১৪ মার্চ, ২০২০ ০২:৪৭
অব্যাহত দখল দূষণ আর পাহাড়ি ঢলের সাথে নেমে আসা পলি মাটি- এই তিন কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে সিলেটের নদ-নদীগুলো।
নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। নদীকে কেন্দ্র করে এই দেশে গড়ে উঠেছে অনেক শহর। সিলেটের সুরমা, হবিগঞ্জের খোয়াই, সুনামগঞ্জের কালনী, মৌলভীবাজারের মনুসহ সিলেট বিভাগে প্রায় শতাধিক ছোট বড় নদ-নদীর অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু দখল, দূষণ ও পাহাড়ি ঢলের সাথে নেমে আসা পলি মাটিতে নদীর উৎসমুখ ভরাট হওয়ার কারণে বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এছাড়া মানুষের অসচেতনতা ও লোভের কারণে ভাল নেই সিলেটের নদ-নদীগুলো।
পরিবেশবিদরা বলছেন সিলেটের অধিকাংশ বড় নদীর উৎস ভারতের পাহাড়ি ঢল বেয়ে আসা পানি । সেখান থেকে প্রবাহিত পানি দিয়েই সিলেটের নদীগুলোর ছুটে চলা। এই পাহাড়ি ঢলের সাথে নেমে আসা পানির লাখ লাখ টন বালি ও মাটি বছরের পর বছর ধরে সিলেট বিভাগের নদ-নদী, হাওর বাঁওড়কে ভরাট করে দিচ্ছে। সম্প্রতি এই ভরাটের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বালি ও মাটি শুধু নদ-নদীর তলদেশ নয় উৎসমুখও ভরাট করছে। যার ফলে ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে মাও সাংসাং থেকে উৎপন্ন বরাক নদী সিলেটের জকিগঞ্জের অমলসীদ হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা দুই শাখায় প্রবাহিত হয়েছে।
আজ শনিবার (১৪ মার্চ) আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস। সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশের নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করা হবে দিবসটি। ১৯৯৭ সালের ব্রাজিলে কুরিতিবা শহরে এক সমাবেশ থেকে নদীর প্রতি দায়বদ্ধতা মনে করিয়ে দিতে এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে এক হয়েছিলেন বিভিন্ন দেশে বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। তাইওয়ান, ব্রাজিল, চিলি, আর্জেন্টিনা, থাইল্যান্ড, রাশিয়া, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ওই সম্মেলনে অংশ নেন প্রতিনিধিরা। ওই সম্মেলন থেকেই ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এদিকে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সুরমার প্রবেশ মুখে ভরাট হচ্ছে পাহাড়ি ঢলের সাথে নেমে আসা বালি ও মাটিতে। যার ফলে শুষ্ক মৌসুমে বরাকের পানির ৮৫ শতাংশ কুশিয়ারা দিয়ে প্রবাহিত হয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রবাহিত হয় সুরমা নদী। প্রতি বছরই চর জেগে উঠে সুরমার বুকে। পানি শূন্য এসব নদীর চর দখলে মরিয়া হয়ে উঠেন স্থানীয় মানুষজন । যার ফলে নদীর মাটি শক্ত হয়ে বর্ষায় প্লাবনের সৃষ্টি করে। সম্প্রতি সিলেট নগরীর শাহজালাল সেতু থেকে দক্ষিণ সুরমার শ্রীরামপুর পর্যন্ত দীর্ঘ এলাকাজুড়ে সুরমার বুকে জেগেছে দীর্ঘ চর।
২০১৯ সালের ১ জুলাই নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করে হাই কোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়। এর আগে ওই বছর ৩ ফেব্রুয়ারি নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে উল্লেখ করেন হাইকোর্ট। আদালত বলেন, মানুষের জীবন-জীবিকা নদীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানবজাতি টিকে থাকার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নদী। নাব্যসংকট ও বেদখলের হাত থেকে নদী রক্ষা করা না গেলে বাংলাদেশ তথা মানবজাতি সংকটে পড়তে বাধ্য। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সরকার আইন প্রণয়ন করে নদীকে বেদখলের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করছে। নদী রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে জাগরণ শুরু হয়েছে। এখন সবারই ভাবনা পরিবেশের জন্য নদী রক্ষা করতে হবে।
অপরদিকে ২০১৯ সালে ২৪ জুলাই নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়-জলাধার ভিত্তিক অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রকাশ করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। প্রাথমিক ওই তালিকায় দেশের নদ-নদী দখল করেছেন এমন ৪২ হাজার ৪২৩ জনের নাম উঠে আসে। এর মধ্যে সিলেট বিভাগে আছেন প্রায় সহস্রাধিক নদ-নদী দখলদার। এই তালিকা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন দখলদারদের উচ্ছেদে অভিযান শুরু করবে বলেও জানানো হয়। তবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সিলেটের জেলা প্রশাসন ঘটা করে সুরমা নদীর তীরে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও কিছু দিন পরই মন্থর হয়ে পড়ে এই উচ্ছেদ কার্যক্রম। তাই এই সুযোগে উচ্ছেদকৃত জায়গা আবারও দখল নিতে শুরু করেন দখলবাজরা।
সিলেটের নদ-নদীর সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার আব্দুল করিম কিম বলেন, সিলেটের নদ-নদীগুলো ভালো নেই। দখল-দূষণ চলছে অবিরাম। নদীগুলো নানা কারণে একে একে মারা যাচ্ছে । ভারত থেকে আসা আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো প্রাপ্য পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আর দেশে মানুষের দখল দূষণে বিপন্ন হচ্ছে । তবে আশার কথা হচ্ছে গত কয়েক বছরে নদী রক্ষায় সামগ্রিকভাবে একটি জাগরণ তৈরি হয়েছে । সরকার নদী রক্ষায় কমিশন গঠন করেছে। জাতীয় পানি আইন করেছে। নদীগুলোকে রক্ষা করবে? তা নিয়ে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। সেটি এখন এককভাবে নদী রক্ষা কমিশনের ওপর অর্পিত হয়েছে। নদী দখলদারদের তালিকা তৈরি হয়েছে । উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে । কিন্তু নদী দূষণ বন্ধ করা যাচ্ছে না। নদী দূষণ বন্ধ করা এখন সবচেয়ে জরুরী । তাই নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও বুড়িগঙ্গা ওয়াটারকিপার শরিফ জামিল বলেন, সিলেটের নদ-নদী উজানে ভারতের উত্তর পূর্ব বাংলার পর্বতমালা এবং পাহাড়-টিলার বনাঞ্চলের উপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ভারতের একতরফা প্রকল্পসমুহ এবং বাংলাদেশ-ভারত উভয়দেশের বন ধ্বংসের কারণে নদীগুলো তার গঠন ও চরিত্র হারিয়েছে। তারমধ্যে সমন্বিত ও অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা ছাড়া বেপরোয়া শিল্পায়ন, কৃষিজমি, প্লাবন অঞ্চল, নদীর পাড় ও ঢাল দখলের পাশাপাশি মারাত্মক দূষণ শুরু করেছে যা মেঘনা নদীকেও দূষিত করে তুলছে। অতিসত্বর সিলেটের নদী ও হাওরসমূহ রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ দরকার।
আপনার মন্তব্য