সিলেটটুডে ডেস্ক

১৪ জুন, ২০২৬ ১৭:২২

ব্রাজিলের খেলা দেখে আর ব্রাজিল মনে হয় না

মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করেছে ব্রাজিল। ১-১ গোল শুধু একটি ম্যাচের ফল নয় এটি ব্রাজিলের পুরোনো পরিচয় হারানোর আরেকটি সতর্ক সংকেত। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের এক ঝলক জাদু দলকে হার থেকে বাঁচিয়েছে, কিন্তু যে প্রশ্নটা তৈরি হয়েছে তা হলো, এই ব্রাজিল কি সত্যিই বিশ্বকাপ জেতার মতো দল?

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হলুদ জার্সির ঢেউ ছিল। গ্যালারিতে ব্রাজিলিয়ান আবেগ ছিল। ভিনিদের কাছে প্রত্যাশাও ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু মাঠে ব্রাজিলকে দেখে বারবার মনে হয়েছে, এই ব্রাজিল কেবল নামসর্বস্ব। ব্রাজিলের খেলায় ব্রাজিলের সেই সাম্বা আর নাচে না।

গ্রুপ-সি এর উদ্বোধনী এই ম্যাচে ২১ মিনিটে ইসমায়েল সাইবারির গোলে এগিয়ে যায় মরক্কো। ৩২ মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত শটে সমতায় ফেরে ব্রাজিল। স্কোরলাইন দেখে মনে হতে পারে, দুই শক্তিশালী দলের সমানে সমান লড়াই। কিন্তু মাঠের চিত্রটা ছিল অন্যরকম। বিশেষ করে প্রথম ৩০ মিনিটে ব্রাজিল ছিল ছন্নছাড়া, ভারসাম্যহীন। কোনোভাবেই নিজেদের ফিরে পাচ্ছিল না তারা।

মরক্কো শুরুতেই ব্রাজিলকে চাপে ফেলে। তারা যে ভয় পায় না, সেটা শুরু থেকে বুঝিয়ে দেয়। বল দখলের লড়াইয়েও ছিল এগিয়ে। শুরু থেকে তারা জায়গা তৈরি করেছে, ব্রাজিল যাতে ভুল করে। প্রথম ১০ মিনিটে মরক্কো শট নেয় পাঁচটি। আর প্রথম ৩০ মিনিটে নেয় ১২টি শট। এই পরিসংখ্যান দেখে যেকেউ ভাবতে পারেন, খেলাটা সত্যিই ব্রাজিলের বিপক্ষে তো!

মরক্কোর গোলটাও ছিল ম্যাচে ব্রাজিলের দুর্বল অবস্থার একটা প্রতিকী চিত্র। ব্রাহিম দিয়াজের থ্রু পাসে সাইবারি ব্রাজিলের দুই সেন্টার-ব্যাকের মাঝের ফাঁকা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে যান। আলিসন এগিয়ে আসতেই ঠান্ডা মাথায় সাইবারি বল তুলে দেন জালে। এই গোলই বলে দেয়, পুরো ম্যাচে মরক্কোর পরিকল্পনা কেমন ছিল। অপরদিকে এটিও বলে দেয়, কেমন ছিল ব্রাজিলের রক্ষণ ও মাঝমাঠের বিচ্ছিন্নতা।

ভিনিসিয়ুস জুনিয়র না থাকলে রাতটা ব্রাজিলের জন্য আরও বিব্রতকর হতে পারত। ৩২ মিনিটে বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের বাঁকানো শটে তিনি যে গোলটি করেন, সেটি ছিল তার প্রতিভার নিখাদ উদাহরণ। ব্রুনো গিমারায়েসের পাস থেকে জায়গা বানিয়ে ইয়াসিন বুনুকে পরাস্ত করা মুহূর্তটাই ব্রাজিলকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু সমস্যা হলো- ব্রাজিল এই ম্যাচে দল হিসেবে রক্ষা পায়নি, একজন খেলোয়াড় তার ব্যক্তিগত ঝলকে দলটাকে বাঁচিয়েছেন।

এ জায়গাটাই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার। ব্রাজিল একসময় দলগত সৌন্দর্য আর ব্যক্তিগত জাদুর মিলিত নাম ছিল। রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিয়ো, কাকারা শুধু ম্যাচ জেতাননি, তারা ম্যাচের ভাষা বদলে দিতেন। সেই সক্ষমতা তাদের ছিল। এখনকার ব্রাজিলেও একঝাঁক তারকা আছেন। গতিও আছে মোটামুটি। তারকাদের ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু নেই আগের সেই ছন্দ। নেই সেই স্বতঃস্ফূর্ততা, যা ব্রাজিলকে বিশ্ব ফুটবলে আলাদা করে।

তাহলে ভুলটা কোথায় হচ্ছে? প্রথমত ডান দিক থেকে। রজার ইবানিয়েজ মূলত সেন্টার-ব্যাক। কিন্তু তাকে খেলানো হচ্ছে রাইট-ব্যাক হিসেবে। এই সিদ্ধান্তটা শুরু থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। মরক্কো দ্রুত বুঝে নেয় যে, ব্রাজিলের ওই সাইড দুর্বল। নুসাইর মাজরাউই ও বিলাল এল খানুস সেই দিক দিয়ে বারবার চাপ তৈরি করেন। ব্রাজিলের ডান প্রান্তটা মরক্কোর জন্য খেলার মাঠ তৈরি করে দিয়েছিল।

দ্বিতীয় সমস্যা ছিল মাঝমাঠ। কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমারায়েস নামের ভারে নুজ্য। মরক্কোর বিপক্ষে তাদের মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে ছিল না। কাসেমিরো বারবার বল হারিয়েছেন। একটা ম্যাচে এতো বার বল হারানো ব্রাজিলকে আমরা শেষ কবে দেখেছি, মনে করতে বিস্তর পরিসংখ্যান ঘাটতে হবে। লুকাস পাকেতাও আক্রমণ ও রক্ষণের সংযোগে স্বচ্ছতা দিতে পারেননি। ফলে ব্রাজিলের রক্ষণ বারবার অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। এর কুফল দেখেছে তাদের আক্রমণভাগ। ভিনিরা বল পেয়েছেন বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। আনচেলত্তি নিজেও স্বীকার করেছেন ম্যাচে তারা অনেকবার বল হারিয়েছেন।

তৃতীয় ভুল ছিল আক্রমণের কাঠামো। ইগর থিয়াগোকে শুরু থেকে নামানো ছিল চমক। কিন্তু তিনি ভিনিসিয়ুস ও রাফিনিয়ার সঙ্গে কার্যকর বোঝাপড়া গড়ে তুলতে পারেননি। ব্রাজিলের আক্রমণ তাই অনেক সময় দুই উইঙ্গারের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আটকে গেছে। মাঝ দিয়ে নজরকাড়া পাস, বক্সের সামনে দ্রুত ওয়ান টু, ডিফেন্স ভাঙার পরিকল্পিত মুভ- খুব একটা দেখা যায়নি।

দ্বিতীয়ার্ধে আনচেলত্তির মাথাটা একটু খুলেছিল। ইবানিয়েজ ও কাসেমিরোর জায়গায় দানিলো ও ফাবিনিও আসার পর ব্রাজিল কিছুটা ভারসাম্য ফিরে পায়। তাই দ্বিতীয়ার্ধে বলের দখলে তারা বেশ এগিয়ে ছিল। তার অন্য একটা কারণ হলো, মরক্কো তখন একটু সংযত হয়ে খেলছিল। তবে ব্র্রাজিলের আক্রমণভাগের কাছ থেকে অসাধারণ কোনো কিছু দেখা যায়নি। শেষ দিকে চাপ বাড়লেও গোল আসেনি। বরং শেষ মুহূর্তে আলিসনের ডাবল সেভ না থাকলে ম্যাচটা ব্রাজিল হারতেও পারত।

তাহলে উন্নতির জায়গাটা কোথায়? প্রথমত রাইট-ব্যাক সমস্যার সমাধান দরকার। বিশ্বকাপ জেতার দল অস্থায়ী পজিশন দিয়ে পুরো টুর্নামেন্ট চালাতে পারে না। রক্ষণভাগে স্থিরতা না থাকলে বড় ম্যাচে ভিনিসিয়ুসের গোলও যথেষ্ট হবে না। এরপর, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে হবে। শুধু অভিজ্ঞতা নয়, গতি ও নিখুঁত পাসিং দরকার। সব মিলিয়ে এমন মাঝমাঠ দরকার যারা ম্যাচের রশিটা শুরু থেকে নিজের হাতে রাখবে।

আর ব্র্রাজিলের যে দুর্বলতা মরক্কো দেখিয়ে দিল, সেটি হলো- তাদের মধ্যমাঠ। দলটি দেখিয়ে দিয়েছে, ব্রাজিলকে মাঝমাঠে আটকে দিলে তাদের আক্রমণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পাশাপাশি আক্রমণের ক্ষেত্রে ব্রাজিলকে অবশ্যই নির্ভরতা কমাতে হবে। ভিনিসিয়ুস অসাধারণ, সেটা নিয়ে কারো সন্দেহ নাই। তবে ব্রাজিল যদি শুধু তার দিকেই তাকিয়ে থাকে তাহলে সেটি বিশ্বকাপজয়ী দলের লক্ষণ নয়। রাফিনিয়াকে আরও কার্যকরভাবে খেলায় আনতে হবে। দলটিকে স্ট্রাইকারের ভূমিকা পরিষ্কার করতে হবে। পাকেতাসহ বাকিদের ফিরতে হবে স্বরূপে।

ব্রাজিলকে নিজের পরিচয় ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা জানি, আধুনিক ফুটবলে শৃঙ্খলা জরুরি। কিন্তু ইতিহাস বলে, ব্রাজিলের শক্তি কখনোই শুধু শৃঙ্খলা ছিল না। তাদের শক্তি ছিল আনন্দ, গতি, সাহস, বল পায়ে যা কিছু করার স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা যদি পুরোপুরি হারিয়ে যায় তাহলে ব্রাজিল আর অন্য বড় ইউরোপীয় দলের মতোই একটি দল হয়ে যাবে। সেই দলটা হয়তো অনেক ভালো হবে, শক্তিশালী হবে, কিন্তু ততোটা ভয়ংকর হবে না, যেভাবে বিশ্ব তাদের চেনে।

মরক্কো ম্যাচ এখন অতীত। এই ড্র ব্রাজিলের জন্য বিপর্যয় নয়। প্রথম ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা বা হারা যায় না আনচেলত্তিও সেটি বলেছেন। কিন্তু প্রথম ম্যাচ অনেক সময় একটি দলের ভেতরের সত্যিটা দেখিয়ে দেয়। এই ম্যাচ দেখিয়েছে, ব্রাজিলের নাম আছে, প্রতিভা আছে। কিন্তু দল হিসেবে তারা এখনও পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি।

তাহলে এই ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিততে পারে? হ্যা, পারে। তবে সেটা কাগজে-কলমে। কারণ তাদের হাতে ভিনিসিয়ুস আছে, আলিসন আছে, অভিজ্ঞতা আছে, বেঞ্চে বিকল্পও আছে। কিন্তু মাঠে যে ব্রাজিলকে দেখা গেল, সেই দল এখনও বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল নয়। সেই দলের মধ্যে এখনও ভয় ধরানো ধার নেই। ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের দাপট তারা দেখাতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা হলো- এই দলটিতে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সেই আত্মা নেই।

এবারের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে খেলল ব্র্রাজিল। সাম্বার সুরে পুরো গ্যালারি মেতেছে। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখেছে। কিন্তু মাঠের ফলাফলে তার প্রতিধ্বনি ম্লান। ব্রাজিলের খেলা দেখে তাই প্রশ্ন জাগে, এই হলুদ জার্সির ভেতরে সেই ব্রাজিলটা কোথায়? নিশ্চয় ব্রাজিল ফিরবে ব্রাজিলের মতো করে। সেটা দেখার অপেক্ষায় লাখো কোটি ফুটবলভক্ত।

সূত্র: সমকাল

আপনার মন্তব্য

আলোচিত