২২ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:২৮
আপত্তির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে গানের এই অনুষ্ঠান
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে স্থানীয়দের আপত্তির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে নারী শিল্পীদের নিয়ে আয়োজিত একটি বাউল গানের অনুষ্ঠান। বৃহস্পতিবার উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া-রাধানগর গ্রামে এক প্রবাসীর উদ্যোগে এই গানের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল।
তবে বুধবার এই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে তা বন্ধে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে লিখিত আবেদন করা হয়। এই আবেদনের পর বন্ধ হয়ে যায় গানের অনুষ্ঠান।
দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলামের কাছে দেওয়া আবেদনে ‘গ্রামবাসীর পক্ষে’ আতাহার আলী রাহাত ও কামরুল হাসান মিটু নামে দুজন অনুষ্ঠানটি বন্ধ বা স্থগিত করার উদ্যোগ নিতে অনুরোধ জানান।
এদের মধ্যে আতাহার আলী রাহাত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দিরাই উপজেলা শাখার আহ্বায়ক। তিনি জুলাইযোদ্ধা বলে জানা গেছে।
গানের অনুষ্ঠানে আপত্তি জানানো প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার রাতে রাহাত সিলেটটুডেকে বলেন, পুরো এলাবাসী এ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছেন। এলাকাবাসীর পক্ষে আমরা পুলিশের কাছে গানের অনুষ্ঠান বন্ধের জন্য আবেদন করেছি।
তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় ওলির মাজার রয়েছে, মাদ্রাসাসহ অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখানে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও অসামজিক কাজ চলতে পারে না। গানের নামে মেয়েদের অশ্লীল নাচ, মদ, গাঁজার আসর বসানোর বিপক্ষে আমরা সবাই। এলাকার যুব সমাজ একম আয়োজনের বিরুদ্ধে।
প্রবাসীর গানের আসরে মদ-গাঁজার আসর বসতো কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব কথা আমি ফোনে আপনাকে ক্লিয়ার করতে পারবো না। আপনি সরেজমিনে এসে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।
জানা যায়, দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া-রাধানগর গ্রামে বাউল গানের এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন শওকত আলী নামে যুক্তরাজ্য প্রবাসী স্থানীয় এক ব্যক্তি। বৃহস্পতিবার গানের এ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। এতে তানিশা ও নিলা নামে দুই নারী বাউল শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশশনের কথা ছিল। এ আয়োজনের ব্যাপারে এলাকায় পোস্টারিংও করান শওকত আলী।
বুধবার গানের এই আয়োজন বন্ধের দাবিতে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে জমা দেওয়া লিখিত আবেদনে বলা হয়, হাতিয়া গ্রামটি দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামী ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। গ্রামে একটি আলিম মাদ্রাসা, একজন আল্লাহর ওলির মাজার এবং অনেক আলেম-ওলামার বসবাস রয়েছে। সেখানে গানের অনুষ্ঠানের আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে আবেদনকারীরা উল্লেখ করেন।
আবেদনকারীদের দাবি, আয়োজকদের প্রচার অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে নারী শিল্পীদের দিয়ে গান পরিবেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এ আয়োজন অব্যাহত থাকলে উত্তেজনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা। গ্রামের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান আবেদনকারীরা।
আবেদনে আরও উল্লখ করা হয়, আমোদের গ্রামে ইতোপূর্বে এ ধরণের আয়োজনের নজির নেই। আমরা চাই এলাকার ধর্মীয় ঐতিহ্য, সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ অটুট থাকুক। এবং কোন অপীতিকর ঘটনা, সংঘাত-সহিংসতা না ঘটুক।
এ বিষয়ে দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বৃহস্পতিবার বলেন, গানের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আপত্তি পাওয়ার পর আমরা আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, তাঁরা গান-বাজনা করবেন না। ফলে বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গিয়েছে।
বাউল শিল্পীদের জন্য বিখ্যাত ভাটির জনপদে বাউল গানের আসরে বাধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাউল গান নিয়ে তারা আপত্তি জানাননি। নারী শিল্পী থাকায় আপত্তি জানিয়েছেন। নারী শিল্পীদের কারণে অশ্লীল নৃত্যসহ অসামাজিক কার্যকলাপের আশঙ্কা করছেন স্থানয়ীরা। ফলে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষায় এ অনুষ্ঠান বন্ধের আবেদন করেছেন।
এর আগে গত ৫ অক্টোবর দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচও স্থানীয় একটি পক্ষের আপত্তির মুখে স্থগিত করা হয়েছিল। দিরাইয়ের স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের মেয়েদের মধ্যে ওই ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। আয়োজক স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ও কোচ রাকিব আহমেদ ভূঁইয়ার জানিয়েছিলেন, খেলার আগের রাতে কয়েকজন ব্যক্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে গিয়ে ম্যাচ বন্ধের দাবি জানান। পরে ইউএনওর সঙ্গে আলোচনার পর ম্যাচটি স্থগিত করা হয়।
কোচ রাকিব আহমেদ বলেন, দিরাই পৌর এলাকার চণ্ডীপুরের বাসিন্দা মাওলানা শরিফ উদ্দিনসহ কয়েকজন খেলার নামে ‘অশ্লীলতা’ বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। ইউএনও অফিস থেকে বেরিয়ে তারা এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। তারপর প্রশাসনের নির্দেশে আমাদের খেলাটি স্থগিত রাখতে হয়।
আপনার মন্তব্য