০১ মে, ২০১৯ ০০:১৬
‘শ্রমিকের জীবনের চাইর আনাও মূল্য নাই। পেটের জ্বালায় সারাদিন রইদে (রোদ) পুইড়া মেঘে ভিজ্জা কাজ করি। এই ময়লা টানা অনেক কষ্ট। হাত কাটে, পা কাটে, জ্বর, শরীর ব্যাথাতো আছেই। যত অসুখই হোক কাজ আইতে হইবো। কারণ ১ দিন কাজে না আইলেই পরের দিন চাকরি নাই। এই ময়লা সরাইয়া যে টাকা পাই তার অর্ধেক শেষ হয় ওষুধে। মাস শেষে ধার দেনা করতে হয়। অভাব দূর করতে ৬ বছর আগে কিশোরগঞ্জ থেকে সিলেট আইছি পরিবার নিয়া। লেখাপড়া জানি না তাই ভাগ্য ফেরাতে এই কাজ করছি।’
কথাগুলো বলছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের ডাম্পিং ইয়ার্ডের শ্রমিক তাজুল ইসলাম (৪০)। তাজুল ইসলামের মত বাকি শ্রমিকদের জীবনচিত্র প্রায় একই। এই ডাম্পিং ইয়ার্ডে কাজ করে সংসারের নিত্যদিনের চাহিদা মেটাতে রীতিমত হিমসিম খেতে হয় সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্জ্য শ্রমিকদের। যেখানে দুর্গন্ধে সাধারণ মানুষের নিশ্বাস নিতে পারেন না, সেখানে কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করতে হয় তাদের। ফলে নানা রোগব্যাধি এখন তাদের নিত্যসঙ্গী।
আজ মহান মে দিবস। দিবসটি উদযাপনে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচী পালিত হবে। আলোচনা হবে। বক্তৃতা হবে। শ্রমিকদের দাবি পূরণে আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ফোটাবেন বক্তারা। কিন্তু এই দিনেও নগর আর নগরবাসীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে কাজ করে যেতে হবে বর্জ্যশ্রমিকদের।
সিসিকের ডাম্পিং ইয়ার্ডে কাজ করা আরেক শ্রমিক শফিকুর রহমান (১৮)। বাবা নেই তাই মা, ভাই বোনসহ ৭ জনের সংসার চালাতে এখানে কাজ করেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, প্রায় ৬ বছর যাবত এখানে কাজ করছি। এককালীন কিছু টাকা পাওয়া যায় তাই এই কাজ করছি।
শফিক বলেন, এখানে কাজ করা অনেক কষ্টকর। মানুষ যেটা ফালাইয়া দেয় আমরা সেটা নিয়া কাজ করি। তাই অনেক ঝুঁকি নিয়েই কাজ করি। তবে আমাদের সুরক্ষার জন্য সিটি করপোরেশনের আরো উদ্যোগী হওয়া দরকার। সিটি থেকে যে জুতা দেওয়া হয় সেটা একমাস কাজ করলেই নষ্ট হয়ে যায়। তাই নিরাপত্তার জন্য জুতা আরো বেশি দরকার।
সিলেট নগরীর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার লালমাটিয়া অবস্থিত সিটি করপোরেশনের ডাম্পিং ইয়ার্ড। সেখান থেকে কিছু শ্রমিক বর্জ্যবহনকারী গাড়ীতে করে আবর্জনা রাখার নির্ধারিত স্থানে গিয়ে বর্জ্য নিয়ে আসেন। এই বর্জ্যগুলো শ্রেণীভেদে সারানোর কাজ করেন কিছু শ্রমিক।
সিলেট সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট নগরে জনসংখ্যা ৪ লাখ ৮৫ হাজার ১৩৮। এই নগরে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ২৮০ মেট্রিকটন বর্জ্য উৎপাদন হয়। এই বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করতে ডাম্পিং ইয়ার্ডে দৈনিক ৩০০ টাকা মুজুরিতে কাজ করেন ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক। এই কাজের জন্য ছয় মাস পর পর গামবুট আর মাস্ক দেওয়া হয় শ্রমিকদের। তবে শ্রমিকরা বলছেন, বিগত দেড় বছর যাবত কোনো সুরক্ষা উপকরণ দেওয়া হয়নি তাদের। এখানে কর্মরতদের কোনো ধরনের সুরক্ষার (গামবুট, মাস্ক ও গ্লাভস) ব্যবস্থা ছাড়া কাজ করার ফলে শ্রমিকদের বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন শ্রমিক বলেন, এখানে যারা কাজ করে তাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই। অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে থাকলেও কেউ কোনো খোঁজ খবর নেয় না। কত শ্রমিক হাত পা কেটে চিকিৎসা করাতে পারে না। সিটি করপোরেশনের কাজ করলেও এই দায়ভার সিটি নেয় না। কারণ আমরা স্থায়ী শ্রমিক না। চিকিৎসার টাকাও দেওয়া হয় না। বরং কাজে না আসলে চাকরি চলে যায়। দেড় বছর আগে গামবুট আর মাস্ক দেওয়া হয়েছিল সিটি থেকে। এরপর আর কোনো খোঁজ খবর নেই। আমাদের যে গাম বুট দেওয়া হয় ১ মাস কাজ করলেই নষ্ট হয়ে যায়। অন্তত দুই মাস পরপর গামবুট দেওয়া দরকার। তাছাড়া আমরা হাত দিয়ে এসব আবর্জনা পরিষ্কার করি তাই গøাভস খুব জরুরি দরকার আমাদের জন্য।
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মো. হানিফুর রহমান বলেন, বর্জ্য শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য গামবুট আর মাস্ক দেওয়া হয়। ডাম্পিং ইয়ার্ডের শ্রমিকদের ছয় মাস আগেও এসব উপকরণ দেওয়া হয়েছে। দৈনিক ৩০০ টাকা মুজুরিতে কাজ করেন তারা।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী বলেন, ডাম্পিং ইয়ার্ডে যারা দিনমুজুর হিসেবে কাজ করেন তারা কাজে না আসলেতো বেতন দেওয়ার নিয়ম নেই। তবে কোনো শ্রমিক যদি গুরুতর অসুস্থ হন তাহলে সিটি করপোরেশনকে অবগত করলে আমরা অব্যশই সহযোগিতা করবো। তাছাড়া এই শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্যও বিভিন্ন উপকরণ দেওয়া হয়।
আপনার মন্তব্য