নিজস্ব প্রতিবেদক

২৫ ফেব্রুয়ারি , ২০১৮ ০১:০০

প্রবাসীদের কারণে পরিবার পরিকল্পনায় পিছিয়ে সিলেট

সিলেটের ৫২ শতাংশ দম্পতিই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন না

সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার বোয়ালজুর এলাকার গৃহিনী আকলিমা আক্তার অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গত শুক্রবার ভর্তি হন নগরীতে বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা পরিচালিত একটি হাসপাতালে। শনিবার ওই হাসপাতালে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেন তিনি।

আকলিমার আরও তিন সন্তান রয়েছে। দু’জন মেয়ে ও একজন ছেলে। তিন সন্তানের পরও আবার সন্তান নেওয়া প্রসঙ্গে আকলিমা বলেন- ‘স্বামীর ইচ্ছা’।

জানালেন- স্বামী আব্দুস সোবহান কুয়েতে থাকেন। দুই-তিন বছর পর দেশে আসেন মাসখানেকের জন্য। তিনি অধিক সন্তান নিতে আগ্রহী। জন্মনিয়ন্ত্রনে কোনো পদ্ধতি ব্যবহারেও আপত্তি তাঁর।

কেবল আব্দুস সোবহান নন, প্রবাসীবহুল অঞ্চল সিলেটের অনেক প্রবাসীই পরিবার পরিকল্পনায় আগ্রহী নন। জন্মনিয়ন্ত্রণের কোনো পদ্ধতিও ব্যবহার করেন না তারা। প্রবাসী আধিক্য, ধর্মন্ধতা, দারিদ্রতা, হাওরাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে পরিবার পরিকল্পনায় দেশের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে সিলেট।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য কর্মসূচি’ পুস্তিকার তথ্য অনুযায়- সারা দেশে মোট প্রজনন হার বা নারীপ্রতি সন্তান জন্ম (টিএফআর) ২ দশমিক ৩ জন। অথচ সিলেটে তা ২ দশমিক ৯ জন। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারেও পিছিয়ে সিলেটের দম্পতিরা। বর্তমানে দেশে গড়ে ৬২ দশমিক ৪ ভাগ দম্পতি পদ্ধতি ব্যবহার করেন। কিন্তু সিলেটে তা ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ সিলেটের ৫২ ভাগ দম্পত্তিই জন্মনিয়ন্ত্রণে কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করেন না।

কেনো পিছিয়ে সিলেট? পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সিলেট’র বিভাগীয় পরিচালক কুতুব আহমদ মনে করেন- পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ প্রবাসীরা। তিনি বলেন, সিলেটের ৯ শতাংশ লোক প্রবাসে থাকেন। তারা কখন দেশে আসেন-কখন চলে যান সে খবর আমরা জানি না। ফলে তাদের কাছে আমাদের বার্তা পৌছানো যায় না। এসব প্রবাসীরা পরিবারে জন্মহার অরেক বেশি।

কুতুব উদ্দিন বলেন, সারাদেশের চাইতে সিলেটে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমও পরে শুরু হয়েছে। দেশের সব জায়গায় যেখানে ১৯৭৭ সালে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম শুরু হয়েছে সেখানে সিলেটে এ কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। এছাড়া প্রথম দিকে এই কার্যক্রমে সিলেটে বেশ বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। আর চা বাগান ও হাওড়াঞ্চলের কারণেও আমাদের কার্যক্রমে সমস্যা হয়। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে হাওড় এলাকায় সব সসময় যাওয়া যায় না। চা শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। এসব কারণে আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি। তবে আমরা দ্রুত এগিয়ে চলছি।
পরিবার পরিকল্পনার বিভাগের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা প্রবাসী আধিক্যকেই পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ মনে করলেও এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা মাঠকর্মীরা মনে করেন ধর্মন্ধতার কারণে পরিবার পরিকল্পনায় সিলেটে কাঙ্খিত সাফল্য মিলছে না।

প্রবীণ স্বাস্থ্যকর্মী রওশনারা মনির রুনা বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতি ব্যবহারে দম্পত্তিদের আগ্রহী করে তুলতে ধর্মীয় গোড়ামিই সবচেয়ে বড় বাধা। এখনও সিলেটে কিছু এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিবার পরিকল্পনার বার্তা দিয়ে যেতে পারে না। পদ্ধতি ব্যবহারের কথা বলতে পাওে না। এগুলোকে ধর্মবিরোধী কাজ বলে অপব্যাখ্যা দেন গ্রামের মুরব্বী ও ধর্মীয় নেতারা। এজন্য ব্যপক প্রচারণার প্রয়োজন বলে মনে করেন রুণা।

সিলেট সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতি ব্যবহারে সিলেটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও ভোলাগঞ্জ উপজেলা। প্রত্যন্ত এসব উপজেলায় জন্মহারও বেশি।

পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা সরকারী বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের মতে- প্রবাসীআধিক্য, ধর্মীয় গোড়ামি, দারিদ্রতা, বাল্যবিবাহ, ভৌগলিক অবস্থান ও নারী শিক্ষার অনগ্রসরতা এসব নানা কারণে সিলেটে আশানুরুপ সাফল্য পাচ্ছে না পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী।

সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারী উন্নয়ন সহযোগি সংস্থাও সিলেটে পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে। এরকম একটি প্রতিষ্ঠান সিলেট সমাজ কল্যান সংস্থা (এসএসকেএস)-এর নির্বাহী পরিচালক বেলাল আহমদ বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রনে সরকারের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম আগের চাইতে এখন অনেক স্তিমিত হয়ে পড়েছে। সরকারী বরাদ্ধ কমে গেছে। ফলে আগে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে যে গতিশীলতা ছিলো তা এখন নেই। এছাড়া এক্ষেত্রে জনবলের অভাবও রয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ সানুষকে আগ্রহী করে তোলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠকর্মী নেই। সিলেটের ১৮ শতাংশ দম্পতির কাছে পরিবার পরিকল্পনার বার্তা এখনো পৌঁছানো হয়নি বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, সারাদেশে পরিবার পরিকল্পনায় অগ্রগতির কারণে সরকার হয়তো এই ইস্যুতে আগের মতো সোচ্ছার নয় কিন্তু সিলেট যেহেতু পিছিয়ে রয়েছে তাই এলাকার জন্য বিশেষ কর্মসূচী নেওয়া প্রয়োজন।

তবে সিলেটের সিভিল সার্জন মনে করেন, আগের অবস্থান থেকে সিলেট এখন অনেক এগিয়েছে। গত ১০ বছরে জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতি ব্যবহার ও পরিবার পরিকল্পনায় সিলেট অনেকটা সফল হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অচীরেই দেশের অন্যন্য এলাকার অবস্থায় যেতে পারবে সিলেট।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত