি। আইডিভুক্ত হলেও যদি রাস্তাটি জনগুরুত্বপূর্ণ না হয় এবং কোনো কর্তৃপক্ষ বাধা দেয় তবে এই রাস্তায় উন্নয়ন কাজ করা সমীচীন হবে না।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত