২১ ফেব্রুয়ারি , ২০১৮ ০০:৪২
তাঁর পুরো নাম মাইকেল জন শেরিয়ান। তবে মাইক শেরিফ নামেই তিনি পরিচিত। জন্ম ইংল্যান্ডের লেস্টার শহরে। উন্নয়ন কর্মী মাইক একটি উন্নয়ন সহযোগি সংস্থার হয়ে বাংলাদেশে আসেন। কাজ করতে করতে এই দেশের প্রেমে পড়ে যান তিনি। কেবল দেশ নয়, ভাষারও প্রেমে পড়ে যান মাইক। অল্প দিনের মধ্যেই শিখে নেন বাংলা ভাষা।
বাংলা বলা, পড়া ও শোনা- তিনটিই আত্মস্থ করে নেন। তবে এখানেই থেমে থাকেন নি তিনি। বাংলা ভাষা লিখে ফেলেন আস্ত একটি কবিতার বই। ‘ভিন্ন অভিজ্ঞতায় ভিন্ন দৃশ্য: আমার জীবন এবং বাংলাদেশ’ নামের এই বইটি এবার একুশে বই মেলায় এনছে নাগরী প্রকাশনী। মূলত বাংলাদেশে ভ্রমণ ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই বইটি লিখেছেন মাইক।
বাংলাভাষায় ভিনদেশির এই বই ইতোমধ্যে বেশ আলোচিত হয়েছে। ১ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা সিলেট বইমেলায় সর্বাধিক বিক্রিতের তালিকায় ছিলো এই বই। ঢাকার একুশে বইমেলায়ও বইটি ব্যাপক সাড়া ফেলছে বলে জানিয়েছেন, নাগরী প্রকাশনীর প্রকাশক সুফি সুফিয়ান।
একুশে বইমেলা থেকে বইটি কিনে নেন কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। ফেসবুকে কয়েকটি ছবি যুক্ত করে এই বই কেনার কথা জানিয়ে শাহরিয়ার লেখেন- ‘এবারের মেলা থেকে এ পর্যন্ত যত বই কিনেছি, শ্রেষ্ঠতার বিচারে মাইক শেরিফের ‘ভিন্ন অভিজ্ঞতায় ভিন্ন দৃশ্য: আমার জীবন এবং বাংলাদেশ’ সেগুলোর মধ্যে এক নম্বরে আছে। একজন ভিনদেশির চোখে বাংলাদেশই শুধু নয়, বাঙলা ভাষার প্রতি লেখকের মমত্বে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। মহার্ঘ বইটি প্রকাশ করেছে নাগরী। আজ নাগরীর স্টল থেকে শুরু করে ঢাকায় মাইকের অস্থায়ী নিবাস পর্যন্ত লম্বা আড্ডা আমাকে ঋদ্ধ করেছে। প্রথম বাংলাদেশ সফরে কুড়িগ্রামে ছিলেন মাইক। তাই, আমাদের আলাপচারিতায় ধরলা নদী গুরুত্ব পেয়েছে।’
১৯৮৭ সালে উন্নয়ন সহযোগি সংস্থার হয়ে শিশুদের নিয়ে কাজ করতে প্রথম বাংলাদেশে আসেন মাইক। বাংলাদেশে তার প্রথম ঠিকানা হয় কুড়িগ্রাম। সেই থেকে তিনি বাংলাদেশে আসা যাওয়ার মধ্যে আছেন তিনি।
শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁর প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ভাষা। এছাড়া এদেশে থাকতে থাকতে এখানকার ভাষার প্রতিও ভালবাসা জন্মে যায় তাঁর। ২০০৬ সাল থেকে বাংলা শিখতে শুরু করেন তিনি। মাইক বলেন, আমাকে বাংলা শিখতে সাহায্য করেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অসিম চৌধুরী। এরপর ২০১০ ও ২০১৩ সালের মধ্যে আমি বাংলা ভাষায় ও লেবেল এবং এ লেবেল পরীক্ষা দিয়ে পাশ করি। এর পর থেকেই আমার বাংলায় একটি বই লেখার আগ্রহ জাগে।
বাংলায় নিজের বই প্রসঙ্গে মাইক শেরিফ বলেন, এর আগেও আমি বই লিখেছি তবে বাংলাভাষায় লেখা এটা আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। আমি দীর্ঘ দিন বাংলাদেশে আছি। এ দেশের অনকে জায়গা ঘুরেছি। এই বইয়ে আমার বাংলাদেশে আসা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় শিশুদের নিয়ে কাজ করাসহ আমার পুরো অভিজ্ঞতা সম্পর্কে এই বই তুলে ধরা হয়েছে।
কেবল এই দেশ আর ভাষা নয় এখানকার ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি সম্পর্কেও বিস্তর ধারণা রাখেন মাইক। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশে আসার আগেই বাংলাদেশ সর্ম্পকে জেনেছি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্য অনেকে প্রাণ দিয়েছেন এদেশের। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে পরাজিত করে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। ২১ ফেব্রুয়ারিকে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ১৯৯৯ সালে ঘোষণা করেছে ইউনোস্কো।
বাংলাদেশের লালন সংগীত ও আব্দুল করিমের গান খুব পছন্দ মাইকের। তাদেও কয়েকটি গান গাইতেও পারেন তিনি। মাইক বলেন, আমি সংগীত খুব ভালবাসি। ইংল্যান্ডে থাকতে পাশ্চাত্য সংগীত নিয়ে প্যারানয়া নামক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতও আমার খুব ভাল লাগে। আর বাংলাদেশের লালন সংগীত ও বাউল শাহ আব্দুল করিমের গান আমার মন কেড়েছে। এছাড়া সিলেট অঞ্চলের ধামাইল গান আমার খুব ভাল লাগে। আর আমি প্রচুর বাংলা বই পড়ি। রবীন্দ্র সংগীত শুনি। যা আমার লেখা বইয়ে উল্লেখ করেছি।
মাইক শেরিফের বইয়ের প্রকাশক সুফি সুফিয়ান বলেন, মাইকের বইটি খুব সহজ বাংলায় লেখা। তবে তার দেখার চোখটি খুব অসাধারণ। এই বইটি পড়লে যে কেউ বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন করে জানতে পারবে।
তিনি বলেন, মাইক যে পাণ্ডুলিপিটি আমাদের দিয়েছিলেন তা অনেকে প্রতিষ্ঠিত লেখকের চেয়েও গোছালোও ছিলো। বাংলা ভাষার প্রতি একজন বিদেশীর এই মমত্ব আমাদের খুব আকৃষ্ট করেছে। আমরা খুব যত্ন নিয়ে তার বইটি প্রকাশ করেছি।
আপনার মন্তব্য