৩০ জুলাই, ২০১৮ ০০:২৭
সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছেন ৭ জন। এরমধ্যে বদরুজ্জামান সেলিম অবশ্য আগেই আরিফুল হক চৌধুরীকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ফলে মাঠে আছেন ৬ জন। তবে ভোটারদের কাছে আলোচনার শীর্ষে আছেন দু’জন- আওয়ামী লীগের বদরউদ্দিন আহমদ কামরান আর বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী।
আজ এই সিটি করপোরেশনের ৩য় বারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ভোটের আগে তাই নগরবাসীর কাছে ঘুরেফিরে একটাই প্রশ্ন- আরিফ না কামরান, কে হচ্ছেন নতুন নগরপিতা? এই দুই সাবেক মেয়রের মধ্যে থেকেই একজন ফের মেয়র হতে যাচ্ছেন, এমনটিই ধারণা দিচ্ছে ভোটের হিসেব।
গত নির্বাচনের হিসেব বাদ দিলে কামরানের নির্বাচনী ভাগ্য সবসময়ই ভালো। গত নির্বাচনের আগে কোনো নির্বাচনেই হারতে হয়নি তাকে। কামরানের অনুসারীরা তাই স্লোগান দিয়ে থাকেন- 'নগরবাসীর প্রিয় নাম, বদরউদ্দিন কামরান'। আর প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর আরিফুল হককে ডাকতেন 'ডায়নামিক লিডার' নামে। রাজনীতিতে বিস্ময়কর উত্থান আরিফের। বারবার খাদের কিনার থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বুদ্ধি আর নেতৃত্বগুণে উঠে এসেছেন আলোচনার শীর্ষে। আজকের লড়াইটা তাই এই ‘প্রিয় নাম’ আর ‘ডায়নামিক লিডার’-এর।
আরিফ-কামরান ছাড়াও সিপিবি-বাসদ সমর্থিত প্রার্থী আবু জাফর, ইসলামী শাসনতন্ত্রের প্রার্থী ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন খান, নাগরিক ফোরাম সমর্থিত প্রার্থী মহানগর জামায়াতের আমীর এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এহসানুল হক তাহের এ সিটিতে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এছাড়া নগরীর ২৭ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে ১২৬ জন ও ৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর পদে ৬৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রোববার দুপুর থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটের সরঞ্জামাদি পৌঁছানো শুরু করে নির্বাচন কমিশন। আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্সে নগরীর ১৩৪ ভোট কেন্দ্রে সরঞ্জামাদি নিয়ে যাওয়া হয়।
আজ সকাল ৮টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। সিলেট নগরীতে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ জন। নগরীর ২৭টি টি ওয়ার্ডের ৯২৬ টি ভোট কক্ষ ভোট প্রদান করবেন তারা। এরমধ্যে দুটি কক্ষে ইভিএমের সাহায্যে ভোটগ্রহণ করা হবে। সিলেটে ১৩৪ কেন্দ্রের মধ্যে ৮০ টি কেন্দ্রকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করেছে পুলিশ। এসব কেন্দ্রে নেওয়া হবে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
সিসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলীমুজ্জামান বলেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। ভোটারদের মধ্যেও উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। তিনি বলেন, ভোটের দিন নগরীতে চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে। নগরীতে তিন হাজার পাঁচশ’ পুলিশ, দুই হাজার চারশ’ আনসার, সাড়ে তিনশ’ র্যাব ও ১৬ প্লাটুন বিজিবি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে। প্রতিটি কেন্দ্রের নিরাপত্তায় পুলিশ, আনসারদের সমন্বয়ে ২২ সদস্যের টিম সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকবে।
তিনি জানান, নির্বাচনের দায়িত্বে ১৩৪ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, ৯২৬ জন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও ১৮৫২ জন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন।
একনজরে আরিফ-কামরান: সিলেট নগরীর ছড়ার পাড় এলাকার বাসিন্দা বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ১৯৭৩ সালে প্রথম সিলেট পৌরসভার কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে অংশ নেন। তখন তিনি কলেজ ছাত্র। ছাত্রাবস্থায়ই নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন কামরান। ওই বছর নিয়ে টানা তিন বার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন কামরান। ১৯৯৫ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন কামরান। প্রথমবারেই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। পরে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতিও হন তিনি। এখনো এই দায়িত্বে রয়েছেন কামরান।
২০০২ সালে সিলেট পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করলে এই সিটির প্রথম মেয়র হন বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। পরের বছর ২০০৩ সালের নির্বাচনেও মেয়র পদে জয়লাভ করেন তিনি। ২০০৮ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হন কামরান। কারাগারে থেকেই ফের মেয়র নির্বাচিত হন কামরান।
তবে ২০১৩ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে প্রায় ৩১ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হেরে যান ‘সিলেটবাসীর প্রিয় নাম, বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এই প্রথমবারের মতো পরাজয়ের স্বাদ পান সজ্জন এই রাজনীতিবিদ।
অপরদিকে, ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে ব্যাপক উত্থান ঘটে নগরীর কুমারপাড়া এলাকার বাসিন্দা আরিফুল হক চৌধুরীর। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হয়ে সিলেটের প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠেন নগর বিএনপির তৎকালীন এই সাধারণ সম্পাদক।
২০০৩ সালের সিলেট সিটি নির্বাচনে ১৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন আরিফ। তবে নিজ দল ক্ষমতায় থাকা ও প্রভাবশালী মন্ত্রীর আস্থাভাজন হওয়ায় মেয়রকে পাশ কাটিয়ে নগরীর ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হন তিনি। সেসময় ‘ছায়া মেয়র’ নামেও তাকে আখ্যায়িত করতেন অনেকে।
ওয়ান ইলিভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুদকের প্রকাশ শীর্ষ ৫০ দুর্নীতিবাজের তালিকায় উঠে আসে আরিফের নাম। তখন গ্রেপ্তারও হন তিনি। এরপর দলের ভেতরেও কোণঠাসা হয়ে পড়েন অনেকটা। ২০১৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের স্থানীয় অনেক নেতার বিরোধিতা সত্ত্বেও বিএনপির মেয়র প্রার্থী হয়ে চমক দেখান আরিফ। নির্বাচনে কামরানকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়ে আরও বড় চমক দেখান তিনি।
মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর হবিগঞ্জে বোমা হামলায় খুন হওয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এমএস কিবরিয়া হত্যা মামলার চার্জশিটভূক্ত আসামী হয়ে প্রায় ২৮ মাস কারাগারে ছিলেন আরিফ। মেয়র পদ থেকে তাকে বহিস্কারও করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। পরে জামিনে বেরিয়ে আদালতের রায়ে ফের মেয়র পদ ফিরে পান আরিফ।
এবার প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এবারও এই সিটিতে প্রার্থী হয়েছেন সাবেক এই দুই মেয়র।
আপনার মন্তব্য