১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০১:০৪
সিলেট নগরের রায়নগর এলাকায় বৃদ্ধ দম্পতি ও তাদের বাসার গৃহকর্মীকে হত্যার ঘটনার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় বাবুল মিয় নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, ওই বাসার খুন হওয়া গৃহকর্মী তাহমিনার সাথে প্রেমের জেরে তিনজনকে হত্যা করে বাবুল মিয়া।
বাবুল মিয়ার স্বীকারোক্তিমতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি উদ্ধার করতে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ তবে ছুরিটি পাওয়া যায়নি।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে নগরের রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় খুন হন সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ও কয়লা ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং তাদের গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (২৫)।
সকালে প্রতিবেশীরা বাসার দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে বিষয়টি সন্দেহ করেন। পরে ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজার তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে পিবিআই ও সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।
ঘটনার পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে। এটি ডাকাতি, পারিবারিক বিরোধ নাকি সম্পত্তিসংক্রান্ত কোনো বিরোধ; এমন একাধিক সম্ভাবনা সামনে রেখে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টার মধ্যেই রায়নগর রাজবাড়ির আক্তার মিয়ার কলোনি থেকে নূর মিয়ার ছেলে বাবুল মিয়াকে আটক করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে বাবুল মিয়া তিনজনকে হত্যার কথা স্বীকার করে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটিও বাসার পাশের একটি জঙ্গলাকীর্ণ মাঠে ফেলে দিয়েছে বলে পুলিশকে জানায় বাবুল মিয়া।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের সঙ্গে বাবুল মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বুধবার সকালে তাহমিনার সঙ্গে দেখা করতেই ওই বাসায় যায় বাবুল। তাহমিনার সম্মতিতেই সে বাসায় প্রবেশ করে। একপর্যায়ে বাবুল তাহমিনার সঙ্গে শারিরীক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। তাহমিনা তাতে রাজি না হওয়ায় তাদের মধ্যে বিরোধ বাধে বলে পুলিশের কাছে বাবুল জানিয়েছে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাবুলের হাতে থাকা ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সিলেট কোতোয়ালি থানার ওসি মাইনুল জাকির জানান, ঘরের ভেতরের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, গৃহকর্মী তাহমিনার সাথে লাল জামা পরা একজন বাসায় ঢুকছে। পরক্ষনই সিসি ক্যামারা বন্ধ হয়। সেই ফুটেজের সুত্র ধরেই সন্দেহভাজনকে খুঁজতে থাকে পুলিশ। স্থানীয় একজন ভিডিও দেখে বাবুলকে চিনে ফেলে। সেই তথ্যানুযায়ী তার বাসার চারপাশে সাদাপুলিশে অবস্থান নেয় পুলিশ। এক পর্যায়ে মরদেহ উদ্ধার শেষ হলে সে বাসায় ফিরে তখনই তাকে আটক করে পুলিশ। তার গায়ে তখনও লাল গেঞ্জিই পরা ছিলো। তার দুই হাতে ছুরির আঘাতের চিহ্ন দেখেই পুলিশ নিশ্চিত হয় বলে জানান মাইনুল জাকির।
তাহমিনার চিৎকার শুনে ছুটে আসেন গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম। তখন তাকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। এরপর ধস্তাধস্তি ও চিৎকারের শব্দ শুনে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার ঘর থেকে বেরিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়।
তিনজনকে হত্যার পর ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে বাসার বেলকনি দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় বাবুল। হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি পরে বাসার পাশের জঙ্গলাকীর্ণ একটি মাঠে ফেলে দেয়। এরপরও সে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়নি; বরং রায়নগর এলাকাতেই অবস্থান করছিল।
নগরীর সোবাহনীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই (নিরস্ত্র) শিপলু চৌধুরী জানিয়েছেন, বাবুল মিয়া পেশায় রঙ মিস্ত্রি। পাশাপাশি মাঝেমধ্যে কসাইয়ের কাজও করত। কসাইয়ের কাজের সুবাদে তার কাছে থাকা ছুরিটিই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেছেন, ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়াকে আটক করা হয়। সে বাসার রংমিস্ত্রির কাজ করত, মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করত। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, ওই বাড়িতে কাজ করত। সে সুবাদে কাজের মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাবুল ওই বাসাতে প্রবেশ করে। তাহমিনা তাকে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকায়। তারপর দরজা বন্ধ করে দেয়।’’
পুলিশ কমিশনার বলেন, পরে বাবুল গৃহকর্মীকে নিয়ে একটি কক্ষে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে শারীরিক সর্ম্পক স্থাপন নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। এর জেরে একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে মেয়েটিকে আঘাত করে।
তিনি বলেন, শব্দ পেয়ে আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। তাদের চিৎকার শুনে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে আসেন। তখন তাকেও ছুরি মেরে হত্যা করে বাবুল। পরে সে বারন্দা দিয়ে পালিয়ে যায়।
তিনি আরও জানান, বাবুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাশের একটি ঝোপঝাড় থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
আপনার মন্তব্য