সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

২৭ এপ্রিল, ২০১৭ ২২:২৬

সুনামগঞ্জে ফসল গেছে পৌনে তিন লাখ কৃষকের, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ধরমপাশা

অকাল বন্যায় সুনামগঞ্জে ফসল হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ লাখ ৭৭ হাজার ১৮৮ জন কৃষক। আর তলিয়ে গেছে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬১২ হেক্টর জমির ধান। বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসন থেকে এ তথ্য জানানো হয়।

সুনামগঞ্জে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানে আবাদ হয়েছিল।

বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যায় বাঁধ ভেঙে হাওরের বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতির এই আংশিক চিত্র প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। পানি কমলে ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি নিরূপণ করা হবে।

তবে স্থানীয় কৃষক-জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, সুনামগঞ্জে মোট আবাদ করা ধানের ৯০ শতাংশ তলিয়ে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহেদুল হক জানিয়েছেন, মোট আবাদ করা জমির মধ্যে ১৫৪টি হাওরে আবাদ হয়েছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬৮২ হেক্টর। হাওরে আবাদ করা জমির প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাকি ৫৬ হাজার ৪০০ হেক্টরের আবাদ হয়েছিল হাওরের বাইরে, তুলনামূলক উঁচু জমিতে।

জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ধরমপাশা উপজেলায়। এ উপজেলা মোট জমি আবাদ হয়েছিল ৩১ হাজার ৮০০ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ২৬ হাজার ২৫০ হেক্টর। এ উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হলেন ৪৪ হাজার ২২২ জন। দিরাই উপজেলায় আবাদ হয়েছিল ২৮ হাজার হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ১৮ হাজার হেক্টর। এ উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হলেন ৩৬ হাজার। জামালগঞ্জ উপজেলায় আবাদ হয়েছিল ২৫হাজার ১৯০ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ১৯ হাজার ১৬০ হেক্টর, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ২৬ হাজার ৬১০ জন। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার আবাদ হয়েছিল ১৬ হাজার ২০০ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ১২ হাজার ৬৩ হেক্টর। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২২ হাজার ৬৯০ জন কৃষক। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা আবাদ হয়েছিল ২২ হাজার ২৭৫ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ১৬ হাজার ৩৫০ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ২৩ হাজার ৩০০ জন। দোয়ারাবাজার উপজেলায় আবাদ হয়েছিল ১৩ হাজার ৬৮০ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ১০ হাজার ৬৩৫ হেক্টর। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২১ হাজার ২৭০ জন কৃষক।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় আবাদ হয়েছিল ১১ হাজার ৯০ হেক্টর, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬ হাজার ১৮০ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ১২ হাজার ৩৬০ জন। জগন্নাথপুর উপজেলায় আবাদ হয়েছিল ২০ হাজার ২০৭ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ১২ হাজার ৮১০ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ২৫ হাজার ৬২০ জন। তাহিরপুর উপজেলার আবাদ হয়েছিল ১৮ হাজার ৪০০ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ১৬ হাজার ৫৬০ হেক্টর। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৪ হাজার ৬৬৮ জন কৃষক। ছাতক উপজেলায় আবাদ হয়েছিল ১৪ হাজার ২৪০ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ১১ হাজার ১০০ হেক্টর। এ উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হলেন ২২ হাজার ২০০ জন। শাল্লা উপজেলায় আবাদ হয়েছিল ২২ হাজার হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ১৭ হাজার ৪১৪ হেক্টর। এ উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হলেন ১৮ হাজার ২৫০ জন।

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা: জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ এপ্রিল থেকে প্রতিদিন জেলায় খোলাবাজারে ৪২টি বিক্রয়কেন্দ্রে ৮ হাজার ৪০০ মানুষের মধ্যে ১৫ টাকা দরে পাঁচ কেজি করে চাল ও ১৭ টাকা দরে পাঁচ কেজি আটা বিক্রি হচ্ছে। তবে আজ থেকে এসব কেন্দ্রে মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। এর বাইরে আরও এক হাজার মেট্রিক টন চাল বিনা মূল্যে বিতরণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে নগদ অর্থসহায়তা হিসেবে প্রাপ্ত ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ অব্যাহত আছে। জেলার জামালগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার উপজেলায় ১০০ বান্ডিল ঢেউটিন বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলার ক্ষতিগ্রস্ত দেড় লাখ কৃষক পরিবারকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল ও নগদ ৫০০ টাকা করে দেওয়ার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। তিন মাস আট দিনের এ কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন চাল।

খোলাবাজারে বিক্রির চাল-আটা বেড়েছে, কেন্দ্র বাড়েনি :  ১০ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ৪২টি বিক্রয় কেন্দ্রে খোলাবাজারে কম দামে চাল ও আটা বিক্রি শুরুর পর দাবি ওঠে শুধু উপজেলা পর্যায়ে নয়, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বিক্রয়কেন্দ্র চালু এবং চাল-আটার পরিমাণ বৃদ্ধি করার। আজ প্রতিটি কেন্দ্রে ২০০ জন থেকে বাড়িয়ে ৪০০ জনের কাছে চাল ও আটা বিক্রি করা হয়েছে। কিন্তু বিক্রয়কেন্দ্র বাড়েনি। যে কারণে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষেরা এসব চাল ও আটা কিনতে পারছে না। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ফয়জুর রহমান বলেছেন, বিক্রয়কেন্দ্র বাড়ানোর বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। আশা করি এটি হবে।

প্রধানমন্ত্রী রোববার আসছেন : সুনামগঞ্জের হাওরে ব্যাপক ফসলহানির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এলাকা পরিদর্শন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী রোববার সুনামগঞ্জ সফরে আসবেন। তিনি জেলার শাল্লা উপজেলা সদরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ত্রাণসহায়তা বিতরণ করবেন। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক শেষ রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরের সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

এর আগে ১৭ এপ্রিল সুনামগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এলাকা পরিদর্শনে আসেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি সুনামগঞ্জে একদিন অবস্থান করে ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এলাকা পরিদর্শন এবং জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

সূত্র : প্রথম আলো

আপনার মন্তব্য

আলোচিত