০৫ জানুয়ারি, ২০২৩ ০৩:০৬
মঙ্গলবার (৩ জানুয়ারি) নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে ১ হাজার ৩৪৪ তম সন্তানের জন্ম হয় ভোগতেরা কমিউনিটি ক্লিনিকে। ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সারা দেশের ন্যায় ২০১৩ সালে গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের দোরগোড়ায় বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য চালু হয় ভোগতেরা কমিউনিটি ক্লিনিক। তবে তারও এক বছর আগেই ক্লিনিকটিতে নরমাল ডেলিভারি (স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব) আর প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা শুরু হয়। আর এ কাজটি শুরু করেন জুলেখা বেগম নামের এক নারী। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই কাজটি শুরু করেন। এতে সরকারিভাবে কোনো পারিশ্রমিক পান না। জুলেখা ও তার আরেক নারী সহকর্মীর উদ্যোগে এ পর্যন্ত ক্লিনিকটিতে সর্দি-জ্বর আর প্রসূতির প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি নরমাল ডেলিভারির মাধ্য ১ হাজার ৩৪৪ শিশুর জন্ম হয়েছে।
ফলে এটি দেশের কয়েকটি সেরা কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে স্থান পেয়েছে। অর্জন করেছে গ্রামের মানুষের আস্থা। তবে কমিউনিটি ক্লিনিকটিতে রয়েছে নানাবিধ সংকট। এসব সংকটের মধ্যেও ক্লিনিকটিতে মানুষের চিকিৎসা সেবা কাজ অব্যাহত আছে।
কমিউনিটি ক্লিনিকটি মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়ন এলাকায় অবস্থিত।
গত মঙ্গলবার (৩ জানুয়ারি) নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে ১ হাজার ৩৪৪ তম সন্তানের জন্ম হয় ক্লিনিকে।
এই শিশু সন্তানের মা ইমা বেগম। ইমার স্বামীর বাড়ি শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিশামনি গ্রামে। তার বাবার বাড়ি জুড়ীর ইউসুফ নগর গ্রামে।
জানা গেছে, ১৯ বছরের ঐ নারীর প্রসবকালীন ব্যথা শুরু হলে মঙ্গলবার ভোর ৭টার দিকে ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) জেলি বেগম ও প্রাইভেট সিএইচসিপি নিপা খানমের প্রচেষ্টায় সকাল ১০টা ১০ মিনিটের দিকে স্বাভাবিকভাবে সন্তানের জন্ম হয়।
শিশু সন্তানের মা ইমা বেগম বলেন, ‘আমি দরিদ্র পরিবারের মানুষ। আমার প্রথম সন্তান নরমাল হয়েছে। আমি ও বাচ্চা সুস্থ আছি। এখানে না আসলে হয়তো সিজার করা লাগতো। অনেক ঝুঁকি ছিল। টাকাও লাগতো অনেক।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্লিনিক সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে দেশের সকল কমিউনিটি ক্লিনিক চালুর উদ্যোগ নিলে এই ক্লিনিকও চালু হয়। এরপর সরকারিভাবে একজন সিএইচসিপি নিয়োগ দেয় সরকার। স্বাভাবিক রোগীর পাশাপাশি অনেক সময় অন্তঃস্বত্বা রোগী আসতে শুরু করেন এই ক্লিনিকে। এরআগে ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রাইভেট সিএইচসিপি জুলেখা বেগমের সহযোগিতায় প্রথম নরমাল ডেলিভারির যাত্রা শুরু হয়। ২০১৪ সালের জুন মাসে স্থানীয় গৃহিনী নিপা খানম বিনা পারিশ্রমিকে মানুষের সেবা করার কাজ শুরু করেন। পরে তাকে সরকারিভাবে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে বিনা পারিশ্রমিকে এখন পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমান সিএইচসিপি জেলি বেগম এবং নিপা যৌথ প্রচেষ্টায় ১ হাজার ৯২ শিশুর স্বাভাবিক জন্ম হয়েছে ক্লিনিকে। এরমধ্যে ২০২২ সালে ২৪৭ শিশুর স্বাভাবিক জন্ম হয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ২১ জন সন্তান জন্ম হয়েছে এখানে। যা উপজেলা কিংবা জেলার অন্যান্য ক্লিনিকের চেয়ে বেশী।
২০১২ সালে এই ক্লিনিকটি পরিদর্শনে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুন। ২০১৩ সালে তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুজিবুল হক ফকির এই ক্লিনিক পরিদর্শনে আসেন।২০১৫ সালে কানাডিয়ান হাইকমিশনারও পরিদর্শন করেন।
তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শনের সময় ক্লিনিকটির নানা সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়। অথচ নিরাপদ পানি, জনবল, অবকাঠামো, সৌর বিদ্যুতের মত সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে প্রায় ৮ বছর পার হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। পাশ্ববর্তী মসজিদের টিউবওয়েল এবং পুকুরের পানি ব্যবহার করে চলতে হয় এই ক্লিনিকে আসা রোগী, তাদের স্বজন ও ক্লিনিকে কর্মরতদের।
ক্লিনিকে স্বাভাবিক সন্তান জন্মের পাশাপাশি প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী আসেন প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে। ২০২২ সালে ৪ হাজার ৭০৩ জন রোগী এই ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। যা গড় হিসেবে প্রতি মাসে ৩৯১ জন। ২০১৪ সালে দেশের মধ্যে ৪র্থ স্থান অর্জন করে এই ক্লিনিকট। এত অর্জনের পরও নিরাপদ পানির জন্য একটি ডিপ টিউবওয়েল জুটেনি এই ক্লিনিকে।
সিএইচসিপি জেলি বেগম জানান, রোগীরা এখানে বিশ্বাস নিয়ে আসেন। আমরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। নিরাপদ পানির সমস্যায় আমরা ভুগছি। একটি সৌর বিদ্যুতের দাবি করছি অনেক দিন থেকে। বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগীর সেবা দিতে সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে রাতের বেলা গর্ভবতী মায়ের ডেলিভারি করার সময় বেশি কষ্ট হয়। অন্ধকারে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়।
প্রাইভেট সিএইচসিপি নিপা খানম বলেন, মানবিক দৃষ্টি থেকে আমি মানুষের সেবা করি। কেউ খুশি হয়ে আমাদের উপহার দেয়, কেউ দেয় না। অনেক রোগীকে বরং আমাদের টাকা দিয়ে সহযোগিতা করা লাগে। এখানে অনেক রোগী আসেন, তাদের মধ্যে যাদের উচ্চরক্তচাপ, এনিমিয়া, বিলম্বিত প্রসব, বিলম্বে আসা এসব সমস্যা রয়েছে। এ রকম রোগীদেরকে আমরা অন্যান্য স্থানে সেবা নেওয়ার কথা বলি।
জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সরমজিৎ সিংহ জানান, স্বাভাবিক সন্তান প্রসবে এ ক্লিনিকের সুনাম রয়েছে দেশ জুড়ে। দীর্ঘদিন থেকে এ সেবা চালু রয়েছে যা উপজেলার অন্যান্য ক্লিনিকে নেই।
জায়ফরনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হাজী মাছুম রেজা বলেন, এই ক্লিনিকের সেবায় আমরা মুগ্ধ। বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে এই ক্লিনিকের দেওয়াল, নতুন রুম, আসবাবপত্র দিয়েছি। পাশাপাশি ডেলিভারির জন্য খাটেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আরও সমস্যা থাকলে আমার জানা নেই। যদি তারা আসেন আমি সমাধান করে দেওয়ার চেষ্টা করবো।
আপনার মন্তব্য