২২ জুলাই, ২০১৬ ০১:০২
তারাপুর চা বাগান থেকে স্থাপনা সরিয়ে নিতে জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক। বুধবার তিনি রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ বরাবর এ নোটিশ প্রদান করেন। বৃহস্পতিবার সিলেটটুডে টোয়েন্টফোর ডটকমককে এ তথ্য জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীন।
ছয় মাসের মধ্যে তারাপুর চা বাগান দখল করে গড়ে ওঠা সকল স্থপনা সরিয়ে নিতে ১৯ জানুয়ারি নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধিন হাইকোর্টের আপীল বিভাগ। গত ১৭ জুলাই এই নির্দেশনার ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে তারাপুর চা বাগান ধ্বংস করে গড়ে ওঠা কোনো স্থাপনাই সরিয়ে নেওয়া হয়নি।
এ অবস্থায় বুধবার শিল্পপতি রাগীব আলীর মালিকানাধীন জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেন জেলা প্রশাসক। নোটিশে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে তারাপুর চা বাগান থেকে স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীন বলেন, উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে প্রাথমিকভাবে সেবায়েত পংকজ কুমার গুপ্তকে শনাক্ত করার পর গত ১৫ মে তারাপুর চা বাগান সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও খালি জায়গা সরেজমিনে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এসময় অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে ছয় মাসের সময় দেওয়া হয়। এই সময়ে মধ্যে স্থাপনা অপসারণ করা হয়নি। এ অবস্থায় তারাপুর চা বাগান দখল করে গড়ে ওঠা রাগীব আলীর মালিকানাধীন জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষকে ২০ জুলাই আমরা নোটিশ দিয়েছি। নোটিশে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে বাগান থেকে স্থাপনা অপসারণে বলা হয়েছে। এর মধ্যে অপসারণ করা না হলে আমরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করবো।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক সম্মেলন নিয়ে আমি ব্যস্ত থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থাপনা উচ্ছেদ করা যায়নি।
জানা যায়, চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধিন হাইকোর্টের আপীল বিভাগ তারাপুর চা বাগান শিল্পপতি রাগীব আলীর দখল থেকে উদ্ধারের রায় দেন। এছাড়া তারাপুর চা বাগানে নির্মিত সব অবকাঠামো ৬ মাসের মধ্যে অপসারণ করে সে জায়গায় চা বাগান করার আদেশ দেন আপীল বিভাগ। রাগীব আলী গং অবকাঠামো অপসারণে করতে ব্যর্থ হলে পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশনের সহায়তা নিয়ে স্থাপনা অপসারণের কথাও উল্লেখ করা হয় রায়ে। তবে এ খাতে ব্যয় হওয়া অর্থ জেলা প্রশাসক রিট আবেদনকারীদের (রাগীব আলীর ছেলে) কাছ থেকে গ্রহণ করবেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
রায়ে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসক আপিল বিভাগের প্রদত্ত রায়ের আদেশগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করবেন।
গত ১৮ জুলাই অবকাঠামো অপসারণে আদালতের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়েছে। এই সময়কালে একটি স্থাপনাও অপসারণ করা হয়নি।
জানা যায়, তারাপুর চা বাগান দখল করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ৩৩৭ টি স্থাপনা গড়ে ওঠেছে। গত ১৫ মে এই বাগানের ৪২২.৯৬ একর জায়গার মধ্যে স্থাপনা ছাড়া ৩২৩ একর ভূমি সেবায়েকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
তবে সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্ত জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দখলকৃত চা বাগানের আংশিক জায়গা তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হলেও তাকে এ সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র এখনো দেওয়া হয়নি।
অবশ্য দখলকারীদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির দুটি মামলা সচল হওয়ার পর তদন্তে তাদের অভযিুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এক দশকেরও বেশি আগে দায়েরকৃত দুটি মামলার অভিযোগপত্রে রাগীব আলী ও তার ছেলে আবদুল হাইকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে জালিয়াতি করে হাতিয়ে নেওয়া চা বাগানটি এখনও পরোক্ষে রাগীব আলীর দখলেই রয়েছে বলে জানা গেছে। দখলকৃত জায়গায় নির্মিত অবৈধ আবাসন, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান সরিয়ে না নিয়ে বরং এসব স্থাপনার সংস্কার ও উন্নয়ন করছেন তিনি। গত বুধবার তারাপুরে গিয়েও রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংস্কার কাজ চলতে দেখা যায়।
উল্লেখ্য, ১৯১৫ সালের ২ জুলাই তারাপুর চা বাগানের তৎকালণি মালিক বৈকুণ্ঠ চন্দ্র গুপ্ত শ্রী শ্রী রাধা কৃষ্ণ জিউ দেবতার নামে বাগানটি উৎসর্গ করেন। তখন থেকেই ৪২২.৯৬ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা তারাপুর বাগানটি পুরোটাই দেবোত্তর সম্পত্তি। বৈকুন্ঠ চন্দ্র গুপ্তের পর তাঁর ছেলে রাজেন্দ্র গুপ্ত এই দোবোত্তর সম্পত্তির সেবায়েত হন। ১৯৬৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাগানটি ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে ঘোষণা করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রাজেন্দ্র গুপ্ত ও তাঁর তিন ছেলে শহীদ হন। তাঁর তিন মেয়ে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে পাক সেনারা।
পরবর্তীকালে পঙ্কজ কুমার গুপ্ত ভারত চলে গেলে ১৯৯০ সালে বাগানটির দখল নেন রাগীব আলী। আদালতের রায়ে এই দখলকে প্রতারণামূলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
আপনার মন্তব্য