নিজস্ব প্রতিবেদক

০২ জুন, ২০২৬ ২১:২২

৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ: ছাত্রদল নেতা ইমনকে ধরে পুলিশে দিলেন ভূক্তভোগীরা

ইউরোপে পাঠানোর নামে টাকা প্রায় ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে গা ঢাকা দেওয়ার অভিযোগে কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান ‘এমেক্স এসোসিয়েট’-এর কর্ণধার ইমন উদ্দিনকে আটক করেছেন ভুক্তভোগীরা। পরে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুরে জামিন আবেদনের জন্য সিলেট আদালতে গেলে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে ভুক্তভোগীরা তাকে আটক করেন। ইমন সিলেট মহানগর ছাত্রদল নেতা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নগরীর উপশহর এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ভিসা প্রাপ্তির ভিডিও প্রচার করে মানুষকে আকৃষ্ট করা হতো। বিশেষ করে ‘মাত্র ১ হাজার টাকায় ভিসা প্রাপ্তি’র প্রচারণা চালিয়ে সহজ শর্তে বিদেশ পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এভাবে প্রায় ৭০০ তরুণ-যুবকের কাছ থেকে জনপ্রতি ১ থেকে ৫ লাখ টাকা করে অন্তত ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ইমন উদ্দিন ও তার সহযোগী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তি সিলেটের আহ্বায়ক জাবের আহমদ (সম্প্রতি অব্যাহতি)।

অভিযোগ উঠেছে, তারা প্রায় সাতশ তরুণ ও যুবককে ইউরোপে পাঠানোর প্রতিশ্রুতিতে তাদের কাছ থেকে এক লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন। সরাসরি তাদের অফিসের মাধ্যমে দুইশ ও বিভিন্ন এজেন্টদের মধ্যে বাকি লোকদের কাছ থেকে তারা টাকা নেন। দীর্ঘদিনেও ভিসা না হওয়ায় অনেকে টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাদের উল্টো হুমকি দেওয়া হয়। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ভয় দেখানো হয় ভুক্তভোগীদের।

প্রতারণার বিষয়টি জানাজানি হলে ১৯ মে অফিস তালা লাগিয়ে গা-ঢাকা দেন জাবের ও ইমন। বিদেশে পালানোরও চেষ্টা করেন। অফিস তালাবদ্ধ করার পর প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী সিলেটের হরিপুর এলাকার বাসিন্দা নেওয়াজুর রহমান। মামলার এজাহারে বলা হয়, প্রায় সাতশ জনের কাছ থেকে অন্তত ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। মামলার পর দুজনকে আটক করেছে শাহপরান থানা পুলিশ।

প্রতারিত ব্যক্তিদের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটির মূল কর্ণধার সিলেট জেলা যুবশক্তির সাবেক আহ্বায়ক আহ্বায়ক জাবের আহমদ। পরে যুক্ত হন ছাত্রদল নেতা ইমন উদ্দিন। তাদের গ্রামের বাড়ি একই এলাকায়। জাবের বিয়ানীবাজারের চান্দগ্রাম ও ইমন কামারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। আওয়ামী লীগ সরকার পতন-পরবর্তী সময়ে তারা পর্তুগাল, কানাডাসহ কয়েকটি দেশের ফাইল জমা নেন। ফাইল নেওয়ার সময় জাবের এনসিপি ও ইমন বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবিও কাজে লাগান। তারা পর্তুগালের জন্য এক লাখ ও কানাডার জন্য দেড় থেকে দুই লাখ টাকা অগ্রিম নেন। চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে ভিসা হওয়ার কথা থাকলেও বছর গড়িয়ে যায়। টাকা ফেরত চাইতে শুরু করে লোকজন। এক পর্যায়ে টাকা ফেরতের জন্য চাপ দিতে শুরু করলে ভুক্তভোগীদের হুমকি ও মামলা দিয়ে হয়রানির ভয় দেখানো হয়। প্রতারিত ৮-১০ জনের সঙ্গে কথা বলে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগীদের একজন কোম্পানীগঞ্জের ফারহান আহমদ। তিনি জানান, পর্তুগালের জন্য এক বছর আগে ১ লাখ টাকা দেন তিনি। টাকা ফেরতের জন্য অফিসে গেলে তাঁকে বহিরাগত তিন যুবক দিয়ে ভয় দেখানো হয়, অস্ত্র দেখানো হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী জানান, গত মাসে অফিসে গিয়ে টাকার জন্য চাপ দিলে অফিসের নারীদের দিয়ে উত্ত্যক্ত করার মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে।

প্রতারণার বিষয়টি জানাজানি হলে ১৯ মে অফিস তালাবদ্ধ করে গা ঢাকা দেন জাবের ও ইমন। ওইদিন রাতে ৩০-৪০ জন ভুক্তভোগী নগরীর কুমারপাড়ার প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর বাসায় গিয়ে ভিড় করেন। তিনি ওই দিন পুলিশ কমিশনারকে ভুক্তভোগীদের মামলা নিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

পরে মহানগরীর শাহপরান থানায় জাবের ও ইমনকে আসামিকে করে আরও পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন নিয়াজুর রহমান নামের এক ভুক্তভোগী।

তিনি জানান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভিসার নামে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়। সেই টাকাই তারা মেরে দেয়। ভুয়া ভিসা ও ভুয়া লোক দেখিয়ে ফটোসেশন করে প্রচারণা করা হয়। লোকজন বিশ্বাস করে টাকা দেয়।

তবে সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী আহসান বলেন, ইমন উদ্দিন দলের কেউ নন। নেতাদের ছবি ব্যবহার করে অপকর্ম করলে এর দায় তাকেই নিতে হবে।

ইমনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে এসএমপির শাহপরান (রহ.) থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস আহমদ বলেন, আদালত প্রাঙ্গণ থেকে ভুক্তভোগীরা তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছেন। এখন তিনি পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। বুধবার আদালতে প্রেরণ করা হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত