০৭ এপ্রিল, ২০২২ ১৫:৩১
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার জয়চন্ডী ইউনিয়নে অবস্থিত সিটিএস মন্দিরটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পায় বছর দশেক থেকে। এ জন্য পুণ্য লাভের আশায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হিন্দু (সনাতন) ধর্মাবলম্বী ভক্তগণ এখানে আসেন পূজো করতে। ভক্তগণের দান থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা আয় হতে থাকে মন্দিরে। এদিকে মন্দিরের প্রধান ধর্মযাজক বা গুরু মহারাজ ভারতীয় নাগরিক প্রদীপ বিশ্বাস (ভক্তগণ যাকে যতি গোস্বামী মহারাজ নামেই চেনেন) প্রভাব খাটিয়ে মন্দিরের দানকৃত টাকা আত্মসাতের মাধ্যমে পাচার করছেন ভারতে। এমন অভিযোগে যতি মহারাজের বিরুদ্ধে দেবোত্তর সম্পত্তি আইনে, সাইবার পিটিশন আইন এবং সিআরসহ ৫টি মামলা চলমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং দুদক চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে গা ঢাকা দিয়েছেন যতি মহারাজ। এই মহারাজকে নিয়ে স্থানীয় হিন্দু (সনাতন) ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ভারতীয় পাসপোর্ট নং জেড ২৬০৮১৫৮ অনুযায়ী প্রদীপ বিশ্বাস (যতি মহারাজ) ভারতের কলকাতা নদিয়া পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা। পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। ভারত থেকে ২০০৮ সালে এ দেশে উপজেলার জয়চন্ডী ইউনিয়নের পুসাইনগরে শ্রী শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর দেবালয় নামক একটি মন্দিরকে জাল দলিলমূলে এবং নিজেকে ওই এলাকার বাসিন্দা উল্লেখ করে মন্দিরের নাম পরিবর্তন করে সিটিএস মন্দির হিসেবে নাম দেন। নিজে মন্দিরের প্রধান মহারাজের দায়িত্ব নেন। অতিকৌশলী এ যতি মহারাজ বিশাল ভক্তকুল গড়ে তুলেন। সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বীরা সরল বিশ্বাসে মন্দিরে মোটা অঙ্কের অনুদান দিতে থাকেন মন্দিরে। প্রথমে দানের টাকা দিয়ে মন্দিরের দ্বিতল বিশিষ্ট ভবন গড়ে তুলেন।
মন্দিরে ৩টি দানবাক্স বসানো হয় এবং ভক্তকুলের কাছে ১৮শত দানবাক্স বিলি করেন দানের টাকা সংগ্রহের জন্য। সবক’টি দানবাক্সের চাবি যতি মহারাজের কাছে। সব হিসেব নিকেশ তাঁর কাছেই ছিল। কোটি কোটি টাকার দানে প্রাপ্ত অর্থে বদলে যেতে থাকে তাঁর চালচলন। এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকার তাঁতিবাজারের গঙ্গা টাওয়ারের ৫ম তলায় সিটিএস মন্দিরের আরেকটি কার্যালয় স্থাপন করেন। সেই কার্যালয়ের মাধ্যমে অসীম কুমার নন্দী ও অর্জুন পাল নামক ২ ব্যক্তির সহযোগিতায় হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে টাকা পাচার শুরু করেন। ২০১৩ সালে মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকে পরিচালনায় কোন কমিটি নেই, আয় ব্যয়েরও কোন হিসাব নেই। ফলে প্রতি মাসে মন্দিরের আয়ের লক্ষ লক্ষ টাকা এই গুরুমহারাজ আত্মসাৎ ও ভারতে পাচার করেছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।
আরও জানা যায়, মন্দিরের জমির জাল দলিল সম্পাদন ও মন্দিরের নাম পরিবর্তন করায় মৌলভীবাজার জেলা জজ আদালতে স্বত্ব মামলা (নং ০১/২০২২) চলমান আছে। উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের দুর্জয় দেব বাদী হয়ে যতি গোস্বামী মহারাজকে প্রধান করে ১১ জনের নামোল্লেখ করে সিলেট (জেলা ও দায়রা জজ) সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা (নং ২০/২০২২) দায়ের করেন। মন্দিরের পাশ্ববর্তী হরিহরপুর গ্রামের উত্তম কুমার রায় বাদী হয়ে প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মৌলভীবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে (সিআর মামলা নং ৭০/২০২২), একই গ্রামের সুজন দাস বাদী হয়ে (সিআর মামলা নং ৬৬/২০২২) এবং মাধাই রায় বাদী হয়ে (সিআর মামলা নং ৯৭/২০২২) দায়ের করা হয়। আদালতের দায়েরকৃত মামলাগুলো পিবিআই’র তদন্তাধীন রয়েছে।
এদিকে প্রদীপ বিশ্বাস ওরফে যতি গোস্বামী মহারাজ কোটি কোটি টাকা ভারতে পাচার এবং তাঁকে আইনের আওতায় আনার দাবিতে বাংলাদেশ নাগরিক অধিকার ফাউন্ডেশনের আইন ও সালিশ বিষয়ক যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট মো. মাসুদুল হক একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও দুদকের চেয়ারম্যান বরাবরে। অপরদিকে মহারাজের অপকর্মের ফিরিস্তি তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র সচিব বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেন শ্রী শ্রী গোরাঙ্গ মহাপ্রভুর দেবালয়ের ভক্তবৃন্দ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মন্দিরের বর্তমান অধ্যক্ষ দামোদর মহারাজ জানান, এই মন্দির পরিচালনায় কোন কমিটি নেই। যতি গোস্বামী মহারাজের বিরুদ্ধে চলমান মামলা সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। আমি ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত। এসব বিষয় যতি মহারাজ ভালো বলতে পারবেন।
যতি মহারাজের স্থানীয় ভক্ত ননী গোপাল জানান, গুরু মহারাজ সিলেটে থাকেন। তবে তিনি কোথায় থাকেন তা বলতে পারবোনা।
যতি গোস্বামী মহারাজ আত্মগোপনে থাকায় এবং তাঁর মুঠোফোনে কল দিলে সেটি বন্ধ থাকায় অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়ের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, আদালতের নির্দেশে ৩টি মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বাদীসহ এলাকার অনেকের বক্তব্যে নেয়া হয়েছে। মহারাজ প্রদীপ বিশ্বাসকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করবো। সঠিক সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন আদালতে জমা দিবো।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, আমরা দুই পক্ষকে নিয়ে বসে মন্দিরের অচলাবস্থা নিরসনে পরিচালনা কমিটি করেছি। কমিটিতে ইউএনওকে সভাপতি করে ১৩ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটিতে ১৩ সদস্যের মধ্যে যতি মহারাজের পক্ষের ৪ ও দামোদার মহারাজের পক্ষের ৪ জনকে সদস্য রাখা হয়েছে। এছাড়া থানার ওসি ও কুলাউড়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সৌম্য প্রদীপ ভট্টাচার্যকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। এই কমিটি মন্দির পরিচালনা ও মন্দিরের আয় ব্যায়ের হিসেব দেখবে।
আপনার মন্তব্য