তপন কুমার দাস

২০ জুন, ২০২১ ২২:৫২

হাকালুকির ২০ হাজার বৃক্ষনিধন!

প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন হাকালুকি হাওরের মালাম বিলের পাড়ের হিজল-করচ-বরুণসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ২০ হাজার গাছ কেটে ফেলার খবর পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে, মালাম বিলের বাঁধ নির্মাণের নামে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ইজারাদারের লোকজন গাছগুলো কেটে নিয়ে গেছে।

এতে হুমকিতে পড়েছে হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য। বিলটি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলা অংশে পড়েছে।  

সম্প্রতি গাছ কাটার ঘটনায় হাকালুকি ইসিএ ব্যবস্থাপনা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সদস্য ও জলজ বনের পাহারাদার মো. আব্দুল মনাফ সাত জনের নাম উল্লেখ করে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসককে অভিযোগের অনুলিপি দিয়েছেন।

এদিকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) বৃক্ষ নিধনের ঘটনা ঘটলেও রহস্যজনক কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো আইনি পদক্ষেপ নেননি সংশ্লিষ্টরা। এতে হাওরপারের মানুষ ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি তদন্ত করে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।    

অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাকালুকি হাওরের অর্ন্তভূক্ত বড়লেখা উপজেলার অধীনে মালাম বিলের (মৎস্য জলাশয়) আয়তন ৪২৮.৯২ একর। ১৪২৭ বাংলা হতে ১৪৩২ বাংলা সন পর্যন্ত সময়ের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ২১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৪৩ টাকায় মালাম বিলটি ইজারা নিয়েছে বড়লেখা উপজেলার মনাদি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। পরিবেশ অধিদপ্তর ২০০৩ সাল হতে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থায়নে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) মালাম বিলের (কান্দির) পাড়ে সরকারি ভূমিতে হিজল, করচ, বরুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির জলজ বৃক্ষ রোপণ করে। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ বেড়ে ওঠে। বর্তমানে প্রাকৃতিক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সৃজিত জলজ উদ্ভিদ গুলো ১০-১৫ ফুট উচ্চতার হয়েছে। যা হাকালুকি হাওরের ইসিএ এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবরোধে বিশেষ অবদান রাখছে। গত ২৭ মে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ইজারাদারের লোকজন বিলের বাঁধ নির্মাণের নামে বিলের পাড়সহ প্রায় ১২ বিঘা জমির প্রায় ২০ হাজার গাছ অবৈধভাবে কেটে নেয়। এরপর তারা সেখানে ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করেছে। এতে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।       

হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকর্মী (বনায়ন পাহারাদার) আব্দুল মনাফ বলেন ‘মালাম বিলের ইজারাদার সমিতির লোকজন বর্ণি ইউনিয়নের কাজিরবন্দ গ্রামের জয়নাল উদ্দিন, মক্তদির আলী, মশাইদ আলী, রিয়াজ উদ্দিন, কালা মিয়া, সুরুজ আলী, মনাদি গ্রামের জয়নাল উদ্দিন প্রমুখদের নিয়ে এক্সাভেটর দিয়ে মে মাসের প্রথম দিকে বিলের দক্ষিণ ও পূর্ব পাশের সরকারি ভূমির জলজ বৃক্ষ নিধন করে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। আমরা বাঁধা দিলে তারা তা মানেনি। এছাড়া বিলের পাড়ের গাছ কেটে অনেকেই বোরো চাষের জমি তৈরী করছে। এ ঘটনায় ৭ জনের নামে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’

মনাদি মৎস্যজীবী সমিতির পরিচালক জয়নাল উদ্দিন বলেন, ‘জলমহাল ইজারায় শুধুমাত্র মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নাম ব্যবহার করা হয়। তা সকলেই জানেন, প্রভাবশালীরা বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগকারীরাই এখানকার গাছ কেটেছেন, বাঁধ দিয়েছেন। যদিও কাজটা মোটেও ঠিক হয়নি। বিষয়টি প্রশাসনের সঙ্গে মিটমাট করা হবে বলে শুনেছি।’

কারা গাছ কেটেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো উত্তর দেননি।

বন বিভাগের হাকালুকি বিটের দায়িত্বে থাকা জুনিয়র ওয়াইল্ডলাইফ স্কাউট তপন চন্দ্র দেবনাথ সিলেটটুডেকে বলেন, ‘জলা বনের পাহারাদারের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বনায়নটি পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের। তাই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে অবগত করেছি। বিষয়টি তাদের দেখার কথা।’

পরিবেশ অধিপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ইবিএ প্রজেক্টের এডমিন এন্ড ফিন্যান্স অফিসার (এএফও) সাহিদ আল শাহিন সিলেটটুডেকে বলেন, ‘হিজল-খরচ গাছ কাটার ঘটনাটি পাহারাদার আমাকে জানিয়েছে। অফিসের কাজে আমি তখন ঢাকায় ছিলাম। তারা জানায় দুস্কৃতিকারীরা প্রায় ২০ হাজার গাছ কেটে ফেলেছে। আমাদের প্রকল্পের মাধ্যমে ইসিএভুক্ত মালাম বিল এলাকায় প্রায় ৭০ একর জায়গায় হিজল-করচসহ পরিবেশবান্ধব গাছ লাগানো হয়েছিল। গাছগুলো অনেক বড় হয়েছিল। এ ঘটনায় পাহারাদার থানায় ও ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ইসিএভুক্ত এলাকায় সরকারি অনুমোদিত প্রকল্প ব্যতিত গাছ কাটা, খনন, স্থাপনা নির্মাণ, পাখি শিকার করা ইত্যাদি বেআইনি। গাছগুলো কাটায় হাওরের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’

পরিবেশ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের সহকারি পরিচালক মো. বদরুল হুদা সিলেটটুডেকে বলেন, ‘গাছকাটার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। শীঘ্রই জায়গাটি পরিদর্শন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে প্রাণ-প্রকৃতি বিষয়ক গবেষক ও লেখক পাভেল পার্থ সিলেটটুডেকে বলেন, ‘হাওর অঞ্চলের জন্য হিজল-করচ-বরুণ গাছ খুবই গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ। কারণ এগুলো জলাভূমির উদ্ভিদ। হিজল-করচ হাওর অঞ্চলে জলাবন বা সোয়াম্প ফরেস্ট তৈরি করে। এই কারণে হাওরে অনেক হিজলবাগ, করচবাগ আছে। হাওরের হিজল-করচ গাছের ওপর নির্ভর করে মাছ, পাখি, বন্য জীবজন্তু এবং হাওরপারের মানুষজন বেঁচে থাকেন। হিজল-করচ গাছের মধ্যে মাছের খাবার তৈরি হয়। এজন্য যেখানে হিজল-করচ গাছ থাকে সেখানে কার্প জাতীয় মাছের বংশ বিস্তার ঘটে।’

প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণারত এই লেখক আরো বলেন, ‘এভাবে হাকালুকি হাওরে বিপুল পরিমাণে গাছ কেটে ফেলায় হাওরের বাস্তুসংস্থান এবং জলজ খাদ্য শৃঙ্খলে ভয়াবহ বিপর্যয় তৈরি করবে। এর আগে ২০০৭, ২০১০ এবং ২০১৮ সালে হাওর অঞ্চলে মাছের ব্যাপক মৃত্যু হয়েছিল প্রাকৃতিক শৃঙ্খলে বিপর্যয় ঘটায়। প্রতিবেশ সংকটাপন্ন হাকালুকি হাওরের গাছ কাটার ঘটনাটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব মালাম বিলে হিজল-করচসহ যেসব প্রজাতির গাছ কাটা হয়েছে পুনরায় লাগানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলী সিলেটটুডেকে বলেন, ‘গাছ কাটার ঘটনাটি আমার যোগদানের আগেই ঘটেছে। এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। কে বা কারা গাছগুলো কেটেছে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত