নিজস্ব প্রতিবেদক

৩১ মে, ২০২৬ ২২:৪৬

সিলেটে বৃদ্ধ ব্যবসায়ীকে মব করে মারধর ‘চাঁদা না পেয়ে’: ১৩ জনের নামে মামলা, গ্রেপ্তার ৫

সিলেট নগরের শিবগঞ্জ সেনপাড়া এলাকায় মুদি দোকানি খগেন্দ্র চন্দ্র দাসকে মব করে মারধরের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এক শিশুর সাথে আপত্তিকর আচরণের অভিযোগ এনে ওই ব্যবসায়ীকে মারধর করে কিছু লোক। তবে পুলিশ আপত্তিকর আচরণের অভিযোগের প্রমাণ পায়নি।

আর খগেন্দ্র চন্দ্র দাসের মারধরকারীদের একজন কয়েকদিন আগে তার কাছে টাকা দাবি করেছিল। মারধরকারীরা তার দোকানের মালামাল ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ তার।

এদিকে, এ ঘটনায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন খগেন্দ্র দাসের ছেলে রুবেল দাস। পুলিশ ইতোমধ্যে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া মারধরে গুরুতর আহত খগেন্দ্র চন্দ্র দাস বর্তমানে ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

জানা যায়, গত শুক্রবার রাত প্রায় ৮টার দিকে শিবগঞ্জ সেনপাড়া এলাকার মুদি দোকান ‘রাণী স্টোর’ থেকে কোমল পানীয় কিনতে আসে আট বছর বয়সী এক শিশু। সে সময় দোকানে ক্রেতাদের ভিড় থাকায় শিশুটিকে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। পরে পণ্য কিনে শিশুটি চলে যায়।

কিছুক্ষণ পর শিশুটির মা ও বোন দোকানে এসে কেন দেরি হয়েছে তা জানতে চান। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি অভিযোগ তোলেন, দোকানদার শিশুটির শরীরে স্পর্শ করেছেন। এর কিছুক্ষণ পরই সংঘবদ্ধ কয়েকজন লোক দোকানে জড়ো হয়। একপর্যায়ে তারা দোকান মালিক খগেন্দ্র চন্দ্র দাসের ওপর হামলা চালায়। লাথি-ঘুষিসহ এলোপাতাড়ি মারধর করতে থাকে তাকে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।

শনিবার এই মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেয়।

ঘটনার পরপরই পুলিশ দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করে। ফুটেজ পর্যালোচনা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খগেন্দ্র চন্দ্র দাস বলেন, সন্ধ্যার পর এক শিশু টাইগার (কোমল পানীয়) কিনতে আমার দোকানে আসে। এসময় দোকানে ভিড় থাকায় আমি তাকে সরে যেতে বলি। পরে শিশুটি টাইগার নিয়ে চলে যায়। এরকিছুক্ষণ পর শিশুটির মা বোন এসে বিভিন্ন অভিযোগ করতে থাকেন। তখন তাদের আমি দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ দেখার জন্য বলি। এরমধ্যেই আচমকা কয়েকজন যুবক এসে আমাকে মারধর শুরু করে।

খগেন্দ্র দাস বলেন, মারধরকারীদের সবাইকে আমি চিনি না। তবে তাদের মধ্যে একজন কয়েকদিন আগে আমার কাছে টাকা দাবি করেছিল।

তিনি বলেন, মারধরকারীরা আমার মোবাইল ফোন, শার্ট ও প্যান্টের প্যাকেট এবং ক্যাশবাক্স থেকে টাকা ও সিগারেটের কার্টুন নিয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ মনজুরুল আলম বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, অভিযোগে উল্লিখিত শ্লীলতাহানির কোনো ঘটনা ঘটেনি। যাচাই-বাছাই ছাড়াই গুজব ও সন্দেহের ভিত্তিতে এক বৃদ্ধ ব্যবসায়ীকে মারধর করা হয়েছে। এটি মব জাস্টিসের একটি স্পষ্ট ঘটনা।

তিনি বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামিরা হলেন সেনপাড়ার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম মিন্টুর স্ত্রী মোছাম্মৎ শিল্পী বেগম (৪২), ওহিদুল আলমের ছেলে আহম্মদ হোসেন আরিফ (২৪), মো. রফিকুল ইসলাম মিন্টুর ছেলে আকাশ আহমেদ (২০), মেয়ে মোছাম্মৎ রোজী আক্তার (২০), মেয়ে রোকেয়া আক্তার (২২), মো. রফিকুল ইসলাম মিন্টু (৫০), বিল্লাল মিয়ার ছেলে শোয়েব (৩০), শিবগঞ্জ খড়াদিপাড়ার মখর মোল্লা লাক্কুর ছেলে নাদিম আহমদ (২৭), ইমন (২৬), সেনপাড়ার কামাল (২৬), সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দ আবু বক্কর (২৭), দেলোয়ার (৩৫), অন্তর (২৬)সহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজন।

এদিকে, ব্যবসায়ীর ওপর মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে সংঘটিত এ হামলার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এঘটনায় মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরীসহ হিন্দু বৌদ্ধ কল্যাণ ঐক্য ফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ আহত ব্যবসায়ীর পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়ে তাদের পরিবারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত