হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

১৪ মার্চ, ২০২০ ২১:১২

সুতাং নদীর দূষিত পানিতে মারা যাচ্ছে জলজ প্রাণী

পানি পরিদর্শনে সুতাং নদীর তীরে বাপা ও খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপারের প্রতিনিধিদল

আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার নেতৃবৃন্দ ও খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার শিল্পবর্জ্যে দূষণে আক্রান্ত সুতাং নদী ও তৎসংলগ্ন খালগুলো পরিদর্শনে যান। পরিদর্শনকালে তারা দেখতে পান সুতাং নদীর পানি কালো কুচকুচে হয়ে আছে। পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নদীর দূষিত পানিতে মরে আছে জলজ প্রাণী।

শুক্রবার (১৩ মার্চ) বাপা ও খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপারের একটি প্রতিনিধিদল ‘ বাদ-জলকপাট দখল ও দূষণমুক্ত নদী প্রবাহ নিশ্চিত করো। আংশিক নয়, নদী বিষয়ক হাইকোর্টেও রায় সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করো’ এই স্লোগানে সুতাং নদী ও তৎসংলগ্ন খালগুলোর পানি পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শনে গিয়ে প্রতিনিধি দল দেখতে পান হবিগঞ্জ জেলায় অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে ওঠা কলকারখানার অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য নিষ্কাশনের কারণে চরম সঙ্কটে পতিত হয়েছে নদী, খাল-বিল, জলাশয়। বর্জ্য নিষ্কাশনের কারণে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর লাখো মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে নদী পাড়ের মানুষ। কয়েক বছর ধরে চলে আসা শিল্পবর্জ্য দূষণের কারণে মারা যাচ্ছে গবাদিপশু হাঁস-মুরগী। মৎস্য শূন্য হয়ে পড়ছে নদী-খাল-বিল জলাশয়। অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগসহ জটিল রোগে। অসহনীয় দুর্গন্ধের ভেতর দিনাতিপাত করতে বাধ্য হচ্ছেন লাখো মানুষ। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী দায়ী করছে কল-কারখানার মালিক ও দূষণ রোধে দায়িত্বশীলদের।

বাপা জেলা সেক্রেটারি ও খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার তোফাজ্জল সোহেলের নেতৃত্বে পরিদর্শন দলে ছিলেন বাপা আজীবন সদস্য এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জহিরুল হক শাকিল, লাখাই উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. আমিরুলত ইসলাম আলম, বাপা সদস্য অ্যাডভোকেট বিজন বিহারী দাস, সাংবাদিক ও আইনজীবী শাহ ফখরুজ্জামান, নদীকর্মী ডা. আলী আহসান চৌধুরী পিন্টু, মো. আমিনুল ইসলাম, মো. আবিদুর রহমান রাকিব, সাইফুল ইসলাম, মেহের সাগর সোহাগ প্রমুখ।

এসময় তারা করাব, ছড়িপুর, উচাইল, রাজিউড়া, সাধুর বাজার, মির্জাপুর, ঘোড়াইল চর, আব্দুর রহিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন এবং শিল্পবর্জ্য দূষণে আক্রান্ত গ্রামবাসীর কথা শুনেন।

উচাইল গ্রামের আব্দুস সালাম (৮০) বলেন, সুতাং নদীর পানির দুর্গন্ধে জন্য আমরা বাড়িঘরে থাকতে পারছিনা। এক সময় সুতাং নদীর মাছের জন্য দূর দুর্দান্ত থেকে মানুষ আসতো। এখন মাছ একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না।

মো. আলাই মিয়া (৮৫) বলেন, কোম্পানি আসার পর থেকেই নদীর পানির এই অবস্থা। সুতাং নদী আমাদের অনেক উপকার করত, মানুষ গোসল করতো, মাছ আহরণ করত। এখন আমরা খুব কষ্টের মধ্যে আছি। এই এলাকায় বিয়ে সাধি কেউ দিতে চাই না।

আব্দুর রহিমপুর পাল বাড়ির মৃৎশিল্পী রণজিৎ পাল (৪৯) বলেন, আগে নদীর মাটি দিয়ে কাজ করতাম, কয়েক বছর ধরে তা করতে পারছি না। একই গ্রামের অনিমা রাণি পালন, ঘরে দরজা জানালা বন্ধ করেও থাকতে পারিনা দুর্গন্ধের জন্য।

উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. আমিরুল ইসলাম আলম বলেন, সুতাং নদীটি এলাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই নদীর পানি সেচের জন্য ব্যবহার করে অনেক কৃষক উপকৃত হতেন । কিন্তু দুর্ভাগ্য বিগত কয়েক বছর ধরে শিল্পকারখানা হবার পর থেকেই নানান সমস্যা হচ্ছে। মানুষ পানি ব্যবহার করলে চর্মরোগ সহ নানান ধরণের অসুখ হয়। নদী এবং আমাদের বিলগুলোর মাছ বিনষ্ট হচ্ছে। পানিতে যত ধরণের প্রাণী আছে প্রায়ই দেখা যায় মরে ভেসে উঠে। ময়লা পানির কারণে যে পরিমাণ ফসল উৎপাদন হবার কথা তা হচ্ছে না। দূষণের কারণেই প্রাণী এবং মাছ ধ্বংস হচ্ছে। লাখাই উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি গ্রাম নদীর পাড়ে। এই গ্রামগুলোর মানুষ নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছে না।

ড. জহিরুল হক শাকিল বলেন, হবিগঞ্জে সুশাসন না থাকাতে, পরিবেশগত মনিটরিং না থাকাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্লিপ্ততায় এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের অনাচারে এই এলাকার পরিবেশ চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। হবিগঞ্জের ৫টি নদী সম্পূর্ণভাবে বিপন্ন হয়ে গেছে শুধুমাত্র হবিগঞ্জের শিল্পায়নের জন্য। এই শিল্পায়ন এবং প্রবৃদ্ধি কার জন্য? এখন যদি মানুষই না থাকে তাহলে ভোগ করবে কে? নদীর পানি কালো আলকাতরার মতো প্রবাহিত হচ্ছে। আমরা দেখেছি ব্যাঙ মরে ভেসে রয়েছে। এলাকার স্থানীয়রা বলছেন, এই পানি যদি পশুপাখি খায় তাহলে প্রাণীগুলো মারা যাচ্ছে। এই পানি ব্যবহার করে দৈনন্দিন কাজকর্ম চলত, চাষাবাদ হচ্ছে না। প্রতিবছর এইখানে পুণ্যস্নান হত কিন্তু এখন তা হচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষসহ এলাকার জনপ্রতিনিধিদের দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। তা না হলে কিছুদিন পর এখানে চরম মানবিক বিপর্যয় নেমে আসবে।

তোফাজ্জল সোহেল বলেন, নদী, খাল, বিল, জলাশয়ে শিল্পবর্জ্য নিক্ষেপের ফলে এই অঞ্চলের পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সকল ধরণের শিল্পবর্জ্য ‘উৎসে পরিশোধন’ বাধ্যতামূলক হলেও এই অঞ্চলে তা একেবারেই মানা হচ্ছে না। কলকারখানাগুলো শুরু থেকেই বেপরোয়াভাবে দূষণ চালিয়ে আসছে যা সংশ্লিষ্ট গ্রামসমূহের বাসিন্দাদের সাংবিধানিক অধিকারের উপর প্রত্যক্ষ আঘাত।

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত