রিপন দে, মৌলভীবাজার থেকে

০৫ ফেব্রুয়ারি , ২০১৮ ০০:০১

গাছ চুরি আড়াল করতে খুন করে পরকীয়ার নাটক

সংঘবদ্ধ গাছ চোর চক্রকে আড়াল করতেই সাজানো হয় কুলাউড়া থানার কেওলা কান্দি বিলের পাড়ের আরজু মিয়ার ছেলে জালালকে (২০) হত্যার নাটক। নিহত জালালের আপন দুইভাই মকজ্জিল ও মকদ্দিছ প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য এই হত্যা মামলার পরিকল্পনা করে। এ মামলায় নিহতের দু’ভাই তাদের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাতে গিয়ে স্থানীয় কয়েকজনকে জেলও খাটায়।

রোববার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পিবিআইর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শাহাদাত হোসেন সংবাদ সম্মেলন করে এমনটাই জানান সাংবাদিকদের। দীর্ঘ ৮ বছর পর জালাল হত্যার রহস্য উন্মোচন করেছে পিবিআই। এদিকে ৪ বার তদন্ত রিপোর্টে মামলার বাদী নিহত জলালের আপন বড় ভাই মকজ্জিল আলীর আদালতে না রাজির প্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন পর বেরিয়ে আসে পিবিআইর।

এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে পিবিআইর তদন্তে যা বেরিয়ে আসে- ২০১০ সালের ১০ মে রাত ১২টার দিকে রোশন ও আজাদের দুটি ঠেলাগাড়িসহ আজাদ, ছৈয়ব আলী, নিহত জালাল, মকদ্দিছ, রোশন এবং মকজ্জিল চাতলাপুর বাগানের ১০ নম্বর সেকশনে গিয়ে হরিধন ও মাখন চৌকিদার এর সহায়তায় একটি কড়ই গাছ কাটে। গাছটিকে কয়েক টুকরো করে এগুলোকে আজাদ ও রোশনের ঠেলাগাড়িতে উঠায়। আজাদের ঠেলাগাড়িতে ছৈয়ব আলী, নিহত জালাল, আজাদ ও আহাদ গাছের টুকরো গুলোকে ধরে ধরে থাকে। অন্যদিকে রোশনের ঠেলাগাড়িতে মকদ্দিছ, রোশন ও বাদী মো. মকজ্জিল আলী ধরে থাকে। রাত সাড়ে ৩টার দিকে ঠেলা চালিয়ে চাতলাপুর রাবার বাগানের কাঁচা রাস্তায় মোকামের আম গাছের ঢালুতে আসলে আজাদের ঠেলার এক্সেল ভেঙ্গে কাটা গাছের অংশ জলালের উপর পড়ে। তখন সবাই জলালের উপর হতে গাছের অংশ সরিয়ে নেয়। এতে জলাল ঘটনাস্থলে জালালের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত হয়।

লোক জানাজানি ও ঘটনার প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে মো. মকজ্জিল আলী ও মকদ্দিছ জলালকে সু-চিকিৎসা না দিয়ে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। বাড়িতে আসার পরই জলাল মারা যায়। এই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য মকজ্জিল আলী ও তার ভাই মকদ্দিছ ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে জলালের লাশ তাদের বাড়ির পিছনে টিলার ঢালুতে ফেলে রাখে। এছাড়া জলাল গুরুত্বর আহত হওয়ার পরেও চোরাইকৃত গাছের লোভ সামলাতে না পেরে জালালকে চিকিৎসালয়ে না নিয়ে আসামী আজাদ, ছৈয়ব আলী, রোশন ও আহাদ মিলে রোশনের ঠেলাগাড়ি দিয়ে কাটা গাছের অংশ কছমলিপার এলাকার খালিকের বাড়িতে এবং অন্য টুকরোগুলো হাজীপুর স মিলে নিয়ে আসে।

লাশের খবর পেয়ে পরদিন পুলিশ ঘটনাস্থলে সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।

একইদিন নিহতের মামাতো বোন ও জনৈক প্রবাসীর স্ত্রী রোকেয়ার বাড়িতে পংখী, জাবের, মীর, জলিল, রেমান, শাহিদ, মাসুদ মিয়াসহ জলালের যাতায়াত নিয়ে অন্তঃকোন্দলের বিষয়টি উল্লেখ করে নিহত জালালের বড় ভাই মো. মকজ্জিল আলী বাদী হয়ে জলাল হত্যায় সন্দেহভাজনদের আসামী করে মামলা করলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। এরপর গ্রেপ্তারকৃতরা দীর্ঘদিন কারাভোগ করে বর্তমানে উচ্চ আদালত হতে জামিনে আছেন।

এদিকে এ সাজানো ঘটনার পর থেকে রোকেয়ার প্রবাসী স্বামী অভিমান করে দেশে না আসায় এবং রোকেয়ার সাথে কোন যোগাযোগ না রাখায় তার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়।
অন্যদিকে মামলাটি থানা পুলিশের নিকট তদন্তের এক পর্যায়ে রোকেয়ার বাড়ি সংলগ্ন আকমল আলীকে নিহতের ভাই মকজ্জিল আলী মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে তাকে প্রত্যক্ষ সাক্ষী সাজিয়ে আদালতে একটি এফিটডেভিট দায়ের করে। একইভাবে আকমল আলীর স্ত্রী শাহানাকেও প্রত্যক্ষ সাক্ষী বানানোর চেষ্টা করলে শাহানা রাজী না হলে এই নিয়ে তাদের দাম্পত্য কলহের এক তাদেরও পর্যায়ে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়।

প্রসঙ্গত, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার কেওলাকান্দি বিলের পাড় এলাকার আরজু মিয়ার পুত্রকে জলালকে (২০) হত্যার নাটক সাজায় তারই আপন দুই ভাই। পরদিন নিহতের ভাই মকজ্জিল আলী কুলাউড়া থানায় একটি মামলাও দায়ের করেন।

মামলায় তারা উল্লেখ করেন ১০ মে রাত থেকে তার ছোট ভাই ভিকটিম জলাল (২০) বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজ করার একপর্যায়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তার আরেক ভাই ময়না মিয়া গরু চরাতে গিয়ে তাদের বাড়ির পশ্চিম পাশের টিলার ঢালুতে জলালের মরদেহ লাশ দেখতে পায়। ওই ঘটনায় নিহত জলালের বন্ধু জাবের (২২), পংখী (২৩), মীর (৩৫), শাহিদ (৫৫), রেমান (৬০), মাসুদ (৪৫) সহ সন্দেহভাজনদের আসামী করে কুলাউড়া থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলায় আরো উল্লেখ করেন তার মামাতো বোন রোকেয়ার বাড়িতে ভিকটিম সহ আসামীদের যাতায়াত থাকায় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

পরে মামলার তদন্তভার পড়ে এসআই মোঃ শফিকুল ইসলামের উপর। তিনি মামলাটি ১৪ মাস তদন্ত করে কোন ক্লো উদঘাটন করতে না পেরে চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে দাখিল করেন।

এদিকে বাদীর নারাজি আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে একে একে কুলাউড়া থানার তথকালিন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিজুর রহমান, ওসি মো. সেলিম নেওয়াজ ও সিআইডির উপর ন্যস্ত হয়।

সর্বশেষ সিআইডির চূড়ান্ত রিপোর্টের বিরুদ্ধেও বাদী নারাজি আবেদন করলে আদালত মামলাটির তদন্তভার পিবিআই মৌলভীবাজারের উপর ন্যস্ত করেন। পিবিআই পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে তদন্তের একপর্যায়ে জানতে পারেন বাদী মকজ্জিল আলীসহ একটি গাছ চোর চক্র এই ঘটনা ভিন্নখাতে নিতে এই পরিকল্পনা করেন।

প্রাপ্ত তথ্য ভিত্তিতে ৩১ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত কুলাউড়া থানার কেওলা কান্দি বিলের পাড়ের আরজু মিয়ার ছেলে আজাদ মিয়া, ইদ্রিস কোম্পানির ছেলে আহাদ মিয়া, মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে ছৈয়ব আলীকে গ্রেপ্তার করেন। আটককৃতদের তথ্যের ভিত্তিতে এই মামলার বাদী মোঃ মকজ্জিল আলীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যার ঘটনাস্থলও চিহ্নিতকরণসহ ঘটনায় ব্যবহৃত ঠেলাগাড়ি ও গাছ কাটার করাতও উদ্ধার করা হয়। মামলার বাদী মোঃ মকজ্জিল আলীসহ গ্রেপ্তারকৃত আজাদ, আহাদ, ছৈয়ব আলী এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।

উক্ত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার জেলা পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শাহাদাত হোসেন, ইন্সপেক্টর গোলাম কিবরিয়া, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর মোঃ তরিকুল ইসলাম সহ পিবিআইর অন্যান্য সদস্য।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত