নিজস্ব প্রতিবেদক

২২ জুলাই, ২০১৮ ১৪:৫১

নির্বাচনকে ঘিরে সিলেটে সরব শিবির

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে সিলেট নগরীতে আবারো শিবিরের সরব উপস্থিত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে সিলেটের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী প্রচারণা করতে গিয়ে অস্ত্রসহ সংঘর্ষে জড়িত হয়ে জানান দিয়েছে তাদের উপস্থিতি।

২০ দলীয় জোটের শরিক দল বিএনপি সিসিক নির্বাচনে প্রার্থী দিলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। আর তাকে ঘিরেই নির্বাচনি প্রচারণা, কর্মী সংগ্রহ এবং সংগঠিত হবার মিশনে নেমেছে জামায়াতের এই ছাত্র সংগঠনটি।

ইতিমধ্যেই সিলেটে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাথে সংঘর্ষ এবং যুবলীগ নেতার প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ঘটিয়েছে শিবির। সেই সাথে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা জামায়াত-শিবিরের স্থানীয় ক্যাডাররাও প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছেন বলে দেখা যায়।

গত শুক্রবার (২০ জুলাই) বিকেলে যুবলীগ নেতা আবদুল হান্নানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছিল শিবির ক্যাডাররা। প্রতিষ্ঠানটির সিসিটিভি ক্যামেরার ধারণ করা ৫৪ সেকেন্ডের ভিডিও চিত্রে ৭ নং ওয়ার্ড শিবিরের সভাপতি দিপুকে এই হামলায় নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। পাঁচটি মোটরসাইকেলে করে ১০ থেকে ১২ জন শিবির ক্যাডার ওই হামলায় অংশ নেয়। এদের প্রত্যেকের হাতেই রামদা ও লোহার পাইপ ছিল।  

এ ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর আফতাব হোসেন অভিযোগ করেন, প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থী জামায়াতের সাঈদ মো. আবদুল্লাহর কর্মী শিবির ক্যাডাররা এ হামলা চালিয়েছে।

এদিকে নগরজুড়ে এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের পক্ষে প্রচারণায়ও ব্যস্ত সময় পার করছে জামায়াত-শিবির। তাদের বেশিরভাগই বহিরাগত। জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে সিলেটে এসে নির্বাচনী প্রচারণা কার্যক্রম চালাচ্ছে। অথচ কিছুদিন আগেও এমন চিত্র সিলেট নগরে কল্পনা করা যেত না। সারা দেশের মতো সিলেটেও মামলায় জর্জরিত জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তারের ভয়ে ছিল গাঢাকা দিয়ে। সভা-সমাবেশ দূরের কথা, রাস্তায় মিছিল করার অবস্থা ছিল না তাদের।

অথচ আজ রোববারই জুবায়েরের সমর্থনে নগরীতে বিশাল শোডাউন করেছে জামায়াত-শিবির।

সব দেখে বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘হঠাৎ কোন পরশ পাথরের ছোঁয়ায় যেন বদলে গেছে দৃশ্যপট।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কয়েকজন নেতা বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ দেখে তাঁরা সন্তুষ্ট। নির্বিঘ্নে তাঁরা নগরীতে তাঁদের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারছেন। এখন পর্যন্ত তাঁদের কাউকে হয়রানি করেনি পুলিশ।

বহিরাগতদের নিয়ে প্রচারণার বিষয়ে মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির ফখরুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর পক্ষেও বহিরাগতরা প্রচার চালাচ্ছে। সেই ক্ষেত্রে নগর জামায়াতের আমিরের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন তার আত্মীয়স্বজনরা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বহিরাগত থাকতেই পারেন। তবে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করে মিছিলের প্রসঙ্গে স্থানীয় জামায়াত নেতারা কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

নগরীর বিভিন্ন স্থানে মিছিলের মাধ্যমে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও এর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনকে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

সশস্ত্র হামলায় নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়া শিবিরের বিষয়ে কোন মন্তব্যই করতে চাননি আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এবং বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীও।

অনেকের মতে, ভোটের মাঠে সুবিধা করতে না পারলেও ২০ দলীয় জোটের শরিক বিএনপির সঙ্গে দরকষাকষির সুবিধার্থে নির্বাচনী প্রচারের আড়ালে মূলত সংগঠনকে চাঙ্গা করার মিশনে নেমেছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত। ফলে ভোটারদের চেয়ে নগরীর বিভিন্ন মেসে বসবাস করে আসা বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থীদের কৌশলে দলে ভেড়ানোর মিশনে নেমেছে শিবিরের বহিরাগত ক্যাডাররা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও অধিকাংশ মেসে এক সময় শিবিরের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার ফলে মাঝে এদের দৌরাত্ম্য কমলেও সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা ওই এলাকায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। নগরীর আখালিয়া, সুবিদবাজার, শিবগঞ্জ, দরগা মহল্লাসহ পুরাতন এলাকাগুলোকে টার্গেট করে মাঠে নেমেছে জামায়াত-শিবির।

সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিমকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী সফল হতে পারলেও জামায়াতকে নির্বাচন থেকে সরাতে পারছেননা তিনি।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, এখানে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে জামায়াত নেতাদের দ্বন্দ্ব বেশ পুরোনো। এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয় যখন মেয়র থাকাকালে আরিফুল হক জামায়াতের মালিকানাধীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের সীমানা দেয়াল ভেঙে দিয়েছেন সড়ক সম্প্রসারণ করার জন্য। জামায়াতের নেতারা এটিকে ভালোভাবে নেননি।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগের স্ববিরোধী নীতি ও অবস্থানের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী সিসিক নির্বাচনে ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৩টি ওয়ার্ডে একক প্রার্থী দিয়েছে। ৯টি সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদের মধ্যে তাঁদের প্রার্থী আছে দুটিতে। প্রার্থীদের প্রচারের জন্য ওয়ার্ড ও পাড়া-মহল্লাভিত্তিক আলাদা কমিটি দেওয়া হয়েছে। তারা বাসায় বাসায় গিয়ে প্রার্থী সম্পর্কে তুলে ধরে ভোট চাইছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা এবং দলের বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধিরাও স্থানীয় প্রার্থীর সঙ্গে থেকে গণসংযোগে অংশ নিচ্ছেন।

কতটি ওয়ার্ডে দল জয়ী হবে কিংবা মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী কত ভোট পাবেন, সেই বিবেচনার চেয়েও তাদের কাছে অগ্রাধিকার পেয়েছে নির্বাচনী মাঠে সরব থাকা, প্রার্থিতার সুযোগে দলের নীতি ও আদর্শের কথা ভোটারদের কাছে পৌঁছানো।

এ বিষয়ে জামায়াত নেতা নিজাম উদ্দিন সিদ্দিকী বলেন,  ‘এর আগে সিটি করপোরেশনে আমরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিনি। সে কারণে ভোট কতটা আছে বলতে পারব না। তবে আমাদের বিশ্বাস, আমরা ৩০ হাজারের বেশি ভোট পাব।’

নির্বাচনকে সামনে রেখে সংগঠিত হবার সুযোগ পাচ্ছে জামায়াত উল্লেখ করে বাসদ-সিপিবি মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী আবু জাফর বলেন, ‘যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দাবিদার তারা ভোটের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য একাত্তরের চিহ্নিত পরাজিত শক্তিকে ভোটের ময়দানে এনে তাদের সংগঠিত করার সুযোগ করে দিয়েছে। এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ ভালো চোখে দেখছে না।’

তিনি বলেন, ‘জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা না থাকলেও তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সেই সুযোগটা করে দিল ক্ষমতাসীনরা। জামায়াত দুর্দশা অবস্থায় চলে গিয়েছিল, কিন্তু এই নির্বাচনের মাধ্যমে তারা আবার সাংগঠনিকভাবে মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের আহ্বায়ক ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি খুবই মর্মাহত। আমি একাত্তরের নির্যাতিত পরিবারের সন্তান হিসেবে তাদের আস্ফালন দেখে খুবই হতবাক। সরকারি দলের প্রার্থী যে রকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে জামায়াতের প্রার্থীও সে রকম সুবিধা পাচ্ছেন এখানে।’

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক। এরা তো ২০ দলীয় জোটেরই একটা দল। এরা আবার জিকির করে, সরকার তাদের মিটিং-মিছিল করতে দেয় না, এটা সরকারের বিরুদ্ধে বদনাম হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া তাই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার সবারই আছে, বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। কিন্তু নির্বাচনের সুযোগ নিয়ে তারা মাঠে নেমেছে।’

সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আলী আহমদ বলেন, ‘সারা দেশে বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা নিজ বাড়িতে থাকতে পারে না। কিন্তু সিলেটে জামায়াত নেতারা নির্বিঘ্নে রয়েছেন। তাঁদের প্রচারকাজে কোনো বাধা না দিলেও আমাদের পদে পদে হয়রানি করা হচ্ছে।’

হামলা ও সংঘর্ষের বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়া জানান, সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন-সংক্রান্ত আইনের লঙ্ঘন হলে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত