শাকিলা ববি, হবিগঞ্জ

২৮ জুলাই, ২০১৬ ০০:১১

হবিগঞ্জে তিন শিশুকে নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল, এসআই ক্লোজড, গ্রেপ্তার ১

‘মামু তুমি আমার মাথাত কোরআন শরিফ আইন্না দেউ, তবুও আমি কইমু আমি এর সাথে আছলাম না। আমি এর সাথে আগে চলতাম এখন চলি না। তুমি বিশ্বাস করো আমি আছলাম না। তুমি যদি আমারে মারো আল্লার কাছে দায়ী থাকবায়। আমি আছলাম না মামু আমি আছলাম না। ও মামু আর মাইরো না গো।  মামু মাইরো না। তুমি আল্লার উপরে দায়ী থাকবায়।  খানক্কা (অহেতুক) আমার জীবনডা বাদ কইরো না মামু।’

এই আর্তনাদ এই শিশুর। তার দুহাত দড়ি দিয়ে  বাধা। পা দুটো শেকল দিয়ে তালা দেওয়া অবস্থায় তাকে যখন অমানুষিকভাবে পেটানো হচ্ছিল তখন প্রতিবেশী নারী পুরুষ আর শিশুরা ভয়ে নির্বাক হয়ে দেখিয়ে দেখছিলেন। এই দৃশ্য হবিগঞ্জ শহরের খাদ্য গুদাম এলাকার একটি কলোনিতে। একটি মোবাইল চুরির সন্দেহে শাহ আলম নামে এক  পাণ্ডা ৩ শিশুকে পেটানোর দৃশ্য টিভিতে প্রচার হওয়ার পর ভাইরাল হয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে।


নির্যাতনের শিকার  শিশুর মা রিপা গতকাল রাতে থানার বারান্দায়  এই  প্রতিবেদকের কাছে প্রথমে  কিছু বলতে রাজি হননি শাহ আলমের ভয়ে। তিনি বলেন সে থানা থেকে বের হয়েই আমাদের উপর আবারো নির্যাতন করবে। পরে একজন পুলিশ সদস্য অভয় দিলে তিনি মুখ খোলেন।  তিনি বলেন গতকাল সকালে ওই তিন শিশুকে বাড়ীতে ডেকে নেয় শাহ আলম। তার  মোবাইল চুরি করেছে অভিযোগ এনে তিন শিশু রুবেল (১৩), রনি(১২), মাহিন(১০) ওই হাত পা বাধা হয়। শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। তাদের পিটিয়ে তিনটি  শক্ত বাঁশ ভাঙ্গে শাহ আলম। এ সময় ভয়ে  কলোনীর নারী পুরুষ দাড়িয়ে দেখা ছাড়া আর যেন  কিছুই করার ছিলনা। শিশুদের আত্মচিৎকারে ওই সময় অন্যান্য শিশুরা হাউমাউ করে  কেঁদে উঠলেও মন গলেনি শাহ আলমের। মূলত ওই কলোনির এক শিশুর সাথে তাদের ঝগড়াকে কেন্দ্র করে তাদেরকে ডেকে আনা হয়। পরে মোব্ইাল চুরির অপবাদ রটানো হয় শিশুদের বিরুদ্ধে জানান রিপা বেগম।   

তিনি  জানান, আমি যখন চুরির সাথে আমার ছেলে জড়িত নয় বলছিলাম তখন শাহ আলম বলে ‘বেশী কথা বললে তোকে, তোর স্বামীকেও পেটাব’। এক পর্যায়ে শাহ আলম নিজেই থানায় খবর দেয়। এসআই রাজকুমার ঘটনাস্থল থেকে তিন শিশুকে নিয়ে আসেন থানায়। পরে ওসি নাজিম উদ্দিন শিশুদেরকে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেন। এসময় শিশুদেরকে অমানবিকভাবে পেটানোর ব্যাপারে  অভিভাবকদের অভিযোগ করলে আমলে নেননি ওসি নাজিম উদ্দিন।

এদিকে  নির্যাতনের দৃশ্য একজন মোবাইলে ভিডিও করেন। তা সাংবাদিকদের হাতে পৌঁছুলে দেশের  বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হতে থাকে।  সন্ধ্যায় টিভিতে শিশু নির্যাতনের খবর সিলেট রেঞ্জের ডিআইজির নজরে এলে তিনি পুলিশ সুপারের কাছে বিষয়টির ব্যাপারে জানতে চান। কিন্তু ওই সময় পর্যন্তও পুলিশ সুপারকে বিষয়টির ব্যাপারে হবিগঞ্জ  থানা থেকে অবগত করা হয়নি। পরে পুলিশ সুপার  বিষয়টি অবগত হয়ে রাতের মধ্যে শাহ আলমকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন।তখন নড়েচড়ে উঠেন ওসি নাজিম উদ্দিন।   পুলিশ রাত ৯টার দিকে শাহ আলমকে গ্রেফতার করে।

এদিকে ফেসবুকে নির্যাতনের দৃশ্য আপলোড হলে তা দেশ বিদেশে ভাইরাল হয়ে পড়ে । হাজার হাজার ভিউয়ার  নির্যাতনকারীর দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দাবি করেন।

কে এই শাহ আলম
বানিয়াচঙ্গ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের ছেলে শাহ আলম অসম্ভব ধুরন্ধর স্বভাবের। এলাবাসীরা জানান সে এখানে জায়গা দখল করে কলোনি গড়ে তুলেছে। এর বাসিন্দা অধিকাংশই দিন মজুর। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও বিদ্যুৎ চুরি মামলা ছিল। বিদ্যুৎ চুরির মামলায় সে ১৬ লাখ টাকা জরিমানা দেয়।

 
এসআই রাজকুমার ক্লোজড:
 কর্তব্য অবহেলার অভিযোগে গতকাল রাতে এসআই রাজকুমারকে ক্লোজডের নির্দেশ দেন পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র। তিনি এই ঘটনার মামলা, নির্যাতিত ৩ শিশুকে চিকিৎসা ও আজ সকালে কোর্টে শিশুদের জবানবন্দি করানোর জন্য একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।             



আপনার মন্তব্য

আলোচিত