নিজস্ব প্রতিবেদক

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০১:১০

আছে আদালতের নিষেধাজ্ঞা, তবু থামছে না সাদা পোশাকে গ্রেপ্তার

উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও থামছে না সাদা পোশাকে গ্রেপ্তার কার্যক্রম। পুলিশ বিভিন্ন সময় পরিচয় গোপন করে সাদা পোশাকে আসামী ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সিলেটেও ঘটছে এমন ঘটনা। সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে নগরীতে সাদা পোশাকে সাংবাদিক মঈনুল হক বুলবুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে তুলি নিয়ে যাওয়ার প্রায় দুই ঘণ্টা পর গ্রেপ্তারের বিষয়টি স্বীকার করে পুলিশ।

এভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া অনেকে 'নিখোঁজ' রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে। তাদের গুম করে ফেলা হয়েছে বলে দাবি নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের। ফলে সাদা পোশাকে গ্রেপ্তার নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে রয়েছে আতঙ্ক।

জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৪ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ সাদা পোশাকে কাউকে গ্রেপ্তারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ওইদিন শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছিলেন, ‘সাদা পোশাকে নিজেদের পরিচয় না দিয়ে পৃথিবীর কোথাও এভাবে গ্রেপ্তার করে না। এখন দেখা যাচ্ছে, একজনকে শত্রুতাবশত গায়েব করে ফেলছেন। পরিচয় দিচ্ছেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোক। আশা করি, এটা বন্ধ হবে’

ওই সময় তিনি আরও বলেন, ‘সাদা পোশাকের কাজ হচ্ছে- গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দার কাজে নিয়োজিত থাকা। সাদা পোশাকে যারা থাকবেন, তাদের কাজ হবে আসামিকে অনুসরণ করা, গতিবিধি লক্ষ্য করা। তাকে গ্রেপ্তার করার ব্যাপারে নিশ্চয়ই পরিচয় দেওয়া উচিত।’

আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সাদা পোশাকে গ্রেপ্তার বন্ধ না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিলেটের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা মনে করেন, এভাবে গ্রেপ্তারের কারণে অপরাধীরা এর সুযোগ নিবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপরাধীরা নির্ভয়ে তাদের অপকর্ম চালাতে পারবে। গুম খুন করতে পারবে।

সাদা পোশাকে গ্রেপ্তারে অস্বচ্ছতা থাকে উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সব অপরাধীর জন্য গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া অবশ্যই এক হয় না। একজন সন্ত্রাসীকে ধরার প্রক্রিয়া ও একজন সাধারণ অপরাধের আসামিকে ধরার প্রক্রিয়া অবশ্যই এক হতে পারে না। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বরতদের বুঝতে হবে কোন আসামিদের সাদা পোশাকে ধরা প্রয়োজন। এখন যদি সব মামলার আসামিদের সাদা পোশাকে ধরা হয় তাহলে প্রকৃত অপরাধীরা অপরাধ করতে আরও সুযোগ পাবে। অনেকেই আবার ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ব্যবহার করে আরেকজনের ক্ষতি করতে পারেন।

তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে অস্ত্রের মুখে মানুষজনকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুম করা হচ্ছে। খুন করা হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই খবরে আসে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেদের স্বচ্ছতার জন্য হলেও অবশ্যই ইউনিফর্ম পরে আসামি ধরা উচিত। বিশেষ কোনও কারণে যদি সাদা পোশাকে আসামি ধরা লাগে তাহলে অবশ্যই নিজের পরিচয় দিয়ে ২ জন সাক্ষী রেখে যেন আসামি ধরেন। তাহলে তাদের কোনও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে না।

এ ব্যাপারে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আমলযোগ্য অপরাধ হলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াও আসামি ধরার আইন আছে। তবে সাদা পোশাকে আসামি ধরার কোনও নিয়ম নেই। তবে যদি কোনও বিশেষ কারণে সাদা পোশাকে আসামি ধরার প্রয়োজন হয় তবে অবশ্যই পরিচয় পত্র দেখাতে হবে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকতে হবে। আসামি ধরে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর তার পরিবারকে জানাতে হবে।

সাংবাদিক বুলবুলকে সাদা পোশাকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে কোতোয়ালী থানায় জিডি করেন ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের (ইমজা) সদস্য বিভিন্ন টেলিভিশনে কর্মরত সিলেটের ৫৬ জন সাংবাদিক।

এ ব্যাপারে ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের (ইমজা) সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর আহমদ বলেন, যেকোনো মানুষের বিরুদ্ধেই মামলা থাকতে পারে। পুলিশ গ্রেপ্তারও করতে পারে। কিন্তু আমরা উদ্বিগ্ন গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া নিয়ে। এবং গ্রেপ্তার পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য গোপন করা নিয়ে।

এ ব্যাপারে সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মো. আমিনুল ইসলামের মুঠোফোনে গত দুইদিন একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে কখনও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়, আবার কখনও রিং হলেও তিনি কল ধরেননি।

এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) মো. জেদান আল মুসার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত