২৭ এপ্রিল, ২০১৫ ১২:৩৮
দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেটের মৌলভীবাজার। চায়ের রাজধানী খ্যাত এ জেলায় চা বাগান রয়েছে ৯০ টির উপরে। অথচ একসময় রপ্তানীমূখী পণ্য হিসেবে বেশ সুনাম ছিলো চায়ের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অভ্যন্তরে চায়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কমেছে রপ্তানি। তাছাড়া নানা কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। এই চা শিল্প এখনো দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাবনার হাতছানি দেয়। যার ফলে নানা সমস্যার মাঝেও চায়ের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় পৌছার সম্ভাবনা নিয়ে এবছর এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে চায়ের মৌসুম।
দেশের অন্যতম অর্থকরী ও সম্ভাবনাময় চা শিল্প আজ অতিক্রম করছে ক্রান্তিকাল। দেশের মোট ১৬৩টি ছোট বড় চা বাগান রয়েছে। সিলেট বিভাগে রয়েছে ১৩৪ টি চা বাগান। এরমধ্যে শুধু মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, জুড়ি উপজেলায় রয়েছে ৯২টি চা বাগান। এছাড়াও সিলেটের হবিগঞ্জে ২২টি, সিলেট সদরে ২০টি বাগান রয়েছে। আর বাকীগুলো রয়েছে চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রাজশাহী বিভাগে রয়েছে ৫টি চা বাগান। এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় ১০-১২ লাখ মানুষ।
এদিকে পরিকিল্পত চাষ ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ২০১৩ সালে দেশে রেকর্ড সংখ্যক চা উৎপাদিত হয়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে দেশে চা উৎপাদন হয় ৬৬ দশমিক ২৬ মিলিয়ন কেজি। গত বছর ২০১৪ চা বর্ষে চা উৎপাদন হয়েছে ৬৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন কেজি। আর এবছর ২০১৫ সালে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ মিলিয়ন কেজি। অনুকূল আবহাওয়া ও বাগান মালিকদের পরিকল্পিত চাষের কারণে গত বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি চা উৎপাদিত হয়েছে।
বিগত ২০১৩ সালে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ কোটি কেজি। কিন্তু অনুকূল আবহাওয়া ও বাগান মালিক-শ্রমিকদের আন্তরিকতায় উৎপাদন হয় ৬ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা। যা ছিল বাংলাদেশে চা উৎপাদনের রেকর্ড। ইতিপূর্বে দেশে সর্বোচ্চ চা উৎপাদন হয়েছিল ২০০৫ সালে। ওই বছর ৫ কোটি ৯৬ লাখ ১০ হাজার কেজি চা উৎপাদনের রেকর্ড হয়েছিল।
তবে এই সম্ভাবনার আড়ালে সংকটও কম নয়। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত সমস্যা সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে বার বার থমকে দিচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম শ্রমিক অসন্তোষ। নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে তাদের অব্যাহত আন্দোলন চলছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চা শিল্প। বেশ কয়েকদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি, বজ্র বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে বোরো থেকে শুরু করে উঠতি নানাজাতের ফসলের ক্ষতি হলেও ভিন্ন চিত্র বিরাজ করছে চা বাগানগুলোতে। চা মৌসুমের শুরুতে এপ্রিলের মাঝামাঝি এসে বেশ কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টিপাতের ফলে চা উৎপাদনে এবছর আশার সঞ্চার হয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ায় গত বছর দেশে চায়ের উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। মান ভালো না হওয়ায় নিলামে চায়ের দামও ছিল কম। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তীব্র থরার কারণে অনেকটা শঙ্কিত ছিলেন বাগান সংশ্লিষ্টরা। তবে গত কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে চা শিল্পে। চলতি মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় আগের মৌসুমের উৎপাদন ঘাটতি পুষিয়ে নেয়ার আশা করেছেন বাগান মালিকরা।
এদিকে কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতের ফলে বৃষ্টিতে সজীব হতে শুরু করেছে চায়ের মরাগাছ। গাছে গাছে গজাচ্ছে সবুজ কুঁড়ি। এ মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়েছে। বছর জুড়ে এ রকম বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ভালো উৎপাদন পাওয়া যাবে এমনটাই আশা চা শ্রমিক ও বাগান কর্তৃপক্ষের। তারা জানান, ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে টানা পাঁচ-ছয় মাস কোনো বৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘ খরায় লাল মাকড়সার আক্রমণসহ চা গাছে নানা রোগবালাই দেখা দেয়। সূর্যের তাপে লাল হয়ে ঝলসে যায় চায়ের কুঁড়ি। আর্দ্রতা বেশী থাকার কারণে সবুজ পাতাগুলো লালচে হয়ে গিয়েছিল।
এবছরের চা মৌসুমের শুরুতে বাগানগুলোতে গড়ে বৃষ্টিপাত হয়েছে আড়াই থেকে সাড়ে তিন ইঞ্চি। ফলে অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে উৎপাদন লক্ষ্য পূরণের আশা বাগান সংশ্লিষ্টদের।
অপর দিকে চলতি সপ্তাহে বাগান গুলোয় পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা চা উৎপাদনের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। তবে গাছে পরিপূর্ণ কুঁড়ি আসতে আরও দেড়-দুই মাস সময় লাগবে। যদি মে মাসে খরা কম দেখা দেয় আর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়, তবে বাগানের পরিস্থিতি আরও ভালো হবে। তবে চা উৎপাদন লক্ষ্য পূরণে ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুকূল আবহাওয়া প্রয়োজন।
ফলে বিরাজমান সমস্যার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হলে চা শিল্প আবারো দেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আপনার মন্তব্য