২৪ ডিসেম্বর, ২০১৫ ২৩:২৮
গোলাপগঞ্জ পৌর শহরের এক চা দোকানে বসেছিলেন ষাটোর্ধ শওকত আলী। নির্বাচন নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ। আমরা রাজনীতি বুঝি না। আমরা ব্যক্তি দেখেই ভোট দেব। আমরা পরিবর্তন চাই।
শওকত বলেন, সুষ্ঠু ভাবে নির্বাচন হলে আমরা খুবই খুশী হব। তবে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো।
গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের দপ্তর সম্পাদক আকবর আলী ফখর বলেন, নৌকা গণ মানুষের প্রতীক। আগামী উপজেলা নির্বাচনে নৌকা মার্কার প্রার্থী জাকারিয়া আহমদ পাপলু ভাই নিঃসন্দেহে জয় লাভ করবেন।
তিনি আরও বলেন, গত দুই টার্ম পাপলু ভাই ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। এবারো তিনি নির্বাচিত হয়ে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখবেন।
পুরো গোলাপগঞ্জ পৌরসভা ঘুরে শোনা গেলো এমন বিপরীতমুখী কথা। একপক্ষের মুখে পরিবর্তনের সুর। অপরপক্ষ কাজে লাগাতে চায় নৌকার ইমেজ। এই নৌকার ইমেজ কাজে লাগিয়ে জয়ী হতে চান আওয়ামী লীগের প্রার্থী, বর্তমান মেয়র জাকারিয়া আহমদ পাপলু। আর পরিবর্তনের হাওয়া উসকে দিয়ে ভোটের ফল নিজের পক্ষে টানতে চান আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সিরাজুল জব্বার চৌধুরী। লড়াইয়ে আছেন শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন ফিরে পাওয়া বিএনপির প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া শাহীনও।
আগামী ৩০ ডিসেম্বর এই পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পুরো পৌরসভাজুড়ে এখন বইছে নির্বাচনী হাওয়া। প্রথমবারের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে যাচ্ছে দলীয় প্রতীকে। তবে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও ভোটাররা জানিয়েছে তারা প্রার্থী দেখেই ভোট দেবেন।
গোলাপগঞ্জ পৌরসভায় প্রতিবারই গোষ্ঠিভিত্তিক লড়াই হয়ে থাকে। গত দুই নির্বাচনে এই লড়াইয়ে জয়ী হন জাকারিয়া আহমদ পাপলু। তবে এবার এই গোষ্ঠিভিত্তিক লড়াইয়েও পরিবর্তনের সুর। গোষ্ঠি পরিচয় নয় বরং যোগ্য প্রার্থী দেখেই এবার ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন ভোটাররা।
গোলাপগঞ্জ পৌরসভায় মোট ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বী করছেন। এরমধ্যে আওয়ামী লীগেরই তিনজন। পাপলু, সিরাজুল জব্বার ছাড়াও এই পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আমিনুল ইসলাম রাবেল। এছাড়া জাতীয় পার্টি, খেলাফত মজলিস ও স্বতন্ত্র থেকে প্রার্থী হয়েছেন আরো তিনজন।
তবে মূল লড়াই সিরাজুল জব্বার, জাকারিয়া পাপলু ও গোলাম কিবরিয়া শাহীনের মধ্যেই হবে বলে জানিয়েছেন ভোটাররা। পরিবর্তন সুর না নৌকার ইমেজ শেষ পর্যন্ত কে বিজয়ী হবে তা জনতে অপেক্ষা করতে হবে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে এখন পর্যন্ত কিছুটা এগিয়ে আছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সিরাজুল জব্বার চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটায় গোলাপগঞ্জে গিয়ে দেখা যায়, মাইকিংয়ে সরগরম পুরো এলাকা। প্রার্থীরা ব্যস্ত প্রচারণায়। রাস্তার পাশে চায়ের টং দোকানগুলোতে চলছে নির্বাচনকেন্দ্রীক তর্ক বিতর্কের ঝড়। পোস্টারে ছেয়ে আছে পুরো এলাকা।
১৫.২৯ বর্গকিলোমিটার এলাকার এ পৌরসভার মোট জনসংখ্যা ৩৩,৯৫১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৬,৬২৪ জন ও মহিলা ১৭,৩২৭ জন। ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত গোলাপগঞ্জ পৌরসভা।
গোলাপগঞ্জে গিয়ে কথা হয় নানা শ্রেণী পেশার রিক্সা সাইকেল মেকানিক্স পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের ভোটার দুলাল আহমদ বলেন, যার যার ইচ্ছানুযায়ী সে তার ভোট দেবে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সিরাজুল জব্বার ভালো লোক।
গোষ্ঠীগত লড়াইয়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, গত দুই নির্বাচনে জাত বংশের ব্যাপার সামনে আসলেও এবার তা আসবে না। এবার আমরা ব্যক্তি হিসেবেই ভোট দেব। বংশ দেখে নয়।
চা বিক্রেতা ইমাম উদ্দিন বলেন, মোবাইল ফোন (সিরাজুল জব্বার) ও ধানের শীষ মার্কার মধ্যে এবার লড়াই ভালো। নৌকা মার্কাও লড়াইয়েও থাকবে।
পড়ন্ত বিকেলে কলেজ রোডে বসে থাকা একদল সাধারণ মানুষের সাথে কথা হয় নির্বাচন নিয়ে। লুডু খেলে তাঁদের বিকেল কাটছে। কুশল বিনিময়ের পর নির্বাচনের খবর জানতে চাইলে বেশ নড়ে চড়ে বসেন। কথা বললেন কয়েকজন ব্যবসায়ী ও প্রবীণ ব্যক্তি।
আবুল আহমদ নামক একজন ব্যবসায়ী জানান, নির্বাচনে আসে নির্বাচন যায়। তবে উন্নয়ন হয় না। নির্বাচন মানে নিজস্ব উন্নয়ন, মানুষের উন্নয়ন নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক জন বলেন, আমার দোকানের সামনের ড্রেনেই ময়লা জমাট বেঁধে আছে তা দেখার কেউ নি। যারা আসে, যারা যায় সবাই সমান।
শামীম আহমেদ নামক একজন বলেন, আমরা পরিবর্তন চাই। তবে আমরা এমন কাউকে বেছে নেব যেন সরকারের সাথে একাত্ম হয়ে আমাদের পৌরসভার উন্নতি করতে পারেন। তিনি যেই হন।
রিক্সা চড়তে চড়তে কথা হয় বাবুল আহমদ নামক একজন রিক্সা চালকের সাথে। তিনি বলেন, নির্বাচন আসলে কি হবে আর গেলেই কি হবে আমাদের ভাগ্যের তো আর পরিবর্তন হয় না।
গোলাপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি নসিরুল হক শাহিন বলেন, আমরা শত ভাগ আশাবাদী গোলাম কিবরিয়া শাহীনকে নিয়ে। মানুষ ভোটের মাধ্যমেই জবাব দেবে তারা কাকে চায়। তবে নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু হবে এটা নিয়ে আমরা সন্দিহান। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার প্রশাসনিক ভাবে চাপ প্রয়োগ করে তাঁদের নির্বাচনী প্রচারণায় বাঁধা দিচ্ছে। পক্ষপাতমূলক আচরণ করে প্রশাসন তাদেরকে সুষ্ঠু ভাবে সভা সমাবেশ করতে দিচ্ছে না। রাতের আঁধারে তাঁদের পোষ্টার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় থাকা বিএনপির নেতা কর্মীরা দাবি করেন, সেনা মোতায়েনের। তারা বলেন, সেনা মোতায়েন হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।
গোলাপগঞ্জ থানার এস আই খন্দকার আতিকুর রহমান বলেন, এখানকার নির্বাচনী পরিবেশ খুবই শান্ত এবং স্বাভাবিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা খুবই তৎপর। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবেলায় তারা প্রস্তুত।
আপনার মন্তব্য