২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:২২
মুনির তপন জুয়েল হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে সেইসময়ে প্রকাশিত পোস্টার
আবহমানকাল থেকেই সিলেট পরিচিত ছিল প্রগতিশীল আন্দোলন আর সংস্কৃতি চর্চার চারণভূমি হিসেবে। সবকটি গণআন্দোলনে, সাংস্কৃতিক জাগরণে সিলেট বারবার সাড়া দিয়েছে।
সেই সিলেট শহরে একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্থান সম্ভব হয় স্বৈরাচারের হাত ধরে। জামায়াত-শিবিরের হাতে একদিনে প্রাণ হারান সিলেটের তিন প্রতিবাদী তরুণ মুনির, তপন ও জুয়েল। ১৯৮৮ সালের এই মর্মান্তিক ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে ২৮টি বছর, সিলেট শহরে শেকড় বাকড় ছড়িয়ে একাত্তরের পরাজিত শক্তি এখন মহীরুহে পরিণত হয়েছে। হত্যা আর ষড়যন্ত্রের রাজনীতি পর্যালোচনা করতে গেলে, চরমপন্থিদের কৌশল বিবেচনা করতে গেলে সিলেটের এই রাজনীতি আগামী দিনের ইতিহাসে গবেষণার অংশ হবে।
১৯৮৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিলেটের প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সিলেটের রাজপথ ও ছাত্র রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারে নিজেদের অস্তিত্বের ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ঐদিন মধ্যযুগীয় কায়দায় তারা হত্যা করে তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা ও জাসদ ছাত্রলীগের তিন তুখোড় কর্মী মুনির ই কিবরিয়া, তপন জ্যোতি দেব এবং এনামুল হক জুয়েলকে। বারবার চেষ্টা করেও সিলেটের ছাত্র রাজনীতির মাঠে নিজেদের কোনো অবস্থান সৃষ্টি করতে না পেরে শিবির এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ক্যাম্পাসগুলোর দখল নেয় বলে জানিয়েছেন সিলেটের তৎকালীন ছাত্রনেতারা।
সিলেটের ছাত্র রাজনীতির মাঠে তখন বাম ধারার ছাত্র সংগঠন, বিশেষ করে জাসদ ছাত্রলীগের অবস্থান ছিল অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোর থেকে বেশি শক্তিশালী। ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেটে প্রকাশ্যে তাদের রাজনীতি শুরু করতে গেলে একাত্তরের চেতনায় সমৃদ্ধ সিলেটের ছাত্রসমাজের বাধার মুখে পড়ে। বিশেষ করে বাম ধারার ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের তৎপরতার কারণে তাদের সব উদ্যোগ ভেস্তে গেলে একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা ১৯৮৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর একই দিনে হত্যা করে জাসদ ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মী মুনির, তপন ও জুয়েলকে।
সিলেটে পরাজিত শক্তির রাজনৈতিক উত্থান
আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সিলেটে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে উঠতে শুরু করেছে, তখনই সিলেটের রাজনীতির মাঠে প্রথম প্রকাশ্যে আবির্ভূত হয় ইসলামী ছাত্রশিবির। এর আগে গোপনে তাদের কার্যক্রম চললেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভাস্বর সিলেটের জনতার সামনে তারা প্রকাশ্য রাজনীতি করার সাহস পায়নি। কিন্তু চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহীর মতো দেশের বড় বড় শহরগুলো দখলের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা সিলেটেও নির্দিষ্ট ছক বেঁধে তাদের কার্যক্রম শুরু করে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিবির ক্যাডারদের সিলেটে নিয়ে আসা হয় বলে তখনকার অনেক ছাত্রনেতা জানিয়েছেন। কিন্তু সিলেটের প্রগতিশীল ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে কোনো ক্যাম্পাসেই তাদের পক্ষে প্রকাশ্য তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
এ সময় শিবির গ্রাম ভিত্তিক রাজনীতি শুরু করে। সিলেটকে তারা কয়েকটি এলাকায় ভাগ করে শুরু করে এলাকাভিত্তিক রাজনীতি। সিলেট নগরীর চতুর্দিকে তারা তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি নিজেদের জনবল বাড়াতে শুরু করে। অন্যদিকে নগরীর কেন্দ্রস্থলে আলিয়া মাদ্রাসা দখল করে ছাত্রশিবির গড়ে তোলে নিজেদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। আলিয়া মাদ্রাসার পার্শ্ববর্তী পায়রা আবাসিক এলাকায় অনেকগুলো ছাত্রাবাস তৈরি করে তারা সব শিবির কর্মীকে সেখানে জমায়েত করতে থাকে। আলিয়া মাদ্রাসার মধ্যে অন্য কোনো প্রগতিশীল সংগঠনের কার্যক্রম না থাকায় তারা মাদ্রাসা ক্যাম্পাসকে দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করে প্রশিক্ষণ চালাতে থাকে।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে সিলেটে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন যখন ফুঁসে উঠছে, তখন শিবির নগরীর কলেজগুলোতে নিজেদের অবস্থান তৈরির জন্য প্রকাশ্যে তৎপরতা শুরু করে। কিন্তু প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো নগরীর কলেজগুলোতে শিবিরের সাংগঠনিক তৎপরতা মেনে নিতে পারেনি। ইসলামী ছাত্রশিবিরকে প্রতিরোধ করার জন্য বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে সিলেটে গঠন করা হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে তখন ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাতীয় ছাত্রদল ও জাতীয় ছাত্রলীগ।
নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টার পরেও সিলেট শহরের রাজনীতিতে অবস্থান নিতে না পেরে ইসলামী ছাত্রশিবির তখন শহরতলির বরইকান্দি এলাকায় সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে নিজেদের সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করে। সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে স্থানীয় ছাত্রদের চেয়ে সিলেটের বাইরের ছাত্রদের ভর্তি হার বেশি থাকায় শিবির বিভিন্ন জেলা থেকে তাদের ক্যাডারদের নিয়ে এসে এখানে ভর্তি এবং নিজেদের একটি অবস্থান তৈরি করে ফেলে।
১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরগরম হয়ে ওঠে সিলেটের ছাত্র রাজনীতি। বিপুল অর্থ ব্যয় করে ছাত্রশিবির পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিজেদের প্যানেলের পক্ষে প্রচারণার মাধ্যমে প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করে। সিলেট শহরে ছাত্রশিবিরের এই আকস্মিক প্রকাশ্য উত্থান চিন্তিত করে সিলেটের সব প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোকে।
সিলেটের স্থানীয় ছাত্রনেতারা তাই পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গে নেন এবং শহরের ছাত্র সংগঠনগুলোর দৃষ্টি তখন পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে নিবদ্ধ হয়। এই সুযোগে শিবির তখন সিলেট শহরের কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে তাদের ক্যাডার শক্তি বৃদ্ধি করে দখলের পরিকল্পনা নেয়।
নির্বাচন নিয়ে যখন দক্ষিণ সুরমা নামে পরিচিত শহরতলিতে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে, সেই সময়ে এমসি কলেজে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রশিবির। এ ছাড়া ছাত্রশিবির তখন নগরীতে সশস্ত্র মিছিল বের করে। সেপ্টেম্বরের ১৯ ও ২০ তারিখেও ছাত্রশিবির এমসি কলেজে সশস্ত্র অবস্থান নেয় এবং ছাত্রলীগকে তারা কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেয়নি। আর যে দুই-একজন ক্যাম্পাসে ঢুকতে সক্ষম হয়েছিল, তাদেরও মারধর করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় নগরীর সরকারি কলেজ ও মদনমোহন কলেজেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তাই কলেজ কর্তৃপক্ষ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানোর জন্য তিনটি কলেজ দুইদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন।
২০ সেপ্টেম্বর ছিল সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্র সংসদের নির্বাচন। নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের ব্যাপক ভরাডুবি হয় এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ছাত্র সংসদের ১৫টি পদের সবগুলোতে জয়লাভ করে। পলিটেকনিক নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকে ইসলামী ছাত্রশিবির বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
এই সময় সিলেটে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনও খুব শক্ত অবস্থানে ছিল। যার ফলে বারবার চেষ্টা করেও জাতীয় পার্টি স্বস্তি নিয়ে সিলেট শহরে প্রকাশ্য কোনো কার্যক্রম চালাতে পারছিল না। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মূল শক্তি ছাত্র সংগঠনগুলোকে দমাতে তাই এরশাদ সরকার এ সময় শিবিরকে ব্যবহার করা শুরু করে। ২০ সেপ্টেম্বর থেকে শিবির পুলিশ পাহারায় শহরে ও ক্যাম্পাসগুলোতে প্রকাশ্যে সশস্ত্র মিছিল করে। অন্যদিকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের বাসায় বাসায় ব্যাপক পুলিশি তল্লাশি শুরু হয়।
তখনকার সময়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের শীর্ষস্থানীয় নেতা, তৎকালীন জাসদ ছাত্রলীগ সভাপতি ও বর্তমানে সিলেট মহানগর জাসদের সভাপতি অ্যাডভোকেট জাকির আহমদ বলেন, “ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তখন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে রাজপথ কাঁপাচ্ছে। ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেটে নিজেদের অবস্থান নেওয়ার জন্য এই সময়টাকেই বেছে নেয়। আমরা সেই সময়ে শিবিরের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম, কিন্তু স্বৈরাচার সরকার আর তার লালিত পুলিশ বাহিনীর কারণে আমাদের পক্ষে গ্রেফতার এড়িয়ে শহরে অবস্থান করাই সম্ভব হচ্ছিল না। এ সময় শিবিরের মিছিলের সামনে ও পেছনে পুলিশের গাড়ি দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়া হতো।”
১৯৮৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর যা ঘটেছিল
২৪ সেপ্টেম্বর ভোরে ছাত্রশিবির কর্মীরা এমসি কলেজে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ক্যাম্পাস দখল করে নেয়। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ ছাত্ররা ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পেরে কলেজের আশপাশে জড়ো হতে শুরু করে। এ ছাড়া সিলেট আলিয়া মাদ্রাসাকে নিজেদের হেডকোয়ার্টার বানিয়ে ছাত্রশিবির নগরীর বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি, মোটরসাইকেল ও টেম্পো যোগে সশস্ত্র মহড়া দিতে শুরু করে। শিবিরের এই আকস্মিক ক্যাম্পাস দখলের ফলে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাঁরা কলেজের আশপাশে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
তখন আলিয়া মাদ্রাসা থেকে টেম্পো যোগে একদল সশস্ত্র কর্মী নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকায় জড়ো হওয়া জাসদ ছাত্রলীগের কর্মীদের ওপর চারপাশ থেকে সশস্ত্র হামলা চালায়। মুনীরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে কোপাতে তারা রাস্তার পাশে ফেলে রাখে। তপনকে ধরে রেখে বাকিরা পাথর দিয়ে তার শরীর থেঁতলে দেয়। আক্রমণ শেষে শিবির ক্যাডাররা টেম্পো ও মোটরসাইকেল নিয়ে চলে গেলে স্থানীয় এলাকাবাসী মুমূর্ষু অবস্থায় মুনির ও তপনকে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। একই সময়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা এমসি কলেজে প্রবেশে করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। অথচ কলেজ ক্যাম্পাসে সশস্ত্র অবস্থায় অবস্থানরত ছাত্রশিবির কর্মীদের পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে নিরাপদে রাখা হয়। একপর্যায়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কাছে মুনির, তপনের উপর ছাত্রশিবির শাহী ঈদগাহ এলাকায় হামলা করেছে এই খবর পৌঁছালে টিলাগড়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁদের চাপের মুখে পুলিশ প্রহরায় শিবির ক্যাডাররা এমসি কলেজ ত্যাগ করে।
এই বিষয়ে বলতে গিয়ে সিলেট মহানগর জাসদের সভাপতি অ্যাডভোকেট জাকির আহমদ বলেন, “দৃশ্যটা ছিল এ রকম, শিবির মিছিল করে যাচ্ছে, তাদের সামনে ও পেছনে পুলিশের গাড়ি। সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মিছিল তখন পাহারা দিচ্ছে আইনের লোকজন।”
শিবিরের এই মিছিল থেকেই পরবর্তী সময়ে নগরীর আম্বরখানায় স্কুলছাত্র এনামুল হক জুয়েলকে ধাওয়া করা হয়। জুয়েলের জন্য শিবির স্কুলগুলোতে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারছিল না বলে তার ওপর তাদের ক্ষোভ ছিল। অস্ত্রধারী শিবির ক্যাডারদের ধাওয়া খেয়ে স্কুলছাত্র জুয়েল তখন দৌড়ে একটা মার্কেটের ছাদে উঠে যায়। অস্ত্র নিয়ে তার পেছনে পেছনে ধাওয়া করতে থাকে শিবিরের সন্ত্রাসীরা। শিবিরের ধাওয়া খেয়ে নিরুপায় জুয়েল কোনো রাস্তা খুঁজে না পেয়ে মার্কেটের এক ছাদ থেকে পার্শ্ববর্তী ছাদে লাফ দিতে গিয়ে নিচে পড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এদিন ইসলামী ছাত্রশিবির পুলিশের সহায়তা নিয়ে নগরীর নানা স্থানে স্বাধীনতার পক্ষের ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। স্কুলছাত্র এনামুল হক জুয়েলের মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে নগরী উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ ছাত্র, জনতা সিলেট নগরী জুড়ে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে মুনির ই কিবরিয়া ও তপন জ্যোতি দেব মারা গেলে বৃহত্তর সিলেট জুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। নিহতদের স্বজন, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে সিলেটের বাতাস। মুনির, তপন ও জুয়েলকে হত্যা করার মাধ্যমে জামায়াত-শিবির সিলেটে তাদের বর্বরোচিত ও পৈশাচিক রাজনীতির সূচনা করে। এই তিন হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমেই সিলেট শহরে ছাত্র হত্যার রাজনীতি শুরু হয়।
স্বৈরাচার আর শিবির : দুজনে দুজনার
মুনির, তপন ও জুয়েলের মৃত্যুর খবর সিলেটে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিলেট হয়ে ওঠে মিছিল আর আন্দোলনের নগরী। এ ধরনের ঘটনার জন্য সিলেটের মানুষ কোনোদিন প্রস্তুত ছিল না। একই দিনে জামায়াত-শিবিরের হাতে তিন মেধাবী ছাত্র খুন হওয়ার পর সাধারণ মানুষ নির্বাক হয়ে পড়ে। সিলেট জুড়ে তখন শুরু হয় জামায়াত-শিবির হঠাও আন্দোলন। শিবির বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও সর্বস্তরের ছাত্রদের পাশে রাজপথে নেমে আসে সিলেটের সাধারণ মানুষ। মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সিলেটের বাতাস। মুনির, তপন ও জুয়েলের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে শুরু হয় গণআন্দোলন, সঙ্গে চলতে থাকে জামায়াত-শিবির প্রতিরোধ আন্দোলন।
জনরোষ থেকে বাঁচতে মুনির, তপন, জুয়েলের খুনি ও শিবিরের নেতাকর্মীরা গা-ঢাকা দেয়। সিলেটের কোর্ট পয়েন্টে ২৫ সেপ্টেম্বর আয়োজিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, ৮ দল ও ৫ দলের জনসভা থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর সিলেটে অর্ধদিবস হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। হরতালের দিন খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে সিলেটের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। হরতাল শেষে কোর্ট পয়েন্টে আয়োজিত সমাবেশে জাতীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন এবং মুনির, তপন ও জুয়েলের খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এ সময় স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের প্রশাসন জামায়াত-শিবিরের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয়। খুনিদের গ্রেফতার না করে তারা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাকর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার করতে শুরু করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন দমিয়ে রাখার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেটে ১৪৪ ধারা জারি করে। সিলেট জুড়ে তখন এক ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।
মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত যারা
মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যায় জড়িত ছিল তৎকালীন ছাত্রশিবিরের অনেক নেতাকর্মী। জাসদ নেতা সদর উদ্দিন আহমদ বাদী হয়ে তখন মুনির, তপন, জুয়েল হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা জিয়াউদ্দিন নাদের, সায়েফ আহমদ, সোহেল আহমদ চৌধুরী, জিয়াউল ইসলাম, আবদুল করিম জলিল এবং অজ্ঞাত বেশ কয়েকজনের নামে মামলা করেন।
সিলেট জেলা জাসদের সভাপতি লোকমান আহমেদ অভিযুক্তদের ব্যাপারে বলেন, “জিয়াউদ্দিন নাদেরের বাড়ি সিলেটে নয়। তার বাবা সিলেটের খাদিমনগরে কোনো একটা সরকারি অফিসের তৃতীয় অথবা চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ছিল। শিবির যখন সিলেটে রাজনীতি শুরু করল, তখন জামায়াত নেতাদের ছেলেরা আর মাদ্রাসার কিছু বিভ্রান্ত ছাত্র ছাড়া কেউই শিবিরের রাজনীতিতে যোগ দেয়নি। তখন সিলেটের বাইরে থেকে শিবির ক্যাডারদের সিলেটে নিয়ে আসা শুরু হয়। এই সুযোগে শিবিরে ঢুকে পড়ে জিয়াউদ্দিন নাদেরসহ সিলেটের বাইরে থেকে আসা বেশ কিছু ছেলে। এই জিয়াউদ্দিন নাদের ছিল মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী। জিয়াউদ্দিন নাদেরের হাত ধরেই সিলেটে শুরু হয় হত্যা আর রগ কাটার রাজনীতি।”
নীল নকশায় বেঁচে যায় খুনিরা, বিচারের দাবি আবারও কাঁদে নিভৃতে
পরবর্তী সময়ে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে মনে হয়, সিলেটে তিন হত্যার মাধ্যমে শিবিরের ক্যাম্পাস দখলের ঘটনাটি ছিল তাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই হত্যা মামলাটিকে দুর্বল করে দিতে জামায়াত বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে বলে অভিযোগ করেছেন লোকমান আহমদ। মামলা পরিচালনায় সরকারি আইনজীবীদের বাইরে কোনো আইনজীবীর সহায়তা পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ করেন লোকমান আহমদ।
মুনির ও তপন হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শীরা কেউই মামলা চলাকালীন আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে এসে সাক্ষী দেননি। এই মামলার সাক্ষীদের আদালতে গিয়ে সাক্ষী না দেওয়া প্রসঙ্গে সিলেট জেলা জাসদের সভাপতি লোকমান আহমদ বলেন, “হত্যাকাণ্ডের পর জামায়াত নেতারা নানাভাবে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। স্বৈরাচারী সরকারে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়াও তারা বিভিন্ন পর্যায়ে বিপুল অর্থ খরচ করে। আদালতে গিয়ে দেখা যায়, সাক্ষীদের অনেককেই জামায়াত শিবির অর্থ দিয়ে কিনে ফেলেছে, আবার অনেককে ভয় দেখিয়েছে। কেউ কেউ আগ্রহ নিয়ে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেওয়ার পরে তাদের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবে মামলায় নাম দেওয়া হয়। তখন তারা জোর গলায় হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন এবং জামায়াত শিবিরের এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সাক্ষী করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, তারা জামায়াত নেতাদের আত্মীয়। তারা আর আদালতে হাজিরা দেননি। এই কারণেই মূলত আমরা এই মামলাতে হেরে যাই, তা না হলে যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের অবশ্যই শাস্তি হতো।”
মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবে ছিলেন অ্যাডভোকেট শামীম সিদ্দিকী। তিনি বিএনপির রাজনীতিতেও বর্তমানে সক্রিয়। তিনি মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী, তার সামনেই শিবিরের সন্ত্রাসীরা মুনির ও তপনের ওপর হামলা চালায়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বক্তব্য দিলেও পরবর্তী সময়ে নানা অজুহাতে তিনি আদালতে গিয়ে সাক্ষী দেননি। অনুসন্ধানে জানা যায়, জামায়াত নেতা হাফিজ আবদুল হাই হারুণ তার আত্মীয় হওয়ার কারণে তিনি এই মামলার সাক্ষী না দিয়ে সুকৌশলে সরে পড়েন। পরবর্তী সময়ে এই বিষয়ে দৈনিক আজকের সিলেটে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর শামীম সিদ্দিকী প্রেস কাউন্সিলে আজকের সিলেট পত্রিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। কিন্তু সেই মামলায় তিনি হেরে যান এবং প্রেস কাউন্সিল শামীম সিদ্দিকীকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন টানা বিশ দিন প্রকাশ করার জন্য আজকের সিলেট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করে।
এই হত্যা মামলার আরেক সাক্ষী কামকামুর রাজ্জাক রুনু মামলা চলাকালীন সময়ে আদালতে উপস্থিত হননি।
মামলায় সাক্ষী না দেওয়া প্রসঙ্গে কামকামুর রাজ্জাক রুনু বলেন, “মামলা চলাকালীন সিলেটে নানা কাজ থাকার কারণে আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম। তাই সাক্ষী দিতে যেতে পারনি। আমি আসলে প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলাম না, জাসদ নেতা সদর উদ্দিন আমাকে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিলেন। যেদিন সাক্ষী দিতে গিয়েছিলাম সেদিন আদালতে গিয়ে দেখি মামলার রায় হয়ে গেছে।”
মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যা মামলার আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছিলেন বিষ্ণু-পদ চক্রবর্তী। আদালতে মামলা চলাকালীন সময়ে তিনি সিলেট ছেড়ে চলে যান এবং মামলা শেষ হওয়ার আগে আর সিলেটে আসেননি।
মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যা মামলার সাক্ষীদের সাক্ষী না দেওয়া প্রসঙ্গে সিলেটে ছাত্র রাজনীতির একসময়কার তুখোড় ছাত্রনেতা ও বর্তমানে সিলেট মহানগর জাসদের সভাপতি অ্যাডভোকেট জাকির আহমদ বলেন, “এই মামলার সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাবে না এই খবরটা আমার কানে চলে এসেছিল। অনেকেই বলাবলি করছিলেন যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে জামায়াত এই সাক্ষীদের কিনে নিয়েছে। তাই মামলার যেদিন রায় প্রদান করা হয়, সেদিন আমি আর আদালতে যাইনি।”
মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ছিল সিলেটের মানুষ। কিন্তু মামলার সাক্ষীদের আদালতে এসে সাক্ষী না দেওয়ার কারণে অভিযুক্তরা বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। বাদীপক্ষে মামলা পরিচালনা করেছিলেন অ্যাডভোকেট মাহমুদ হোসেন। তিনি বর্তমানে বেঁচে নেই।
তাঁর সহকারী হিসেবে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী এমাদউল্লাহ শহিদুল ইসলাম বলেন, “মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ড সিলেটের আলোচিত একটি মামলা হলেও তখনকার সময়ে একজন আইনজীবীকেও এই মামলার পক্ষে কোর্টে উঠতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরা আদালতে এসে সাক্ষী না দেওয়ার কারণেই মূলত আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।”
মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ডে আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তৎকালীন এমসি কলেজের ছাত্র আমিনুল হক চৌধুরী। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী না হওয়ার কারণে তার সাক্ষ্য এই মামলার রায়ে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।
২৮ বছর আগে মুনির, তপন ও জুয়েলের লাশ ডিঙিয়ে সিলেটের মাটিতে প্রকাশ্য রাজনীতির যাত্রা শুরু করে জামায়াত-শিবির চক্র। সময়ের স্রোতে এবং বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধার সুবিধা নিয়ে এই চক্র এখন সিলেটে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশই এখন নিয়ন্ত্রিত হয় জামায়াত নেতাদের তত্ত্বাবধানে। নগরীর বড় বড় শপিং মল, আবাসন প্রকল্প, অনেকগুলো হাসপাতাল, ক্লিনিক, মেডিক্যাল কলেজ, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কমিউনিটি সেন্টার এখন জামায়াত-শিবিরের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দিবস
প্রতিবছর ২৪ সেপ্টেম্বরে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের শপথে শহীদ মুনির-তপন-জুয়েলকে স্মরণ করে আসছেন সিলেটের প্রগতিশীল আন্দোলনের কর্মীরা। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সাংস্কৃতিক মোর্চা, সিলেট দিনটিকে পালন করে আসছে ‘মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দিবস’ হিসেবে। উেদ্যােক্তারা জানিয়েছেন, প্রতিবারের ধারাবাহিকতায় এবারও দিবসটি পালন হবে সিলেটে। ঐদিন সন্ধ্যায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বের হবে আলোর মিছিল। দাবি করা হবে জামায়াত-শিবিরের মৌলবাদের রাজনীতি নিষিদ্ধের।
আপনার মন্তব্য