শাকিলা ববি, হবিগঞ্জ

২৭ এপ্রিল, ২০১৭ ২২:১৬

হবিগঞ্জে ভেঙে গেছে ২ কোটি টাকার বাঁধ, ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন

হবিগঞ্জে ৯টি প্রকল্পের অধীনে হাওরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৩৯টি স্থানে ৮ কিলোমিটার এলাকা সংস্কার করা হয়েছিল। এতে ব্যয় হয় ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। কিন্তু কাজে আসেনি এই সংস্কার। সম্প্রতি অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চোখের সামনে ভেঙে গেছে বাঁধ। সেই সাথে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্নের সোনালী বোরো ফসল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম জানান, জেলার বিভিন্ন নদীসহ হাওর এলাকায় ৪০০ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এর মাঝে ২৫০ কিলোমিটার ডুবন্ত বাঁধ। এগুলো মার্চের ৩০ তারিখের পর পানিতে তলিয়ে যায়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, জেলার বানিয়াচং উপজেলায় মাকালকান্দি হাওর প্রকল্প, কুশিয়ারা বাম বাঁধ প্রকল্প, শুটকি নদী এফসিডি প্রকল্প, ঝিংড়ি নদী প্রকল্প, সদর, চুনারুঘাট, বাহুবল, বানিয়াচং ও লাখাই উপজেলায় খোয়াই নদী প্রকল্প ও গুঙ্গিয়াজুরী এফসিডি প্রকল্প, আজমিরীগঞ্জ ও বানিয়াচংয়ে বসিরা নদী বামতীর ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ ও কৈয়ারঢালা-রত্না এফসিডিআই প্রকল্প এবং মাধবপুরে হরিসীমা ও ধনিসীমা হাওর এফসিডি প্রকল্পের মোট ৩৯৯ কিলোমিটার ২৭০ মিটার বাঁধ রয়েছে। এর মাঝে ২৫০ কিলোমিটার হাওরে ডুবন্ত বাঁধ। এ প্রকল্পগুলোর আওতায় ৩৯টি অংশে মোট ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকার সংস্কার হয়, যা কৃষকদের কোন কাজে আসেনি।

তিনি জানান, গত ২০ বছরের পরিসংখ্যানে এ বছর অন্যান্য বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশী বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে পানি হাওরে ঢুকে ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। নদীগুলোর পানিও ২ এপ্রিল থেকে বিপদসীমার উপরে। কুশিয়ারা নদীর পানি এখনও বিপদসীমার অনেক উপরে রয়েছে। এতে দিনে দিনে নদীর বাঁধগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যে লাখাই উপজেলার বুল্লায় খোয়াই নদীর ২২০ মিটার বাঁধ ভেঙে গেছে।

বাঁধ সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারের মাধ্যমে ৮ কিলোমিটার ডুবন্ত বাঁধের সংস্কার হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান মণ্ডল জানান, জেলায় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। বুধবার (২৭ এপ্রিল) পর্যন্ত ৫৫ হাজার ৫৬৫ জনের তালিকা পাওয়া গেছে। তালিকা তৈরির কাজ শেষ হয়নি। সময় লাগছে। কারণ, একেকটি ইউনিয়নে মাত্র একজন করে লোক কাজ করছে। পুরো তালিকা তৈরিতে আরও বেশ কয়েকদিন সময় লাগবে।

বুল্লা ইউপি চেয়ারম্যান শেখ মুক্তার হোসেন বেনু জানান, তার ইউনিয়নের অধিকাংশ কৃষকই দাদন নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। ধান তুলে সে টাকা পরিশোধের কথা ছিল। প্রতি বছরই কৃষকরা দাদন নিয়ে চাষাবাদ করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ১ হাজার টাকার বিনিময়ে ২/৩ মন করে ধান দেয়ার কথা থাকে। ধান কাটার পর তারা তা পরিশোধ করেন। কিন্তু এ বছর অকাল বন্যায় সব তলিয়ে যাওয়ায় এখন তারা সে টাকা কিভাবে পরিশোধ করবে এ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তাদের এখন সরকারী সহায়তা দরকার।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে জেলার ৮টি উপজেলায় মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল। এপ্রিলের শুরুতেই ভারি বৃষ্টিপাতে জেলার হাওর এলাকার আবাদকৃত প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে যায়। বাকি জমি কিছুটা রক্ষা পেলেও গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তাও শেষ রক্ষা হয়নি। জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৫৩ হাজার ৫৬৫ জন কৃষকের তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যা ক্ষতিগ্রস্তদের অর্ধেকের বেশি হবে না। এ পর্যন্ত সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বানিয়াচংয়ে ২৫ হাজার ৭২০, লাখাইয়ে ৮ হাজার ১৭০, আজমিরীগঞ্জে ৮ হাজার ৫৯৫, নবীগঞ্জে ৫ হাজার ৫০০, সদরে ২ হাজার, বাহুবলে ১ হাজার ৮০০, মাধবপুরে ১ হাজার ৩০০ ও চুনারুঘাটে ৩৫০ জনের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত