নিজস্ব প্রতিবেদক

২৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:৫৯

সম্প্রীতির পাশাপাশি আছে শঙ্কাও

‘সিলেটে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সম্প্রীতি আছে। কিন্তু প্রশাসন এই সম্প্রীতি নষ্ট করছে। কিছু কর্মকর্তা অতিউৎসাহী ও বাড়াবাড়ি করে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশকে নষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে।’- শুক্রবার রাতেও সংবাদ সম্মেলন করে এমন অভিযোগ জানিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিএনপি দলীয় মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী।

আরিফ ছাড়াও আরও একাধিক মেয়র প্রার্থী এমন শঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন। গাজীপুর ও খুলনাতে সুষ্ঠু ভোট হয়নি দাবি করে সিলেটেও তেমনটি হতে পারে বলে শঙ্কা তাদের।

সিলেটে এখন পর্যন্ত নির্বাচনকে ঘিরে বড়ধরণের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেনি। বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সকল প্রার্থীর মধ্যে প্রকাশ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক দেখা গেছে। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্নস্থানে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করছেন মেয়র প্রার্থীরা। তবু সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। মূলত সরকারী বিভিন্ন বাহিনীর প্রতিই অভিযোগ প্রার্থী আর নাগরিক নেতাদের।

গত কয়েকদিনে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে করা তিনটি মামলা আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের একটি নির্বাচনী কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও একটির সামনে ককটেল বিস্ফোরণে এ শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ করা হচ্ছে। শঙ্কা আছে নাগরিক সমাজের নেতাদের মধ্যেও।
তবে এমন শঙ্কা আর অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন সরকারদলীয় প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ও মহানগর পুলিশ।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক সিলেট’র সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রার্থীদের মধ্যে এমনিতে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তারা অন্তরে কতটুকু এই সম্পর্ক লালন করেন এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ আমরা দেখি, কোলাকুলি করে বেরিয়েই তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। নির্বাচন কমিশনে গিয়ে নালিশ করেন।

তিনি বলেন, প্রার্থীদের পাশাপাশি প্রশাসনকে সংযত আচরণ করতে হবে। পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট অনেকক্ষেত্রে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করে সরকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সিলেটের রাজনৈতিক সম্প্রীতির ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। ক্ষমতাশীল দল আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতেরও সখ্যতার জোরালো অভিযোগ আছে।

আবার এই সম্প্রীতির কারণেই বিএনপি দলীয় নেতা আরিফুল হক চৌধুরী মেয়র থাকাকালেও উন্নয়ন বঞ্চিত হয় নি নগরী। ভিন্ন দলের হলেও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আনুকূল্য সবসময়ই পেয়েছেন আরিফ। গত জাতীয় নির্বাচনকালীন সময়ে দেশজুড়েই অস্থিরতা-সংঘাত চললেও সিলেটে বড় ধরণের কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। এসব উল্লেখ করে সিলেটের রাজনৈতিক ও সুধী সমাজের নেতৃবৃন্দ সবসময়ই এখানকার সম্প্রীতির বিষয়টি তুলে ধরেন। এবার সম্প্রীতির সাথে যুক্ত হয়েছে শঙ্কাও।

তবে সিলেটে নির্বাচনে তেমন কিছু হবে না বলেই মনে করেন সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুল করিম কিম। তিনি বলেন, আমার মনে হয় সিলেটে নির্বাচন সুষ্ঠু পরিবেশেই হবে। কারণ সিলেটের মানুষ শান্তিপ্রিয়। এখানে রাজনৈতিক পরিবেশও অতটা সহিংস নয়, অন্তত এখন পর্যন্ত এরকম আভাসই পাচ্ছি আমরা। তবে বিএনপিসহ কয়েকজন মেয়র প্রার্থী উল্টো আভাস পাচ্ছেন।

গত কয়েকদিনে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ৩টি মামলা ও কয়েকজন নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের পর বিএনপি নেতাদের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা আরও বেড়েছে। সরকারদলীয় প্রার্থী বদরউদ্দিনের কামরানের পক্ষে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী কাজ করছে বলে অভিযোগ তাদের।

শুক্রবার জরুরী সংবাদ সম্মেলন করে এ শঙ্কার কথা জানিয়েছেন আরিফুল হকও। তবে কোনো ষড়যন্ত্রই তাকে নির্বাচন থেকে সরাতে পারবে না বলেও এসময় ঘোষণা দেন আরিফ।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদও অভিযোগ করেছেন সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে ও সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে কামরান নির্বাচনী সভা করছেন।

এ ব্যাপারে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ও সদ্য সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, যেসব লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি তাতে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে মনে হচ্ছে না। পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদের বাসায় রাতের বেলা গিয়ে হয়রানি করছে। আমার সম্ভাব্য এজেন্টদের হুমকি দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করেও কাজ হচ্ছে না। সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়নি।

এ ব্যাপারে সিপিবি-বাসদের প্রার্থী আবু জাফর বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা আছে। তাদের মধ্যে একধরণের ভয় আছে। বিশেষত খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচনের পর এই শঙ্কা আরও বেড়েছে। এখন এই শঙ্কা কাটানোর দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু এ ব্যাপারে তাদের কোনো উদ্যোগ নেই।

আবু জাফর বলেন, প্রতিদিনই আমার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রার্থীরা প্রতিদিনই আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। এব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সময় অভিযোগ দেওয়া হলেও তারা নীরব। ফলে শঙ্কা বাড়ছে।

তবে এসব শঙ্কা আর অভিযোগকে অপপ্রচার উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ও সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। তিনি বলেন, একটি পক্ষ পরাজয় আঁচ করতে পেরে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার জন্য নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। অভিযোগ করাই বিএনপির রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

কামরান বলেন, সিলেটে রাজনৈতিক সম্প্রীতি রয়েছে। এখানে ছোটখাটো কিছু অভিযোগ থাকতে পারে। তবে সর্বসাকুল্যে পরিবেশ অনেক ভালো। মানুষের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। ফলে নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার কোনো কারণ নেই।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার পরিতোষ ঘোষ হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর বিনা ওয়ারেন্টে আমরা এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করিনি। কাউকে হয়রানিও করিনি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত