তপন কুমার দাস:

০৩ জুলাই, ২০২১ ২২:৪৩

জনবল সংকট নিয়েই চলছে বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

১৫ বছর ধরে শূন্য মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রেডিওগ্রাফি পদ, অব্যবহৃত এক্সরে মেশিন

বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন। ইনসাটে অব্যবহৃত এক্সরে মেশিন।

বড়লেখা মৌলভীবাজারের একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা। উপজেলা থেকে জেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। দশটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত বড়লেখা উপজেলায় চিকিৎসার ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই জনগণের প্রধান ভরসা। কিন্তু অনেকদিন ধরেই সীমিত জনবল নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে এই হাসপাতালটি। গুরুতর কোনো সমস্যা হলে জেলা সদর, না হলে সমান দূরত্বের সিলেটে রোগী নিয়ে যেতে হয়। করোনা চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। করোনা আক্রান্ত রোগীর গুরুতর কিছু হলে এখানে উন্নত চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা নেই।

তবে করোনা চিকিৎসার প্রাথমিক প্রস্তুতি আছে বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে দশটি শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে ১০টি। এই হাসপাতালে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট করানো হচ্ছে। অন্যদিকে অপারেটর না থাকায় এক্সরে মেশিন অব্যবহৃত পড়ে আছে। ১৫ বছর ধরে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রেডিওগ্রাফি পদটি শূন্য। এতে রোগীরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্সরে সুবিধা পাচ্ছেন না।  

উপজেলা স্বাস্থ্যবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, করোনার শুরু থেকে শুক্রবার (২ জুলাই) পর্যন্ত বড়লেখায় করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ১৮৯ জন। গত এক সপ্তাহে ১৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এরমধ্যে ১ জন হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন। বাকিরা বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন।  

প্রায় তিন বছর আগে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু দেওয়া হয়নি প্রয়োজনীয় জনবল। যেখানে জনবল সংকট নিয়ে ৩১ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিচালনা করা হয়েছে। সেখানে এই জনবলের ঘাটতি নিয়েই পরিচালনা করা হচ্ছে ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কর্তৃপক্ষ সীমিত জনবল দিয়েই কোনোমতে উপজেলাবাসীর স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। গুরুতর কোনো সমস্যা হলে মৌলভীবাজার বা সিলেটে রোগীকে নিয়ে যেতে হয়।  

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু ৫০ শয্যা অনুযায়ী যে জনবল নিয়োগ দেওয়ার কথা, তা এখনো দেওয়া হয়নি। ফলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি চলছে ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে। ৩১ শয্যার জনবলের মধ্যেই মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) পদটি ১৫ বছর ধরে শূন্য রয়েছে। টেকনোলজিস্টের অভাবে ৩ বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে এক্সরে মেশিন। মেডিকেল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) ২টি পদের একটি শূন্য। একটি পদের কর্মরত টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) ডেপুটেশনে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণে থাকায় এই বিভাগটি বন্ধ আছে প্রায় ৩ বছর ধরে। অন্যদিকে জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) পদটি শূন্য আছে। উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের (স্যাকমো) ১৩টি পদের মধ্যে ৮টি পদ শূন্য, নার্সের ১৪টি পদের মধ্যে ৪টি শূন্য, নার্সিং সুপারভাইজারের ২টি পদের মধ্যে ১টি শূন্য, মিডওয়াইফের ৫টি পদের মধ্যে ২টি পদ শূন্য, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ৭টি পদের মধ্যে ৬টি পদ শূন্য, স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ২টি পদের দুটিই শূন্য, অফিস সহকারীর ৩টি পদের মধ্যে ২টি পদ শূন্য, ক্লিনারের ৫টি পদের মধ্যে ৪টি পদ শূন্য, নিরাপত্তা প্রহরীর ২টি পদের মধ্যে ১টি পদ শূন্য, এমএলএসএস ৫টি পদের ২টি পদ শূন্য, আয়া ২টি পদের একটি শূন্য রয়েছে।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র আরো জানিয়েছে, এখানে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা নিতে আসেন। সীমিত এই জনবল নিয়ে মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে জনবলের ঘাটতি পূরণ হলে উপজেলাবাসীকে আরো ভালোমানের সেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রত্নদীপ বিশ্বাস সিলেটটুডেকে বলেন, ‘৩১ শয্যার জনবল দিয়েই ৫০ শয্যার কার্যক্রম চলছে। ৩১ শয্যার জনবলেও বেশ কিছু পদ শূন্য আছে। এই সীমিত জনবল নিয়েও আমরা সাধ্যমতো জনগনকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছি। জনবল নিয়োগের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। জনবল নিয়োগের কার্যক্রম চলমান আছে। জনবল বাড়লে স্বাস্থ্য সেবার মান আরো বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের ১০ বেডের আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত আছে। ১০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে। ভবিষ্যতে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে তা মোকাবেলার জন্য আরো ২০টি অক্সিজেন সিলিন্ডারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালে আগত রোগী ও রোগীর স্বজনদের হাত ধোয়ার জন্য ওয়াশ বেসিন স্থাপন করা হয়েছে। করোনার নমুনা সংগ্রহের জন্য বুথ স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিদিন র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হচ্ছে এবং আর টি পিসি আর পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল সংগ্রহ করে সিলেটে পাঠানো হচ্ছে। করোনার মৃদু হতে মাঝারি উপসর্গের রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়ার মতো ব্যবস্থা আমাদের এখানে আছে। তবে গুরুতর উপসর্গের করোনা রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রেফার করা ব্যতীত ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত