নিজস্ব প্রতিবেদক

২৫ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:২৩

এই রাগীব আলী, সেই রাগীব আলী

জীবিত অবস্থায়ই এতো স্তুতি, এতো গুণকীর্তন আর কোনো বাঙালিকে নিয়ে হয়েছে কী না এনিয়ে রীতিমত গবেষণা হতে পারে! অনুসারীদের সার্বক্ষণিক গুণকীর্তনের মধ্যে থাকা তারকা রাজনীতিবিদদেরও হার মানতে হতো রাগীব আলীর কাছে।

তাকে নিয়ে কত বই, পত্রিকায় কত কলাম, ডকুমেন্টারি, গান, কবিতা। রাগীব আলীকে নিয়ে লিখেননি এমন লেখক-বুদ্ধিজীবী খুব কমই খোঁজে পাওয়া যাবে। আর বিশেষণের বাহার তো রয়েছেই। যুগশ্রেষ্ঠ দানবীর, সমাজসেবার কিংবদন্তি আরো কত কী! তাঁর মালিকানাধীন পত্রিকায় রাগীব আলীর বিশেষণ লিখতে লিখতেই তো প্রথম পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যেতো। যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত রাগীব আলীকে প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকও দাবি করতেন তাঁর অনুসারীরা। দাবি জানানো হয়েছিলো রাষ্ট্রীয় পদকেরও।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কারণেও আলোচনায় ছিলেন রাগীব আলী। সিলেট বিভাগে রাগীব আলী ও তাঁর স্ত্রীর নামে রয়েছে অর্ধশতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

রাগীব আলীর একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়। রাজসিংহাসনের মতো একটি চেয়ারে বসে আছেন রাগীব আলী। আর চেয়ারসমেত রাগীব আলীকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন যুবক। যেনো পেয়াদাদের কাঁধে চড়ে যাচ্ছেন প্রাচীনকালের কোনো সম্রাট!

নিজের অঢেল সম্পদ, প্রভাব, সকল দলের স্থানীয় নেতাদের অনুকূলে রাখা ও মিডিয়ায় বিনিয়োগের মাধ্যমে অনেকটাই সিলেট অঞ্চলের মুকুটহীন সম্রাট হয়ে ওঠেছিলেন রাগীব আলী।

তবে উত্থানপর্ব থেকেই রাগীব আলীর বিরুদ্ধে রয়েছে প্রতারণা ও অন্যের সম্পত্তি দখলের অভিযোগ। এতোদিন রাগীব আলীর প্রভাবের কারণে যা ধোপে টেকেনি। ভয়ে মুখ খুলেন নি কেউ কেউ। অনেকে আবার স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে চলেছেন।

সেই পরাক্রমশালী রাগীব আলীর বিমর্ষ, বিধ্বস্ত রূপ দেখলেন সবাই। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আদালতে হাজির করা রাগীব আলী যেনো দুদণ্ড প্রতাপশালী কোনো ধনকুবের নয়, যেনো অসহায়, ক্লান্ত বৃদ্ধ এক!

ভারতে পালিয়ে গিয়েও গ্রেপ্তার এড়াতে পারলেন না রাগীব আলী। বহুল আলোচিত তারাপুর চা বাগান দখলের দুটি মামলায় জেলেই যেতে হলো তাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার কামাল বাজার এলাকার তালেবপুর গ্রামের বাসিন্দা রাগীব আলী তরুণ বয়সেই যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সেখানেই অবস্থান করেন তিনি। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালেই প্রচুর সম্পদের অধিকারী হন রাগীব আলী।

ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের নিয়ে প্রকাশিত বার্ষিক সাময়িকী ‘হু’জ হু’র তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৬ সালে ১৮ বছর বয়সে লন্ডনে যান রাগীব আলী। সেখানে শেয়ার বাজার, বীমা, আবাসন ও রেস্তোরাঁ ব্যবসা করে তিনি বিত্তশালী হন।

রাগীব আলীর ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, আশির দশকের গোঁড়ার দিকে দেশে ফিরে আসেন তিনি। শিল্পে বিনিয়োগে উদ্যোগী হন। এসময় সিলেটের মালনীছড়াসহ একাধিক চা বাগান ইজারা নেন রাগীব আলী।

তবে সিলেটে রাগীব আলী প্রথম আলোচনায় আসেন ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে। সিলেট সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রাবাস ‘ক্রয় করে’ তোপের মুখে পড়েন রাগীব আলী। সিলেট নগরীর প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র বন্দরবাজারে এক হিন্দু জমিদারের দান করা জমিতে এই ছাত্রাবাস নির্মাণ করেছিলো সরকারী পাইলট স্কুল। ’৮২-৮৩ সালের দিকে রাগীব আলী ‘জালিয়াতির মাধ্যমে’ এই ছাত্রাবাস কিনে নিয়েছেন এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সিলেটজুড়ে শুরু হয় ছাত্রাবাস রক্ষা আন্দোলন।

তবে শেষ রক্ষা হয়নি। ১৯৮৬ সালের দিকে রাগীব আলী এই ছাত্রাবাসের ভূমিতে গড়ে তোলেন ‘মধুবন’ নামে তাঁর নিজস্ব মালিকানার বিপণী বিতান। এই মার্কেটটি এখনো রয়েছে।

তৎকালীন ছাত্রাবাস রক্ষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা, জাসদ সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি এডভোকেট জাকির আহমদ বলেন, এই জমিটি সরকারী স্কুল থেকে দান করেছিলেন এক হিন্দু জমিদার। দানের জমি বিক্রি করা যায় না। তবু কোনো টেন্ডার ছাড়াই তৎকালীন সামরিক সরকারের সাথে আঁতাত করে জালিয়াতির মাধ্যমে রাগীব আলী এই জমিটি কিনে নেন।

তিনি বলেন, এসময় ছাত্রাবাস রক্ষায় রাগীব আলীর বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব আন্দোলন শুরু হয়। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতাদের প্রায় সকলেই এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। আন্দোলনের কারণে তিন বছর রাগীব আলী এই জমি দখল করতে পারেন নি।
পরবর্তীতে ’৮৬ সালের দিকে অন্য একটি মামলায় সামরিক সরকার আমাদের অনেককে জেলে ঢুকিয়ে দেয়। এছাড়া আন্দোলনকারীদের অনেকেও বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে রাগীব আলীর সাথে আঁতাত করে নেন। এই সুযোগে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ছাত্রাবাসের ভ’মি দখল করে নেন রাগীব আলী।

তারাপুর চা বাগান দখল : সিলেটে রাগীব আলী নাম আসলেই তারাপুর চা বাগান দখলের বিষয়টি উঠে আসে। দীর্ঘকাল ধরেই রাগীব আলীর তারাপুর চা বাগান দখলের কাহিনী লোকমুখে প্রচারিত হয়ে আসলেও তাঁর প্রতিপত্তি ও প্রমাণের অভাবে কেউ প্রকাশ্যে এ নিয়ে মুখ খোলেন নি। উল্টো আর্থিক প্রতিপত্তি, নিজ মালিকানার গণমাধ্যম ও নিজের বলয়ের বুদ্ধিভিত্তিক চর্চাকারীদের কল্যাণে ‘দানবীর’ হিসেবে পরিচিত হতে থাকেন রাগীব আলী।

তবে গত ১৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের এক রায়ে রাগীব আলীর প্রতারণার বিষয়টি ওঠে আসে।

দীর্ঘকাল ধরে চলা এই মামলার রায়ে বলা হয়, রাগীব আলীর প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে দেবোত্তর সম্পত্তি রাগীব রাবেয়া চা বাগান দখল করেছেন। এই বাগান দেবোত্তর সম্পত্তির সেবায়েতকে ফিরিয়ে দেওয়া ও বাগান ধ্বংস করে নির্মিত সকল স্থাপনা অপসারণেরও নির্দেশ দেন আদালত। বাগানের ক্ষতি করার জন্য রাগীব আলীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়েরও নির্দেশ দেন আদালত।

তবে আদালতের রায়ের ১৭ বছর আগেই প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি তারাপুর চা বাগান শিল্পপতি রাগীব আলীর কাছ থেকে উদ্ধারের জন্য সুপারিশ করেছিলো তৎকালীন সংসদীয় কমিটি। এছাড়া এই বাগানে গড়ে তোলা রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে ও ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালনার সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি।

২০০৯ সালে এই বিষয়ে গঠিত সংসদীয় সাব কমিটি এসব সুপারিশ করে। তবে ১৭ বছরেও আমলে নেওয়া হয়নি কমিটির সুপারিশ।

এই প্রতারণার মাধ্যমে ভূ-সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাগীব আলীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। তৎকালীন সিলেট সদর ভূমি কমিশনার এসএম আব্দুল হাই কোতোয়ালী থানায় এ মামলাটি দায়ের করেন। মামলা নং-১১৭/০৫। দীর্ঘদিন স্থগিত আদালতের নির্দেশে পুনরায় এই মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। গত ১০ আগস্ট এই মামলায় রাগীব আলী, তাঁর পুত্র, কন্যাসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।

এই পরোয়ানা জারির পরই গ্রেফতার এড়াতে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারত পাড়ি দেন রাগীব আলী।

তালেবপুর থেকে রাগীব নগর
রাগীব আলী যে গ্রামে জন্মেছেন তার নাম তালেবপুর। এই গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা ও হাসপাতাল নির্মাণ ও রাস্তাঘাট সংস্কারে অনুদান দেন রাগীব আলী। এছাড়া নিজের মালিকানাধীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস, রাগীব-রাবেয়া স্পোর্টস একাডেমীসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন রাগীব আলী। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ও কাগজপত্রে এলাকার নাম তালেবপুরের বদলে লেখা রয়েছে- রাগীবনগর। গত প্রায় এক দশক ধরে প্রাচীন একটি এলাকার নাম বদলে নিজের নামে নামকরণের চেষ্টা চালান রাগীব আলী। তার মালিকানাধীন সংবাদপত্রে তালেবপুরের নাম লেখা হয়- রাগীবনগর।

এর বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে ওই এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা আদালতে মামলা করেন। গত বছরের আগস্টে সিলেট সহকারী জজ আদালতের রায়ে এই নাম পরিবর্তনকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে পরবর্তীতে জজ আদালত রাগীবনগরের পক্ষে রায় দেন। বর্তমানে এই মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন আছে।

সাঈদীর সহচর থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক’
সিলেটের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এরশাদ সরকারের আমলে সিলেটে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছিলো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে। এসময় সাঈদীকে সিলেটে প্রতিরোধেরও ডাক দেয়া হয়। তখন সাঈদীর পাশে দাঁড়ান শিল্পপতি রাগীব আলী।

অবাঞ্ছিত সাঈদীকে বিমানে সিলেট নিয়ে আসা, নিজ এলাকা কামালবাজারে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা এবং নিজ মালিকানাধীন মালনীছড়ায় আতিথেয়তার ব্যবস্থা করেন রাগীব আলী। রাগীব আলীর পৃষ্ঠপোষকতায় সিলেটে আসেন যুদ্ধাপরাধী সাঈদী।

কেবল সাঈদীর পৃষ্ঠপোষকতা নয়, সিলেট অঞ্চলে জামায়াত-শিবিরসহ মৌলবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষক হিসেবেই পরিচিত এই ধনকুবের। তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু হলে হঠাৎ ‘প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক’ বনে যান রাগীব আলী। সেসময় তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতারাও সংবর্ধনা দেন রাগীব আলীকে।

এসময় নিজের মালিকানাধীন গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেকে ‘প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক’ হিসেবে পরিচিত করা শুরু করেন।

তবে ইন্টারনেটভিত্তিক মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়াতে রাগীব আলীর একাত্তরের ভূমিকা সম্পর্কে লেখা রয়েছে- ‘রাগীব আলী সম্পর্কে বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে থেকে দেশের বিরুদ্ধে কাজ করা, যুদ্ধাপরাধীদের সহায়তা করা ও হিন্দুদের দেবোত্তর সম্পত্তি দখল প্রভৃতি।’

অবশেষে গ্রেপ্তার
অবশেষে গ্রেপ্তার হতে হলো রাগীব আলীকে। বৃহস্পতিবার সকালে তাকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গ্রেপ্তার করে ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলার ইমিগ্রেশন পুলিশ। এরপর বিকেলে তাকে শেওলা শুল্ক স্টেশন দিয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। সন্ধ্যায় আদালতের মাধ্যমে তারাপুর চা বাগান দখল মামলায় সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয় রাগীব আলীকে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত