ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ

২২ মে, ২০২৬ ১৮:৪০

হাওরের তলদেশ থেকে তুলে আনছেন বছরের খোরাকী

দিরাই রাস্তার মুখ সংলগ্ন মদনপুর গ্রামের উত্তরে যতদূর চোখ যায় দেখারহাওরে শুধু পানি আর পানি। পানিতে ভাসছে ছোট ছোট নৌকা। নৌকাগুলো মাছ ধরছে ভেবে অনেকে ভুল করতেই পারেন। কিন্তু নৌকায় থাকা ব্যক্তিরা জাল দিয়ে মাছ ধরছেন না, বরং আঁছড়ি দিয়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়া স্বপ্নের পাকা ধান তুলে নৌকায় রাখছেন। নৌকা বোঝাই হলে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে রেখে নৌকাটি আবার ছুটে চলে হাওরের মাঝখানে। এভাবে সারাদিন দু’জন বা তিনজন মিলে পানির নিচে থাকা ধান আঁচড়ে পাড়ে তুলে নিয়ে আসেন।

এদিকে, এই ধানকে প্রথমে রাস্তার একপাশ দিয়ে মেলে দেন কৃষক পরিবারের নারী সদস্যরা। পরে, পা দিয়ে মাড়িয়ে খড় ছাড়িয়ে আলাদা করেন ধান। এই কাজে তাদেরকে সাহায্য করেন পুরুষরাও। এই ধান শুকিয়ে বছরের খোড়াকীর যোগার করছেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মদনপুর গ্রামের কৃষকরা। এভাবে শুধু যে মদনপুর গ্রামের কৃষকরাই তলিয়ে যাওয়া ধান তুলে আনছেন তা কিন্তু নয়, জেলার প্রায় সব হাওর থেকেই এসব একই প্রক্রিয়ায় ধান তুলে সারা বছরের খোড়াকীর যোগার করছেন সুনামগঞ্জ জেলার কৃষকরা। এক রকম নিরুপায় হয়েই এমন কাজ করছেন তারা।

জানা যায়, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পাকার আগেই অথবা পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। ধান হারিয়ে অনেকে দিশেযহারা হয়ে পড়েন। অন্যদিকে, অনেক জমিতে পাকা ধান থাকলেও শ্রমিকের অভাবে কাটাতে না পারায় পানির নিচে চলে গিয়েছিলো অনেক জমি। গত কয়েকদিন বৃষ্টিপাত কম ও তুলনামূলক কম পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু ধান কাটার সাহস করেছেন অনেকে। তাই নৌকার মাধ্যমে আছড়ি দিয়ে ধান তুলে পাড়ে আনছেন। যদিও এই ধান দেখতে কালো ও থেতে খুব একটা স্বাদ হবে না। কৃষকরা জানান, এই ধান তুলে আনা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। এইসব ধান তুললে সারা বছর খাবো কী?

মদনপুর গ্রামের কৃষক মদরিছ আলী জানান, হাওরের তলে ৮ থেকে ১০ কিয়ার জমি পানিতে তলিয়ে গিয়েছে। একটি ধানও তুলতে পারিনি। এখন কষ্ট করে হাওরের তল থেকে কিছু ধান তুলে আনার চেষ্টা করছি। যদি কিছু আনতে পারি তাহলে সন্তান সন্ততিদের নিয়ে খাবো।

ফজিলাতুন নেছা বলেন, আমার ছেলে মেহনত করে পরের জমি চাষ করেছিলো। অনেক টাকা খরচ হয়েছে, কষ্ট করেছে। সব ধান পানিতে তলিয়ে গিয়েছে। এখন কিছু তুলে আনার চেষ্টা করছে। একমাসের খোড়াকী হলে তো হলো। আছির আলী নামের আরেক কৃষক বলেন, ১২ কিয়ার জমি চাষ করে মাত্র ৩ কিয়ার তুলে ছিলাম। বাকী পানিতে চলে গিয়েছে। পেতে তো আর বুঝে না, তাই কষ্ট করে তলিয়ে যাওয়া ধানও ‘আকি’ দিয়ে তুলে আনার চেষ্টা করছি।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. ওবায়দুল হক মিলন বলেন, সুনামগঞ্জের মানুষ এখন অসহায়। বলতে পারেন অনেক কৃষকের ঘরে খাওয়ার মতো ধানচাল নেই। পানিতে সব চলে দেছে। এই জেলার কৃষকরা কখনোই পরিশ্রমের কাছে হারেন না, হারেন দুর্নীতিবাজ আমলাদের দুর্নীতি ও অপসিস্টেমের কাছে।

তিনি বলেন, আগামীতে বাঁধ নির্মাণ করতে হলে উভয়দিক বিবেচনা করে নির্মাণ করতে হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর পাচ্ছি যে, রাজনৈতিক প্রভাবে কৃষকদের তালিকা হচ্ছে। এমনটি হলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্তই থেকে যাবেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত