০১ মে, ২০১৫ ০০:১৩
মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন মৌলভীবাজার সহ দেশের ১৬৫টি চা বাগানের শ্রমিকরা। দীর্ঘদিন ধরে মজুরী বৃদ্ধিসহ নানা দাবী করে আসছেন চা শ্রমিকরা। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি আজও। এতে ন্যায্য অধিকার থেকে বিঞ্চিত হচ্ছেন চা শ্রমিকরা।
বাগান মালিক ও চা শ্রমিক ইউনিয়নের আন্তরিকতার অভাবে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ চা শ্রমিকদের। দীর্ঘ দিন ধরে নিরব শ্রম আইন পরিদর্শন অধিদপ্তর।
মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানে বংশ পরস্মপরায় কাজ করছেন চা শ্রমিকরা। তাদের শ্রমে এই শিল্পের উন্নয়ন হলেও শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না। দৈনিক একজন শ্রমিকের মজুরী ৬৯ টাকা। আর সেই সাথে সপ্তাহ শেষে এক টাকা পঁচিশ পয়সা দরে তিন কেজি আটা। মৌলিক চাহিদা পূরণে দীর্ঘদিন ধরে মজুরি বৃদ্ধি, ভূমি অধিকার, বাসস্থান ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবী তাদের। কিন্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন চা শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা।
এদিকে ২০০৮ সালের পর থেকে চা শ্রমিক ইউনিয়নের কমিটি নিয়ে বিরোধ থাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে কোন চুক্তি হয়নি চা বাগান মালিকদের সাথে। পরে শ্রম মন্ত্রণালয়ের মধ্যস্থতায় গত বছর আগষ্ঠ মাসে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন হয়। শ্রমিকরা আশা করেছিল নির্বাচিত সে কমিটি তাদের দাবী আদায় করবে। কিন্তু ৮ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও দাবীগুলো পূরণ না হওয়ায় চা শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
বিজয় বুনার্জী, সাবেক আহবায়ক, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন এ প্রসঙ্গে বলেন, বড় আশা নিয়ে চা শ্রমিকরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। নির্বাচনের পরে নতুন কমিটি তাদের মজুরী বৃদ্ধি করবে। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মজুরী সমস্যাসহ ভূমির অধিকার, শিক্ষিত সন্তানের চাকুরী, চাকুরী কৌটা প্রবর্তন, বেকারদের চাকুরী ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সেইগুলো আর হয় নাই। আমরা আশা করব যত দ্রুত সম্ভব করার জন্য। আমার আহ্বান থাকবে নতুন কমিটি দ্রুত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিক। সরকার যাতে এব্যাপারে পদক্ষেপ নেয় এই আহ্বান আমার সরকারের প্রতি রইল।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, আমরা নির্বাচিত হওয়ার পর চা বাগানে শ্রমিকদের যে সমস্যাগুলো আছে সেগুলো সমাধানের জন্য চেষ্টা করছি। স্থানীয়ভাবে সহ বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা কথা বলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফলতা এসেছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চা বাগান মালিকদের অসহযোগিতার কারণে এবং আইন না মানার যে প্রবণতা তার কারণে আমরা অনেক ক্ষেত্রে সফল হতে পারি নাই। আমরা মালিকপক্ষের কাছে ২০ দফা দাবি দিয়েছি। সেটা নিয়ে আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে তিনটি বৈঠক হয়েছে। মালিকপক্ষের ইচ্ছাকৃতভাবে আলোচনা দীর্ঘায়িত করছে। আমরা আগামী মে দিবসে আমাদের শ্রমিকদের সাথে যে অনুষ্টান হবে সেখানে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।
এই মুহুর্তে আমরা যে সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছি তার মধ্যে হচ্ছে আমাদের চা বাগান শ্রমিকদেরকে জমি দখলের প্রবণতা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন বাগানের মালিকপক্ষ জমি দখলে নিয়ে নিচ্ছে। আবার অনেক সময় দেখছি সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জমি দখর নিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে শ্রমিকদের বাড়তি আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
গোবিন্দপুর চা বাগানের মালিক মো: মহসীন মিয়া মধু বলেন, শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের জন্য চা শিল্পকে বাজারের সাথে সমান বজায় রেখে দাবী-দাওয়াগুলো যুক্তিযুক্তভাবে না করা হয় শ্রমিকদেরও কল্যাণ হবে না মালিকদেরও কল্যাণ হবে না। অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রি আর চা বাগান ব্যতিক্রম। চা বাগানে ব্যতিক্রম ৯০ পয়সা কেজিতে তাকে ৭ কেজি আটা দিতে হয়। সরকার বাগানে কোন ছাড় দেয় না। যে জায়গা আছে সে জায়গায় ঘর বানিয়ে দিতে হয় মালিকদেরকে। ঘরের মেরামত, থাকা, খাওয়া, ঔষধ, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বেকার ভাতা এবং বোনাস প্রত্যেক জিনিস দিচ্ছে। এগুলো হিসেব করলে ২৫০-৩০০ টাকা মজুরী আছে। সব কিছুরই সমাধান হতে হবে আলোচনা মাধ্যমে। চা বিক্রি হচ্ছে কত? তার প্রফিট হচ্ছে কত? সেই প্রফিটের অংশ কি মালিক খাচ্ছে? আজকে একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে ১০০ শত কোটি টাকার সে এক্সপোর্ট করে ৫০ কোটি টাকা তার ব্যবসা হয়। কিন্তু চা'তে একটি চা-বাগানের দাম ১০০শত কোটি টাকা। এই চা বাগান থেকে ব্যবস্যা হয় সর্বোচ্চ দু থেকে আড়াই কোটি টাকা। এই টাকা যদি সে ব্যাংকে রাখে কত টাকা ইন্টারেস্ট আসবে।
অতএব যাই করা হয় না কেন দেশের স্বার্থে চা বাগান এমন একটি শিল্প যে পরিবেশ সহায়ক এবং কর্মসংস্থান। এই দুটোকে বিবেচনা রেখে একটি আলাপ আলোচনা মাধ্যমে উভয় পক্ষের লাভজনক সমাধারন করা দরকার।
কল কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ মহা পরিদর্শক মো: আজিজুল ইসলাম বলেন- যে সমস্যাগুলোর কথা বলা হয়েছে এ সেগুলোর বাস্তবতা আছে তা আমরা বিভিন্ন পরিদর্শনে পাচ্ছি। আমাদের সবচেয়ে সমস্যা হলো লোকবলের সমস্যা। লোকবল পর্যাপ্ত থাকলে আমরা এগুলো গতিশীল করতে পারতাম। কিন্তু লোকবলের অভাবে এগুলো করা যাচ্ছে না। শুধু মাত্র পরিদর্শকই নয় অফিসের বিভিন্ন কাজগুলো করতে হয় এ জন্য প্রচুর লোকবলের দরকার। আমরা যেভাবে চাচ্ছি ঠিক সেইভাবে যেতে পারছি না। ডে-কেয়ার এর একটি সমস্যা রয়ে গেছে। যেখানে শিশু রাখার একটি ঘর এর ব্যবস্থা থাকে সেখানে আয়া বা অন্যান্য সাজ সরঞ্জাম আইন মোতাবেক দরকার সেগুলো সংকট রয়ে গেছে।
চা শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধিসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমনটাই প্রত্যাশা চা শ্রমিকদের।
আপনার মন্তব্য