মো. মুন্না মিয়া, জগন্নাথপুর

০১ এপ্রিল, ২০১৭ ২৩:৪১

জগন্নাথপুরে হাওরের বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে ফসল, কৃষকদের আহাজারি

সুনামগঞ্জের অন্যতম বৃহৎ হাওর জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওর। ঐ উপজেলার আরেকটি বড় হাওরের নাম মইয়া হাওর। গত বছর এই দুই হাওরসহ জগন্নাথপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওর তলিয়ে গিয়েছিল বন্যার পানিতে। তখনই কৃষকদের হাহাকার আর আর্তনাদে আকাশ-বাতাস জুড়ে বিষাদের ছায়া নেমে এসেছিল। তবে এ বছর সময়মত বৃষ্টি হওয়ায় কৃষকদের মনে একটু স্বস্তি লক্ষ্য করা যায়।

কিন্তু গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে জগন্নাথপুর উপজেলার প্রায় সবকটি হাওরের বোরো ধান এখন পানির নিচে। আবারও কৃষকের কান্নায় এই উপজেলার আকাশে-বাতাসে বইছে বিষাদের ছায়া।

পরিদর্শনে দেখা যায়, নলুয়ার হাওরের শ্যালিকা ও ডুমাখালি বেড়িবাঁধ ভেঙে হাওরে পানি প্রবেশ করেছে। এই হাওর অঞ্চলের কৃষকরা পড়েছেন বিপাকে। হাওর পাড়ের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শনিবার (১ এপ্রিল) ভোরে শ্যালিকা ও ডুমাখালি বেড়িবাঁধ এলাকা দিয়ে নলুয়ার হাওরে পানি ঢুকে গেছে। এতে হাওরের পাকা-আধা পাকা সব ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। গত ২/৩ দিন ধরে ফসল রক্ষার জন্য কৃষকরা প্রাণপণ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ফসল রক্ষা করতে পারেননি।

কৃষকরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করে বলেন, অন্যান্য বছরের মতোই এবার হাওর রক্ষায় বেড়িবাঁধ নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট বরাদ্দ না দেওয়ায় প্রতিবছরের মতোই কষ্টে অর্জিত সোনার ফসল নিজ চোখে তলিয়ে যেতে দেখতে হয়েছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মাটিও ফেলা হয়নি।

তাঁরা আরো জানান, বাঁধের জন্য বরাদ্দকৃত টাকার চার ভাগের এক ভাগ কাজ হয়নি। ফলে বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে আমাদের কষ্টে অর্জিত সোনার ফসল। যা-ও কাজ হয়েছে তা দিয়ে ফসল রক্ষা করা যায়নি।

কৃষকরা স্থানীয় ইউপি সদস্য সুরাজ মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, যে এলাকা দিয়ে বাঁধটি ভেঙে নলুয়ার হাওরে পানি ঢুকেছে, সেই এলাকার পিআইসি কমিটির সভাপতি ছিলেন আমাদের মেম্বার সুরাজ। তিনি এসব বাঁধ নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম করেছেন। তাছাড়া ওই এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নুর ট্রেডিং বাঁধ নির্মাণে দায়সারা কাজ করে চলে যায়। ফলে ওই বাঁধটি ভেঙে হাওরে পানি ঢুকেছে।

এদিকে, উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের নারিকেলতলাস্থ স্টিলের ব্রিজ (সেতু) এর কাছের বেড়িবাঁধের কাজ অন্যান্য বছর পিআইসি কমিটির মাধ্যমে করলেও এ বছর প্যাকেজের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি করেছে। ওই বাঁধে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার জায়গায় কোনো মাটি ফেলা হয়নি। ফলে স্থানীয় কুবাজপুর ও ইছগাঁও হাওরের সকল ফসল বিনষ্ট হয়ে যায়। তবে প্যাকেজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাটি কাটার এক্সসেভেটর মেশিন নষ্ট হওয়ার অজুহাতে দায় থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

পাউবোর মাঠ কর্মকর্তা মোসাদ্দেক হোসেন জানান, আমরা বাঁধ ভেঙ্গে পানি প্রবেশ করা স্থানকে শক্তিশালী করে মেরামত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

নলুয়ার হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আরশ মিয়া বলেন, হাওরে কৃষকদের কান্নায় আকাশটা আজ কালো মেঘে ভারী হয়ে উঠছে। গত বছরও হাওর রক্ষা করা যায়নি। যে স্পটে পানি প্রবেশ করেছে, সেই স্পটের বেড়িবাঁধ নির্মাণে ঠিকাদার ও একটি পিআইসির কাজের ত্রুটির কথাও তিনি স্বীকার করেন।

এ ব্যাপারে জগন্নাথপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ বলেন, আমি প্রত্যেকটি হাওর ঘুরে দেখেছি এবং কৃষকদের ক্ষতি নিজ চোখে দেখে এসেছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতায় এসব ক্ষতি হয়েছে। তাদেরকেই এসব ক্ষতিপূরণ বহন করতে হবে।

কৃষকদের দাবির প্রেক্ষিতে তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের আশ্বাস প্রদান করেন এবং দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরবেন বলে জানান।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত