দোদুল খান

০৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০১:১১

‘আমার মেয়েটারে ফেরত দেন, আমি আর কিচ্ছু চাই না’

সিলেট শহর থেকে সাড়ে ১৩ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার মোগলগাঁও ইউনিয়নের হাউসা গ্রাম। মূল সড়ক থেকে থেকে ডানদিকের কাঁচা রাস্তায় নেমে কিছুদুর এগোলেই ডানদিকেই দেয়াল ঘেরা একটি বাড়ি। মাত্র কিছুদিন আগেও যে বাড়ি গমগম করতো সকলের দৈনন্দিন আনন্দ-হাসি-হুল্লোড়ে, সে বাড়িতে আজ শুধুই কান্নার রোল। কারণ বাড়ির বড় মেয়েটি তিন দিন ধরে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।

খাদিজা বেগম নার্গিস। পরিবারের বড়দের কারো কাছে খাদিজা, কারো কাছে নার্গিস আর ছোটদের সবার বড়আপা। যৌথ পরিবারের সবার প্রিয় এ মানুষটির জীবনে যে ধ্বস নেমেছে, তা স্বভাবতই সংক্রমিত করেছে পরিবারের সবাইকে।

গত সোমবার (৩ অক্টোবর) বিকেলে মুরারি চাঁদ(এমসি)  কলেজে বিএ দ্বিতীয় বর্ষ সমাপনীর একটি পরীক্ষা শেষে বদরুল আলম নামের এক বর্বরের চাপাতির উপর্যুপরি কোপে গুরুতর আহত হয়ে খাদিজা বেগম এখন ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে।

মঙ্গলবার বিকেলে নিউরোসার্জারির অপারেশন শেষে ডাক্তাররা জানিয়েছেন, খাদিজার বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ৫ ভাগ আর তাও নিশ্চিত হওয়া যাবে ৭২ ঘন্টা কেটে গেলে।

বুধবার খাদিজার গ্রামের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, আত্মীয় স্বজনেরা ছাড়াও গ্রামের স্থানীয়রা ভিড় করে আছেন বাড়ির উঠানে, ঘরে, বারান্দায়। ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে শোনা যায় খাদিজার মা মনোয়ারা বেগমের আর্তনাদ, হাহাকার ও কান্না। খাদিজার ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা নানী কমরুন্নেছা ও ফুফাতো বোন শিলা বেগমের গলা জড়িয়ে ধরে ক্ষণে ক্ষণেই কেঁদে উঠছেন মনোয়ারা বেগম।

ঘটনার খবর জানার পর থেকেই খাবার স্পর্শ করছেন না তিনি, আর কিছুক্ষণ পরপরই কেঁদে উঠে বলছেন, “আমার মেয়েটি পরীক্ষায় যাবার আগে বলেছিলো ডিম খাবে, আমি দেইনি, তাই সামান্য কিছু মুখে দিয়েই সে পরীক্ষার হলে চলে যায়। বলে যায়, ফিরে এসে খাবে। আমার মেয়েটা তো আর ফিরছে না”।

খাদিজাকে কোপানো বদরুল আলম প্রায় ৬ বছর আগে লজিং মাস্টার হিসেবে এ বাড়িতেই থাকতো আর এ বাড়ির তিন চারটি বাচ্চাকে পড়াতো। বদরুলকে নিজের ছেলের মতো দেখলেও আজ বদরুলের হাতে নিজের মেয়ের এ অবস্থা হয়েছে বলে কাঁদতে কাঁদতে মনোয়ারা বলেন, “আপনারা তো ভিডিও দেখেছেন, সে কিভাবে আমার মেয়েটারে মাটিতে ফেলে কুপিয়েছে। আপনারা আমার মেয়েটারে সুস্থ করে আমার কাছে ফেরত দেন, আমি আর কিচ্ছু চাই না”।

খাদিজার বাবা মাসুক মিয়া ২০ বছর ধরে সৌদি আরবে আর তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই শাহীন আহমেদ ডাক্তারি পড়ছেন চীনে। খাদিজার ছোট ভাইদের মধ্যে সালেহ আহমেদ সিলেট সেন্ট্রাল কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র এবং সবার ছোট জুবায়ের আহমদ হাউসা মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ছে।

হাউসা গ্রামের খাদিজাদের বাড়ি যৌথ পরিবার। খাদিজার বাবা মাসুক মিয়া সবার বড় আর বাকি চার ভাইয়ের পরিবারও থাকেন একই সাথে। খাদিজাসহ ১১ জন চাচাতো ভাইবোনের এ বাড়িতে খাদিজার বড় ভাই শাহীন ছাড়া সবাই তার ছোট আর এ কারণে সকলের পড়াশোনা ও দেখাশোনার অলিখিত দায়িত্বও যেন সংসারের বড় মেয়ে হিসেবে নিজের কাধে তুলে নিয়েছিলো সে।

সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে বিএ দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী খাদিজা বেগম নার্গিসের জীবনের লক্ষ্যও ছিলো অনেক বড়। হয় ব্যাংকার, নয়তো আইনজীবি হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রতিদিন সাড়ে ১৩ কিলোমিটার দূরে কলেজে ক্লাস করতে যেতেন তিনি।

৬ বছর আগে এ বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসেবে থাকতে এসেছিলো বদরুল, তবে মাস তিনেক পরেই তার ব্যবহারে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে বের করে দেন খাদিজার চাচারা। লজিংয়ে থাকা অবস্থাতেই সে খাদিজাকে উত্তক্ত করতো বলে জানিয়েছেন তার পরিবারের স্বজনেরা। এজন্য বদরুলের গ্রামের বাড়িতে নালিশও করা হয়েছিলো সে সময়, যদিও কোন প্রতিকার তারা পাননি বলে জানান।

লজিং থেকে চলে গেলেও বদরুল খাদিজাকে সবসময়ই উত্ত্যক্ত করতো বলে জানিয়েছেন খাদিজার ভাইয়েরা আর সবশেষে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতেই খাদিজার উপর হামলা চালায় বদরুল বলে জানিয়েছেন তারা।

তবে বুধবার সিলেট অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক উম্মে শরাবন তহুরার সামনে ১৬৪ ধারা জবানবন্দিতে বদরুল জানায়, তার সাথে খাদিজার প্রেমের সম্পর্ক ছিলো এবং ৮-১০মাস আগে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সে খাদিজার উপর ক্ষিপ্ত হয়। সবশেষে সোমবার খাদিজা শেষবারের মতো সম্পর্ক রাখতে রাজি না হওয়ায় চাপাতি দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে কোপায় বদরুল।

গত সোমবার বিকেল ৫টার দিকে মুরারি চাঁদ কলেজের পুকুর পাড়ে মাথায় ও শরীরে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে খাদিজা বেগমকে গুরুতর জখম করে বদরুল আলম। পরে শিক্ষার্থীরা বদরুলকে আটক করে গণধোলাই দেন এবং পুলিশে সোপর্দ করেন। এছাড়াও খাদিজা বেগমকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন তবে রাতে অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুরে শাহপরাণ থানায় বদরুলকে আসামী করে একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন খাদিজার চাচা আব্দুল কুদ্দুস।

বদরুল আলম সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত মনিরগাতি গ্রামের মৃত সৈয়দুর রহমানের ছেলে। চার ভাই এক বোনের মধ্যে বদরুল দ্বিতীয়। মনিরগাতি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও গোবিন্দগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন তবে প্রথম থেকেই সে অনিয়মিত শিক্ষার্থী ছিল বলে জানায় তার সহপাঠীরা।

অনিয়মিত শিক্ষার্থী থাকা অবস্থানেই সে ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জের আলহাজ্ব আয়াজুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ে খ-কালীন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে। শাবিপ্রবির অনিয়মিত শিক্ষার্থী বদরুল কর্মক্ষেত্রে যোগদানরত থাকা অবস্থায়ই ২০১৬ সালের মে মাসে শাবি শাখা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সিনিয়র সহ সম্পাদক পদ লাভ করেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত