নিজস্ব প্রতিবেদক

২৫ জুলাই, ২০১৮ ১৫:৪০

যা আছে কামরানের নির্বাচনী ইশতেহারে

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান তার ৩৩ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। সিটি মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হবে সিলেট নগরীতে কি কি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে তা এই ইশতেহারে উল্লেখ করেছেন তিনি।

সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরের পাঠকের জন্য বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের নির্বাচনী ইশতেহার এখানে তুলে ধরা হলো-

১. শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন এবং সিলেট নগরকে শতভাগ নিরক্ষতামুক্ত করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশ্ব মানের স্কুল, কওমি মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হবে। আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। কর্পোরেশনের উদ্যোগে উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতকরণে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজিয়েট স্কুল স্থাপন করা হবে। মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য চালু করা হবে শিক্ষাবৃত্তি। ভোলানন্দ নৈশ বিদ্যালয়কে কলেজে রূপান্তর করা হবে।

২. রোগ-বালাই মানব জনজীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নগরের বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব। জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বিশ্বমানের নগর ক্লিনিক স্থাপন করা হবে। প্রতিমাসে ওয়ার্ড ভিত্তিক ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

৩. সিলেট শহরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে পুরো নগরে পাতাল বিদ্যুৎলাইন স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। তাহলে বিশ্বের আধুনিক শহরগুলোর মতো বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কবলে পড়তে হবে না নগরবাসীকে।

৪. নগরকে যানজট মুক্ত করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। তৈরি করা হবে লিংক রোড। নগরের অভ্যন্তরীণ সকল রাস্তা প্রশস্তকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গড়ে তোলা হবে নগরে একাধিক স্ট্যান্ড। সেন্ট্রাল কার পার্কিংয়েরও ব্যবস্থা করা হবে। ট্র্যাফিক সিগন্যাল লাইট স্থাপন, ফুট ওভার ব্রিজ নির্মাণ, ফুটপাত প্রশস্তকরণ এবং জনসাধারণের স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদ হাঁটা চলার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেইসঙ্গে আধুনিক ও বিশ্বমানের বাসস্ট্যান্ড ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। উদ্যোগ নেওয়া হবে ফ্লাইওভার নির্মাণের। বিশ্বের অন্যান্য শহরের মত আলাদা সাইকেল লেন স্থাপনে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

৫. ফুটপাতকে করা হবে হকারমুক্ত। হকারদের পুনর্বাসনের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হবে চারটি হকার মার্কেট। বিশ্বের উন্নত শহরের মত সাপ্তাহিক বন্ধের দিন রাখা হবে বিশেষ মার্কেটের ব্যবস্থা। লালদিঘি মার্কেট ভেঙে সেখানে নির্মাণ করা হবে বহুতল ভবন। এই ভবনে আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। সেখানে স্বল্প আয়ের বিভিন্ন পেশাজীবীদের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।

৬. জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীকে রেহাই দিতে অবৈধ দখলদারদের দখলে থাকা ছড়া এবং খালগুলো উদ্ধার করে খনন করা হবে। পাশাপাশি ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে নেওয়া হবে বিশেষ প্রকল্প। সুরমা নদী ড্রেজিং এখন সময়ের দাবি। এ ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

৭. গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেকটা স্থবির হয়ে আছে আবাসন ব্যবসা। নতুন বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ না-থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। নগরে গ্যাস সংযোগ চালুর ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

৮. নগরবাসীকে শতভাগ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুরনো ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট সংস্কার ও নতুন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করা হবে।

৯. নগরবাসীর যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নতকরার লক্ষ্যে চালু করা হবে আধুনিক নগর পরিবহণ। নারীদের জন্য থাকবে পৃথক পরিবহণ ব্যবস্থা। পাশাপাশি উবার, পাঠাওয়ের মতো সংস্থাগুলোর কার সার্ভিস চালুর ব্যাপারে উদ্যোগ করা হবে।

১০. পর্যটন নগর হিসেবে খ্যাত সিলেট নগরের পর্যটন স্পটগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশেষায়িত স্থাপনা নির্মাণ ও দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

১১. বর্তমান কারাগারের স্থলে একটি আধুনিক নগরপার্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে। যেখানে থাকবে সবুজের সমারোহ। যা হবে সিলেটের মানুষের নির্মল অক্সিজেন গ্রহণের অন্যতম স্থান। পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন পার্কগুলোকে আধুনিকায়ন এবং নতুন বিনোদনকেন্দ্র তৈরি করা হবে।

১২. টেমস নদীর দুইপারের আদলে সুরমা নদীর দুই পার আধুনিকায়ন করা হবে। তীর সংরক্ষণ এবং সৌন্দর্য বর্ধন করা হবে। যাতে নাগরিকরা বিকেলে একটু হাঁটাহাঁটির পাশাপাশি নির্মল বাতাস নিতে পারেন প্রাণভরে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

১৩. খেলার মাঠ, দিঘি আর টিলা যেগুলো এখনও টিকে আছে সেগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। সেই সঙ্গে নতুন মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

১৪. সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে বেগবান করতে তৈরি করা হবে একটি অত্যাধুনিক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স। পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহকে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হবে।

১৫. তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে খেলাধুলায় সক্রিয় করা হবে। এজন্য মেয়র কাপ ফুটবল ও ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, উশু, ক্যারাম, দাবা, ভলিবল প্রভৃতি প্রতিযোগিতা চালু করা হবে। পাশাপাশি চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থাও করা হবে।

১৬. দক্ষ ও রপ্তানিমুখী জনশক্তি গড়ে তুলতে মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা ও উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। সেজন্য প্রতিষ্ঠা করা হবে একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সিলেটের বিভিন্ন কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সিলেট সিটি কর্পোরেশনে
বিশেষ ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে কাজের সুযোগ করে দেওয়া হবে।

১৭. শিশুনির্যাতন এবং শিশুহত্যা ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বিকৃত মানসিকতা লালনকারীরা অবুঝ শিশুদেরকে তাদের শিকারে পরিণত করছে। তা রোধ করতে এবং শিশুদের সুরক্ষার জন্য অভিভাবকদের সচেতন করে তুলতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

১৮. নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তাদেরকে আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে হাতে নেওয়া হবে বিশেষ প্রকল্প। নারীদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বাজারজাতকরণের ব্যাপারে গ্রহণ করা হবে যথাযথ উদ্যোগ।

১৯. সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত না-হওয়ায় পরিকল্পিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নগরবাসী। হবে হচ্ছে বেড়াজালে আবদ্ধ থাকা ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

২০. প্রবাসীদেরকে বিনিয়োগে আগ্রহী করতে তুলতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। প্রবাসীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন সেজন্য হেল্প ডেস্ক চালু করা হবে।

২১. নগরকে গ্রিন সিটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে শুরু করা হবে বৃক্ষরোপণ অভিযান।

২২. সিলেটকে পরিচ্ছন্ন নগর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২৭টি ওয়ার্ডের দৈনন্দিন ময়লা আবর্জনা যথাসময়ে অপসারণ করা হবে।

২৩. নগরে আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রাতের বেলা জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে সিলেট মহানগরের প্রতিটি সড়কে এলইডি লাইটপোস্ট স্থাপন করা হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডকে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হবে।

২৪. মহাজোট সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সিলেটকে প্রথম ডিজিটাল নগর গড়ে তোলার লক্ষ্যে গৃহীত প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারে স্থাপন করা হবে আইসিটি পার্ক। সিলেট নগরকে ডিজিটাল নগর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। নগরের বিভিন্ন এলাকা ও স্থাপনায় ফ্রি ওয়াই-ফাইয়ের ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে চালু করা হবে ই-তথ্য সেবাকেন্দ্র।

২৫. প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে। মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়সমূহে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। প্রতি রমজান মাসে সিটি কর্পোরেশনের মসজিদগুলোতে বয়স্কদের জন্য কোরআন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা
হবে। যা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

২৬. নতুন কোনও কর আরোপ না করে নগরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করা হবে। যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হবে। ওয়ার্ডভিত্তিক উন্নয়ন কমিটি গঠনের মাধ্যমে নগরবাসীকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হবে।

২৭. মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে। তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে স্বল্প মেয়াদি কম্পিউটারসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

২৮. জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সিটি কর্পোরেশন প্রদত্ত সকল সুযোগ- সুবিধা প্রদান করা হবে। জাতীয় দিবসগুলোতে তাঁদেরকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হবে। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা হবে।

২৯. সিটি কর্পোরেশনের সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলরদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত করা হবে।

৩০. মাদকের অভিশাপ থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাদকমুক্ত সিলেট নগর গড়ে তোলা হবে।

৩১. নগরীতে ভেজাল খাদ্য বিক্রয়ের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। শাকসবজি, মাছ-মাংস, ফলমূলসহ বিভিন্ন প্রকার খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগের কারণে রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। ভেজালমুক্ত খাবার নিশ্চিত করতে যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

৩২. নগরে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন ও আধুনিক শিল্পপার্ক স্থাপন করা হবে। শিল্পে বিনিয়োগে প্রবাসীদের আকৃষ্ট করা হবে।

৩৩. প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চিতে যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। নগরীতে বসবাসকারী সকল প্রতিবন্ধীকে বিদ্যমান সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে।

এছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারে বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে অতীতে যেভাবে নগরবাসী নৌকার উপর আস্থা রেখেছিলেন, আমার বিশ্বাস আসন্ন ৩০ জুলাইয়ের নির্বাচনেও এর অন্যথা হবেনা।’

নৌকা বিজয়ী হলে সিলেট নগরে উন্নয়নের জোয়ার বইবে বলেও উল্লেখ করেন কামরান।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত