নিজস্ব প্রতিবেদক

২২ জুন, ২০২১ ০১:০৬

তবু কেন জামিন হয় না ঝুমনের

শাল্লার নোয়াগাঁও গ্রামে তাণ্ডব

সুনামগঞ্জের শাল্লার উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা ও ভাংচুরের মামলার প্রধান আসামি শহিদুল ইসলাম স্বাধীন (স্বাধীন মেম্বার) জামিন পেয়েছেন। সোমবার সুনামগঞ্জ আদালত থেকে জামিন পান স্বাধীন। তবে একই দিনে উচ্চ আদালতে আবেদন করেও জামিন পাননি যার স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে এই হামলা, সেই ঝুমন দাস। ঘটনার পর থেকে প্রায় তিন মাস ধরে কারাগারে আছেন নোয়াগাও গ্রামের এই যুবক।

ঝুমন দাসের ভাই নুপুর দাস বলেন, সুনামগঞ্জের ম্যাজিস্টেট ও জজ কোর্টে কয়েকদফা আবেদন করেও ঝুমনের জামিন হয়নি। পরে হাই কোর্টে জামিন আবেদন করা হয়। তবে সোমবার উচ্চ আদালতও জামিন আবেদন নাকচ করে দেন।

নিজের আইনজীবীর বরাত দিয়ে নুপুর বলেন, আইজীবী জানিয়েছেন দ্রুতই আরেকবার জামিনের আবেদন করা হবে।

ফেসবুকে হেফাজত ইসলামের নেতা মামুনুল হককে নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন ঝুমন। সেই ‘অপরাধে’ ঝুমনকে আটক করে পুলিশ। এর পরদিন তার গ্রাম নোয়াগাঁওয়ে তাণ্ডব চালায় মামুনুলের অনুসারীরা। ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয় গ্রামের প্রায় ৯০টি হিন্দু বাড়ি।

যে হেফাজত নেতার সমালোচনা করে ফেসবুকে লিখেছিলেন ঝুমন, সেই মামুনুল এখন দেশজুড়ে সমালোচিত-বিতর্কিত। সহিংসতাসহ নানা অভিযোগে তিনি কারাগারে।

এদিকে, নোয়াগাও গ্রামে হামলা ও ভাংচুরের মামলার প্রধান আসামী দিরাইয়ের নাচনী গ্রামের বাসিন্দা সরমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য যুবলীগ নেতা শহিদুল ইসলাম অরফে স্বাধীন মিয়া সোমবার আদালত থেকে জামিন পেয়েছে।

সোমবার দুপুরে সুনামগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ মো. ওয়াহিদুজ্জামান সিকদার বহুল আলোচিত মামলার প্রধান আসামী শহিদুল ইসলাম স্বাধীন মিয়ার জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেছেন।

গত ১৯ মার্চ রাতে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থেকে শহিদুল ইসলাম অরফে স্বাধীন মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেট।

হামলার দায়ে অভিযুক্ত স্বাধীন মেম্বার জামিন পাওয়ার পর প্রশ্ন ওঠেছে ফেসবুকে স্ট্যাটাসদাতা ঝুমন কেনো জামিন পাবেন না?

আটকের পর প্রথমে ঝুমনকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হলেও পরে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে পুলিশ।

ঝুমন দাসের মা নিভা রানী দাস বলেন, ‘আদালতে একাধিকবার আবেদন করেও আমার ছেলের জামিন হচ্ছে না। বড় বড় আসামিরা ছাড়া পেয়ে যায়। অথচ ফেসবুকে লেখার কারণে সে দুই মাস ধরে কারগারে আছে।’

ঝুমনের মা বলেন, ‘ছেলেকে গ্রেপ্তারের পর আমাদের ঘরসহ গ্রামের সকল বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করা হলো। আমার পুত্রবধূকে হেনস্তা করা হয়েছে। আর কী শাস্তি পাওয়ার বাকি আছে আমাদের?’

ঝুমন দাশের আইনজীবী দেবাংশু শেখর দাস বলেন, ‘দুই বার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ঝুমন দাশের জামিনের আবেদন করেছিলাম কিন্তু মঞ্জুর হয়নি। এরপর জেলা ও দায়রা জজ আদালতেও জামিন প্রার্থনা করেছিলাম কিন্তু আদালত জুমন দাশের জামিন মঞ্জুর করেন নি। এখন তার পরিবার উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেওয়ার চেষ্টা করছেন।’

১৬ মার্চ মামুনুল হকের সমালোচনা করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন শাল্লার নোয়াগাঁওয়ের যুবক ঝুমন দাস আপন। স্ট্যাটাসে তিনি মামুনুলের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অভিযোগ আনেন।

এরপর ওই স্ট্যাটাস নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি করে হেফাজত ও মামুনুলের অনুসারীরা। তারা ঝুমনের স্ট্যাটাসকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে প্রচারণা চালায়। উত্তেজনা আঁচ করতে পেরে ওই রাতেই ঝুমনকে পুলিশের হাতে তুলে দেন নোয়াগাঁও গ্রামবাসী।

পরদিন ১৭ মার্চ সকালে কয়েক হাজার লোক সশস্ত্র মিছিল নিয়ে এসে ঝুমনের নোয়াগাঁওয়ে তাণ্ডব চালায়। তারা গ্রামের প্রায় ৯০টি হিন্দু বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। মামলাগুলো তদন্ত করছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। এই তিন মামলায় এই পর্যন্ত স্বেচ্ছায় হাজির হওয়াসহ ৯৪ জন আইনের আওতায় এসেছেন। ১১ জন আসামী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেছে। এরমধ্যে বেশিরভাগই জামিন পেয়েছেন।

এই মামলায় ঝুমনেরও জামিন পাওয়া উচিত বলে মনে করেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী। তিনি ঝুমনের মুক্তি দাবি করে বলেন, জামিনের পর তার নিরপত্তার বিষয়টিও প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে।
 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত