০৫ জানুয়ারি, ২০২৫ ২২:১১
ফজরের নামাজের পর পরই কুয়াশাচ্ছন ভোরে হাতে কায়দা ও কোরআন রাখার রিয়াল নিয়ে সিলেট সদর উপজেলার ছামাউরাকান্দি মেঠোপথ ধরে আসছে চার শিশু। কোথায় যাচ্ছও জিজ্ঞেস করতেই সবাই একসাথে বলে উঠলো , ‘মক্তবো যাইরাম, আরবি পড়াত’। তাদের সবার গন্তব্য ছামাউরাকান্দি পূর্বপাড়া চরের হাটি জামে মসজিদ। সেখানে তারা প্রতিদিন আরবি পড়তে যায়।
বুধবার (১ জানুয়ারি) ভোর সাতটায় দেখা যায় মসজিদের বারান্দায় প্রায় ২৫ জন শিশু কিশোরকে আরবি পড়াচ্ছেন মসজিদের ইমাম মো. উয়াছির উদ্দিন।
আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশে মক্তব শিক্ষা চালু ছিল। গ্রাম বা শহরে যেকোনো জায়গায় পরিবারের পর একজন শিশু প্রাথমিক শিক্ষা পেত মক্তবে। তবে বর্তমানে শহরে মক্তব শিক্ষা হারিয়ে গেলেও গ্রাম এলাকায় এখনও চালু আছে মক্তবে আরবি পাঠদান। সিলেট সদর উপজেলা ছামাউরাকান্দি, বাওরকান্দি, নীলগ্রামসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মসজিদের মক্তবে শতাধিক শিশু কিশোরদের আরবি পাঠদান করা হয়। আরবি পাঠদানের পাশাপাশি এসব মক্তবে নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত, মাতা-পিতার প্রতি কর্তব্য, বড়দের সম্মান, ছোটদের স্নেহ, আদবসহ শিশু কিশোরদের নৈতিক শিক্ষার প্রাথমিক জ্ঞান দেওয়া হয়।
শিশুদের মক্তবে যাওয়ার চিরাচরিত এই দৃশ্য এখন শহরে দেখা না গেলেও শহরতলী বা গ্রামে দেখা মিলে এই দৃশ্যের। প্রাচীনকাল থেকে মসজিদের বারান্দাকে কেন্দ্র করে চলে মক্তব শিক্ষার কার্যক্রম। ছামাউরাকান্দি পূর্বপাড়া চরের হাটি জামে মসজিদেও এর ব্যতিক্রম নয়। এই মসজিদের বারান্দায়ই মক্তবের কার্যক্রম পরিচালনা করেন ইমাম মো. উয়াছির উদ্দিন।
সরজমিনে দেখা যায়, সব শিশু কিশোর আসার পর ইমাম সাহেব সকলকে কিছু সূরা পড়ান। তারপর কিছু শিক্ষার্থী মসজিদের ভিতর থেকে তাদের কায়দা, ছিপারা ও কোরআন শরীফ নিয়ে আসে। তারপর হুজুর তাদের পূর্বের দেওয়া পড়া নেন। যার যেটা ভুল হয় সেটা সঠিকভাবে শিখিয়ে দেন। এরপর শিশু কিশোরদের আরবি পড়ার শব্দে মুখরিত হয়ে উঠে মসজিদ প্রাঙ্গণ। আরবি পড়া শেষে মসজিদের আঙ্গিনায় হুজুর সকল শিক্ষার্থীদের গোল করে দাঁড় করিয়ে ‘ছুটির ছবক’ দেন। এই ছুটির ছবকে থাকে বিভিন্ন দোয়া, অজুর নিয়ম, বড়দের সম্মান করাসহ বিভিন্ন নৈতিক শিক্ষা ও ইসলাম ধর্মীয় নিয়ম কানুন। ‘ছুটির ছবক’ শেষে সবাই দলবেঁধে আবার বাড়ি চলে যায়।
মক্তবে পড়তে আসা মাহিন, ফাহাদ, মারিয়া, তায়িবা খবরের কাগজকে বলে, তারা প্রতিদিন সকালে মক্তবে আরবি পড়তে আসে। হুজুর তাদের আরবি শিক্ষার পাশাপাশি মা-বাবা, ভাই-বোনসহ বড়দের সম্মান করতে বলেন। ভাল কাজ করতে বলেন।
ছামাউরাকান্দি পূর্বপাড়া চরের হাটি জামে মসজিদের ইমাম মো. উয়াছির উদ্দিন বলেন, গ্রামে এখনো কিছু মক্তব চালু আছে। এই মসজিদ যেসময় চালু হয় তখন থেকেই এখানে মক্তবের কার্যক্রম চালু হয়েছে। এই মক্তবে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। এই শিক্ষার প্রতিটি শিশুর জীবনের পুঁজি। ইসলামি তরিকার মাধ্যমে জীবনে চলার সহজ পন্থা শিখতে পারে তারা। মক্তবে আমরা কলিমা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দোয়া শিখানো হয়। তাদের আমরা তিন স্তরে পড়াই। প্রথমে আমি বলে দেই তারা আমার সাথে সাথে সূরা, কেরাত পড়ে। এরপর তারা কায়দা, ছিপারা, কোরআন শরীফ পড়ে। আমি পরে ছবক নেই। ছুটির ঘণ্টা বাজলে তাদের কিছু দৈনন্দিন মাসনুন দোয়া, অজুর ফরজ, নামাজের ফরজ, ছুটির আদব, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করতে বলি। প্রতি শুক্রবার মক্তব বন্ধ থাকে।
আপনার মন্তব্য