রোববার, ১৯ জানুয়ারি ২০২০ ইং

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

১৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:৩৯

২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা

বোয়াল, আইড়, বাঘাইড়, চিতল, কাতলা, বাউশ, কালাবাউশ, রুই ছোট-বড় নানা আকারের মাছ। কোনোটার আকার ৪৫ কেজি, কোনোটা ১০ কেজি।  আবার কোনোটা ১/২ কেজিও আছে।  নানা জাত আর নানা আকারের এসব মাছের সমারোহ নিয়ে মৌলভীবাজারের শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর পাড়ে শুরু হয়েছে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। প্রতিবছর পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে এই মেলা বসে মৌলভীবাজার, সিলেট ও হবিগঞ্জের মিলন স্থল মৌলভীবাজারের শেরপুরে।

সোমবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেল থেকে সিলেট বিভাগের হাইল হাওর, কাউয়াদীঘি হাওর, বড় হাওর, হাকালুকি, টাঙ্গুয়া, কুশিয়ারা নদী,  সুরমা ও মনু নদীসহ সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছ নিয়ে আসতে শুরু করেছেন মৎস্য ব্যবসায়ীরা।  ১৫ তারিখ ভোরে শেষ হবে মেলার আনুষ্ঠানিকতা। মাছের মেলার সাথে সাথে এখানে বসেছে নানা ধরণের হস্তশিল্প ও গ্রামীণ খাবারের মেলা।

সরজমিনে মেলায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বিশালকৃতির সব মাছ। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাছ নিয়ে যেমন বিক্রেতারা এসেছেন তেমনি এসেছেন পাইকারেরা ও খুচরা ক্রেতারা।  একসঙ্গে বড় আকারের বিভিন্ন জাতের এত মাছ দেখতেও ভিড় করেছেন অনেকে। তাঁরা ঘুরে ঘুরে মাছ দেখেন, দাম জানতে চান। ক্রেতা এবং দর্শনার্থীরা সবাই সিলেট অঞ্চলের হলেও বিক্রেতাদের বড় একটি অংশ এসেছেন দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে।  

কক্সবাজার থেকে ১০ টি বড় আকারের সামুদ্রিক মাছ নিয়ে মেলায় এসেছেন আব্দুল জব্বার। তিনি জানান, মেলার আয়োজনকে ঘিরে গত ১৫ দিন ধরে তিনি বিভিন্ন সাইজের মাছ সংগ্রহ করে মেলাতে নিয়ে এসেছেন। প্রথম দিনে বিক্রি ভাল না হলেও শেষ মুহূর্তে বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছেন।

মেলায় ৪৫ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ দাম হাঁকা হচ্ছে ৮০ হাজার টাকা। মাছটি মেলায় নিয়ে এসেছেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বরুণা এলাকার আবুল হাসান। তার দাবি এটাই এ মেলার সবচেয়ে বড় মাছ। মাছটি ৩ দিন আগে কুশিয়ারা নদী থেকে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, এই বছর মেলায় ৮ লাখ টাকার মাছ তিনি নিয়ে এসেছেন। এখন পর্যন্ত ২ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। ধারণা করছেন বাকী মাছও বিক্রি হয়ে যাবে।

৩২ কেজি ওজনের একটি বাঘা আইড় মাছ মেলায় নিয়ে এসেছেন নাসির আহমদ। তিনি এই মাছটির দাম হাঁকছেন ৬০ হাজার টাকা।

স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান, মাছের মেলা এ অঞ্চলের একটি ঐতিহ্য। মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকাটি উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাওর-নদীর মাছ ছাড়াও খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানের মাছ আসে।  তিনি এই ঐতিহ্যের সঙ্গী হতে ১৫ বছর যাবত মেলায় মাছ নিয়ে আসেন।

মেলায় ঘুরতে আসা অনেকে ঘুরে ঘুরে মেলার মাছ দেখার পাশাপাশি মেলা থেকে নাড়ু, সন্দেশ কিনে খাচ্ছেন আবার কেউ কেউ দল বেঁধে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছেন। শিশুদের জন্য আছে নাগরদোলাসহ বিভিন্ন ধরণের খেলনার মেলা।  মেলায় ঘুরতে আসা সিলেটের জনি পাল জানান, মাছ কিনতে নয় দেখতে এসেছি। এত মাছ এক সাথে দেখার জন্য প্রতিবছর অপেক্ষা করি। আমরা ৭/৮ জন বন্ধুবান্ধব মিলে মেলা দেখতে এসেছি।

স্থানীয় বাসিন্দা মতিন মিয়া জানান, মেলা উপলক্ষে মাছ ব্যবসায়ীরা সপ্তাহ থেকে ১৫ দিন পূর্বে বড় বড় মাছ সংগ্রহ করতে থাকেন। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা মেলায় এসে আড়ত থেকে ছোট বড় অনেক জাতের মাছ কিনে নিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েন।  তিনি জানান, এটা সৌখিন মানুষের মেলা। ৪/৫ হাজার টাকার নিচে কোন মাছ পাওয়া যায় না।  মেলায় ছোট আকারের মাছের দাম হাঁকানো হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, মাঝারি সাইজের মাছের দাম হাঁকানো হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং বড় সাইজের মাছের দাম ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ।  এক রাতেই মাছের মেলায় কোটি কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়ে থাকে।  

সিলেটের অনেক প্রবাসীও মাছের মেলাকে কেন্দ্র করে দেশে আসেন।  গোয়ালাবাজারের ফুল মিয়া ইংল্যান্ড থেকে দেশে এসেছেন। তিনি জানালেন বিদেশে থাকলেও দেশে সব কিছু মনে পরে। ছোটবেলার স্মৃতিতে মাছের মেলা বড় একটি অংশ নিয়ে বসে আছে। আমার আগামী মাসে দেশে আসার কথা ছিল কিন্তু মাছের মেলার জন্য এক মাস আগেই চলে আসছি।  তিনি জানান, ২টা চিতল এবং ৩টা রুই তিনি কিনেছেন ৫৫ হাজার টাকা দিয়ে।

তবে অন্যান্য বছর থেকে এই বছর মাছ কম বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ব্যবসায়ীরা।  মাছ ব্যবসায়ী আক্তার উদ্দিন বলেন, ৫ লাখ টাকার মাছ নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখনো বিক্রি ভাল হয়নি। তার প্রায় ২০ কেজি ওজনের ১টি চিতল মাছটি ৩২ হাজার টাকা হাঁকছেন।
 
মেলায় হাকালুকি হাওর থেকে বিশাল আকারের ১ জোড়া কাতল ও ১ জোড়া বোয়াল নিয়ে এসেছেন হিরা মিয়া ও লাল মিয়া।  কাতলের জোড়ার দাম হাঁকছেন ২৬ হাজার এবং বোয়ালের জোড়ার দাম হাঁকছেন ৪৮ হাজার টাকা।

ব্যবসায়ীদের দাবি মেলার সব মাছ কোন না কোন হাওরের। এ কথা শোনে পাশে থাকা একজন প্রবীণ জানালেন দেশী মাছের সেই দিন কি আর আছে বাবা! দেশী মাছের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশী তাই ব্যবসায়ীরা সব মাছকেই দেশী মাছ বলছে বাস্তবে বেশীর ভাগ মাছ খামারির।
 
এ দিকে ক্রেতাদের অভিযোগ মাছের দাম অস্বাভাবিক।  ফরহাদ মিয়া নবীগঞ্জ থেকে মাছ কিনতে এসেছেন। তিনি জানালেন, ১০ কেজি ওজনের একটা বোয়াল মাছের দাম তার কাছে দাবি করা হয়েছে ৬০ হাজার টাকা।  

মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ জানান, মেলার সার্বিক নিরাপত্তার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে সেই সাথে কোন ধরনের আইন বিরোধী কাজ বা জুয়া যেনও না বসতে পারে তার জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা রয়েছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত