এস আলম সুমন, কুলাউড়া

১৭ জুলাই, ২০১৬ ২১:২৬

বিলুপ্তির পথে কুলাউড়ার মৃৎ শিল্প

মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো কোন কিছু নিয়ে তা দিয়ে চিন্তার ফসল হিসেবে কিছু সৃষ্টি করা। আবার জীবিকার তাগিদে কিছু সৃষ্টি করার মানসে সেটার প্রতি অভ্যস্ত হওয়া। মানুষের সৃজনশীল কর্মের ইতিহাস অন্তত তাই বলে। জীবন ধারণের জন্য মানব সভ্যতার ইতিহাসের শুরু থেকেই এ ধরণের নজির স্থাপিত হয়েছে বহুবার।


মাটি দিয়ে গঠন-কাঠামো অনুযায়ী শৈল্পিক কারুকার্যময় ও বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র তৈরী করে যারা সেই সম্প্রদায়কে আমরা কুমার বলি। আর তাদের সেই সৃষ্টি কর্মকে শিল্পের ভাষায় মৃৎ শিল্প বলে। এক সময় দৈনন্দিন জীবনে মাটির তৈরী বিভিন্ন তৈজসপত্রের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এখনও শহরাঞ্চলে মাটির তৈরী কারুকার্যময় তৈজসপত্রের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে প্লাস্টিক দ্রব্য সামগ্রীর ব্যবহার বৃদ্ধি আর সরকারী পৃষ্ঠপোষকতাসহ সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায় এই শিল্প আজ বিলুপ্ত হতে চলেছে।



বর্তমানে এই শিল্পের কারিগররা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা, বাজারজাতকরণসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে তাদের তৈরী পণ্যের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় অনেকে পারিবারিক এই ঐতিহ্য ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। বিলুপ্ত প্রায় সেই মৃৎ শিল্পের সাথে জড়িত কয়েকটি পরিবারের বাস মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়। অতিকষ্টে হাজার বছরের তাদের পারিবারিক এ কাজটি বংশ পরম্পরায় ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে আছেন তারা। যেখানে জেলার অন্যান্য কুমার পরিবারগুলো তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন, সেখানে কতদিন এ পেশাটাকে আঁকড়ে থাকতে পারবেন এ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।


কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের মনসুরপুর গ্রামে মৃৎ শিল্পের সাথে জড়িত ১৪টি পরিবার বাস করে। এক সময় এ অঞ্চলের কারিগরদের মাটির তৈরী বিভিন্ন তৈজসপত্রের ছিলো প্রচুর চাহিদা। তাদের মাটির ফুলের টব, হাতি-ঘোড়া, খেলনা, মাটির ব্যাংক, কলসসহ বিভিন্ন প্রকার কারুকার্যময় পণ্য স্থানীয়ভাবে চাহিদা মিটিয়েও জেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করা হতো।

তবে কুমার বা মৃৎ শিল্পী অচিন্ত রায়, ভৈরবী, শ্রীবাস জানান, তাদের তৈরী কারুকার্যময় পণ্যের চাহিদা রয়েছে এখনো। কিন্তু প্রয়োজনীয় উপকরণ ও বাজারজাতকরণের অভাব, সরকারি উদ্যোগে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং সঠিক মূল্য না পাওয়ায় অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। তারা জানান, এ কাজে প্রধান উপকরণ এটেল মাটি। এটেল মাটিকে অত্যন্ত মিহি করে ম- তৈরি করে তৈজসপত্র বানানোর জন্য বিভিন্ন আকার করে রাখা হয়। তারপর ঘূর্ণায়মান চাকার উপর তুলে বিভিন্ন প্রকারের তৈজসপত্র, ফুলের টবসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করা হয়। এখন এটেল মাটি পাওয়া যায় না। মাটি, খড়, কাঠ ইত্যাদি ক্রয় করে আনতে হয়। কাঠের মূল্য প্রচুর বেড়ে গেছে এতে করে এ কাজ করে তাদের পোষায় না। শুধু বাপ-দাদার এ পেশাটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা এখনো এ পেশায় নিয়োজিত আছেন।  বর্তমানে এ কাজ করে ছেলে-মেয়েদের লেখা-পড়াসহ সংসারের খরচ চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। সরকার তাদের পেশার দিকে নজর দিয়ে সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দিলে কিছুটা হলেও দুঃখ লাঘব হবে। তাদের এ পেশায় সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসছে না।

সচেতনমহলের অনেকেই জানান, বর্তমানে সিরামিক, মেলামাইন ও স্টীলের তৈরী হাড়ি, পাতিল, কলসী, প্লেটসহ গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্য সাশ্রয়ী ও টেকসই হওয়ায় মাটির তৈরী হাড়ি, পাতিল ও থালার চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে। তবে মাটির তৈরী কারুকার্যময় ফুলেরটব, ফুলদানী, খেলনা ও বিভিন্ন ধরনের শো-পিসের এখনও দেশের সব শহরেই প্রচুর চাহিদা রয়েছে। মৃৎ শিল্পীদের আকর্ষণীয় কারুকার্যময় শো-পিস তৈরীর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে পারলে দেশ ও বিদেশে তাদের তৈরী পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল আশার বাণী না শুনিয়ে শীঘ্রই কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ঐতিহ্যবাহী বিলুপ্তপ্রায় এ শিল্প এবং এর সাথে জড়িত কুমারদের রক্ষা করা যাবে।

এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার জেলা বিসিক এর উপপরিচালক এ এইচ এম হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, বর্তমানে মাটির তৈরী হাড়ি পাতিলের চাহিদা নেই। শুধুমাত্র নকশী করা ফুলেরটব, ফুলদানীসহ মাটির তৈরী বিভিন্ন ধরনের শো-পিস এর চাহিদা রয়েছে। তাই এ ধরনের পণ্য উৎপাদনের কাজ জানতে হবে। এবিষয়ে খোঁজ নিয়ে চাহিদা অনুযায়ী মৃৎ শিল্পিদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং যথাযথ আর্থিক অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত