১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ১৭:১০
আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে/ পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি/দুই ধার উঁচু তার ঢালু তার পাড়ি। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার প্রেক্ষাপটে সেই নদী ছিল সকলের প্রাণ। তেমনি বাসিয়া নদী বিশ্বনাথের প্রাণ বলেই পরিচিত।
কিন্তু অবাধে দখল ও দূষণে সেই বাসিয়া এখন নিজেই ধুঁকছে। আগের মত খরস্রোতা ধারায় ফিরে নিজে বাঁচতে চায়, বাঁচাতে চায় বিশ্বনাথের প্রবাসী অধ্যুষিত জনপদকে।
১৯৮৫ সালের পর থেকে প্রাকৃতিক বৈরিতা, দখল আর দূষণের কারণে ধীরে ধীরে এ নদীপথ বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় নদী সংযুক্ত সকল খাল-বিল। খাল-বিল ও নালা শুকিয়ে যাওয়ায় বর্তমানে বিশ্বনাথ উপজেলা সদরের ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে টিউবওয়েল কিংবা ডিপ-টিউবওয়েলেও পানি উত্তোলন দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আগামী ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে বিশ্বনাথের উত্তর-দক্ষিণাঞ্চল, ওসমানীনগরের পশ্চিমাঞ্চল ও জগন্নাথপুরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি শুকানোর পাশাপাশি এতদঅঞ্চল মরুভূমিতে রুপান্তরিত হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে।
অথচ ১৯৭০-৭৫ সালের দিকে এ অঞ্চলে যেমন মাছের আকাল ছিলোনা তেমনি এ নদীর পানি দিয়ে বিশ্বনাথ, ওসমানীনগর ও জগন্নাথপুরবাসী কয়েক হাজার একর জমিতে ফসল ফলাতেন। প্রবাসী অধ্যুষিত এ উপজেলার বুক দিয়ে বয়ে যাওয়া এক সময়ের রূপ-যৌবনা বাসিয়া নদীতে এখন বর্ষা মৌসুমেও হাঁটু-জলই থাকে।
সুরমা নদীর কাটাগাঙের মাসুকগঞ্জ থেকে এ নদীটি উৎপত্তি হয়ে বিশ্বনাথের দেওকলস, ওসমানীনগরের সৈদ-মান্ধারুকা হয়ে জগন্নাথপুরের স্বাধীন বাজারের কুশিয়ারা নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এর আগে বিশ্বনাথের ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ বাসিয়া নদীর বিচরণ রয়েছে। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারিভাবে জরুরী ভিত্তিতে বাসিয়া নদীসহ সংযুক্ত খালগুলি পুনঃখনন করা প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৫৬ সালের তথ্যানুযায়ী বাসিয়া নদীর প্রস্থ ছিল ১৮০ থেকে ২০০ ফুট। কিন্তু ভরাট, দখল আর দূষণের ফলে এ নদীটির প্রস্থ এখন দাঁড়িয়েছে ১১৫ ফুটে। ১৯১৫ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত রুপ যৌবনে ভরপুর এ নদীর দু’ধারে কাশবন, পাল তুলা নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার, ইঞ্জিন নৌকাসহ বিভিন্ন ধরনের বড় বড় নৌকা চলাচল করতো।
এদিকে বাসিয়া নদী রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করা হলেও তা বেগবান না হওয়ায় দখল উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। তবে আন্দোলনের ফলে গেল ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড’র অর্থায়নে ১৮ কিলোমিটার বাসিয়া নদী পুনঃখনন কাজ শুরু হওয়ার পর দুর্নীতির কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের ফেলা ময়লা-আবর্জনায় নদীর পানি যেমন দুষিত হচ্ছে তেমনি দখলদারদের কারণে নব্যতা হারিয়ে বাসিয়া নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি বাসিয়া নদী রক্ষায় ‘বাঁচাও বাসিয়া নদী ঐক্য পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন আবারও আন্দোলন শুরু করেছে। তারা বাসিয়া নদী রক্ষা এবং খননের জন্যে মানববন্ধন কর্মসূচির পাশাপাশি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিকট স্মারকলিপিও দিয়েছেন।
নদীর অতীত ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাইলে সাংবাদিক ও কলামিস্ট এএইচএম ফিরোজ আলী ও সুশাসনের জন্যে নাগরিক সুজন’র সাধারণ সম্পাদক মধু মিয়া সিলেটটুডে টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রেলপথ ব্যতীত অন্য কোন মাধ্যম না থাকায় তিন উপজেলাবাসীর যোগাযোগ থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম ছিল এই নদী। জগন্নাথপুর ও বিশ্বনাথের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ নৌকা দিয়ে বিশ্বনাথে এসে পৌঁছাতেন। আর বিশ্বনাথ থেকে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত লঞ্চ, স্টিমারগুলো ক্রমান্বয়ে সিলেট চাঁদনীঘাটে নিয়ে যাত্রী নামাত। আবার দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সিলেট থেকে নদী পথে বিশ্বনাথ, ওসমানীনগর ও জগন্নাথপুরের জনসাধারণ তাদের গন্তব্যে পৌঁছতেন। এছাড়া ঢাকা-ভৈরব থেকে বড় বড় নৌকায় আম, কাঁঠাল, মাটির বাসন-কোসন বিশ্বনাথে এনে বিক্রি করা হতো বলেও তারা জানিয়েছেন।
‘বাঁচাও বাসিয়া নদী ঐক্য পরিষদ’র আহবায়ক ফজল খান সিলেটটুডে টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অবৈধ দখল উচ্ছেদসহ বিশ্বনাথের নদ-নদী ও খালগুলো পুনঃখনন করার জন্যে আমরা আন্দোলন করে যাচ্ছি। এছাড়া নদী রক্ষায় সংগঠনের পক্ষ থেকে মানববন্ধনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট স্মারকলিপি দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে কথা হলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম সিলেটটুডে টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুধুমাত্র বিশ্বনাথ নয় বৃহত্তর সিলেটের অধিকাংশ এলাকায় ভূগর্ভের পানি শুকিয়ে যাবে এবং তীব্র পানি সংকট দেখা দেয়ার আশংকা করা হচ্ছে। শুধু বাসিয়া নদী নয় সিলেটের অধিকাংশ নদীর তীর এখন অবৈধ দখলে রয়েছে। সিলেটের পরিবেশ ও প্রাণীকুল রক্ষায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে নদী ও নদী সংযুক্ত খাল ও নালা পুনঃখনন করা এখন জরুরী।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাওবো) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম সিলেটটুডে টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাসিয়া নদী খননে ইতিমধ্যে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী শুষ্ক মৌসুমে নদীর পুনঃখনন কাজ শুরু করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আপনার মন্তব্য