নিজস্ব প্রতিবেদক

৩১ আগস্ট, ২০২৫ ২৩:৩২

সাদপাথর লুট: ডিসি-ইউএনওর পর যেতে হল ওসিকেও

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর লুট কান্ডে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) পর কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উজায়ের আল মাহমুদ আদনানকেও চলে যেতে হলো।

দেশ তোলপাড় করা এই লুটকান্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিলো এই তিনজনের বিরুদ্ধেই। এছাড়া এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর তদন্তে প্রশাসনের আরও অনেকের নামও উঠে আসে। তবে ওই কর্মকর্তারা এখনও বহাল রয়েছেন।

 রোববার কোম্পানীগঞ্জের ওসিকে এক অফিস আদেশে বদলি করা হয়। বিষয়টি

এ তথ্য জানিয়ে সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, নিয়মিত বদলির অংশ হিসেবে কোম্পানীগঞ্জের ওসিকে বদলি করা হয়েছে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে পরিদর্শক রতন শেখকে।

এর আগে ১৮ আগস্ট সিলেটের ডিসি মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে ওএসপি করা হয় এবং কোম্পানীগঞ্জের ইউএনও আজিজুন্নাহারকে বদলি করা হয়। এ ছাড়া ২৫ আগস্ট সিলেটে পুলিশের ২২ সদস্যকে বদলি করা হয়। তাদের মধ্যে পাথর লুটকাণ্ডে আলোচিত কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট থানায় কর্মরত ১১ জন উপপরিদর্শক (এসআই) ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আছেন।

প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর, সংরক্ষিত বাংকার এলাকা, ভোলাগঞ্জ কোয়ারি ও শাহ আরেফিন টিলা এলাকায় পাথর লুট ‘ঠেকাতে না পারায়’ ডিসি ও ইউএনও সমালোচিত হন। সর্বশেষ দেশ-বিদেশে সুপরিচিত পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর থেকে সম্প্রতি অন্তত ৮০ শতাংশ পাথর লুট হওয়ায় তাঁরা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের বদলি করা হয়। তবে বদলির কারণ হিসেবে এসব উল্লেখ করা হয়নি।

লুটের পর ১৩ আগস্ট সাদাপাথর এলাকায় অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরে দুদক ঢাকায় একটি প্রতিবেদন পাঠায়।

দুদকের ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ওসিসহ সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ সদস্যরা অবৈধ পাথর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করে সাদা পাথর লুটপাটে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন।

সাদাপাথরে নজিরবিহীন লুট নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার মধ্যে গত ১৩ আগস্ট দুদকের সিলেট কার্যালয়ের উপ পরিচালক রাফি মো. নাজমুস সাদাতের নেতৃত্বে একটি টিম সাদাপাথর পরিদর্শন করে। এরপর তারা ১৬ আগস্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

প্রতিবেদনে সাদাপাথর লুটে বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা মিলিয়ে ৫৩ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক।

কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ উজায়ের আল মাহমুদ আদনান সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনিসহ সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ সদস্যরা অবৈধ পাথর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করে সাদা পাথর লুটপাটে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর প্রতি ট্রাকে প্রায় ৫০০ ঘনফুট করে লোড করা হয়। পরিবহণ ভাড়া ছাড়া প্রতি ট্রাকের পাথরের দাম ধরা হয় ৯১ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রতি ট্রাক থেকে দশ হাজার টাকা পুলিশ ও প্রশাসনের জন্য আলাদা করা হয়। বাকি ৮১ হাজার টাকা অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীরা নিজেদের মাঝে বণ্টন করে নেয়। এছাড়া প্রতি ট্রাক থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে পুলিশের জন্য ৫ হাজার টাকা এবং উপজেলা প্রশাসনের জন্য ৫ হাজার টাকা বণ্টন হতো। এছাড়াও অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন কাজে ব্যবহৃত প্রতিটি বারকি নৌকা হতে এক হাজার টাকা করে নেওয়া হয়।

যার মধ্যে পুলিশ বিভাগ পায় ৫০০ টাকা এবং প্রশাসন (ডিসি ও ইউএনও) পায় ৫০০ টাকা। পুলিশ নির্দিষ্ট সোর্সের মাধ্যমে প্রত্যেক ট্রাক ও নৌকা থেকে এসব চাঁদা বা অবৈধ অর্থ সংগ্রহ করে।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর এলাকা থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। খনিজসম্পদ অধিদপ্তর, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, গত এক বছরে দায়িত্ব পালন করা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চারজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি এবং স্থানীয় বিজিবি সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সাদাপাথর লুট কান্ডে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী এবং পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানেরও দায় দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

তদন্ত প্রতিবেদনে সাদা পাথর লুটের ‘প্রত্যক্ষও পরোক্ষভাবে জড়িত’ এবং ‘সুবিধাভোগী ব্যক্তি ও সংস্থার’ একটি তালিকা দিয়েছে দুদক। এই তালিকায় বিভাগীয় কমিশনার ও সুপারের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত